২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আশকোনায় হঠাৎ বিকট শব্দে বিস্ফোরণ, ৫ জন মারাত্মক দগ্ধ

  • দুজরে অবস্থা আশঙ্কাজনক

স্টাফ রিপোর্টার ॥ সকালের নাস্তা খাবার সময় হঠাৎই পরিবারের সবাইকে পুড়তে হলো আগুনে। শুধু ৫ জন দগ্ধই হয়নি, প্রচ- বিস্ফোরণে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেছে বাসার দরজা, জানালা, দেয়াল, ছাদ ও মেঝ।

উত্তরার আশকোনা এলাকার একটি দোতলা বাসায় রবিবার ঘটে এ দুর্ঘটনা। অগ্নিদগ্ধ সবাই এখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। তারা হলেন, রেহানা আক্তার (৪০), তার মেয়ে শহীদ আনোয়ার স্কুল এ্যান্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) উত্তীর্ণ আফসানা আক্তার (১৯), ছেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর কলেজের উচ্চ মাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রেজোয়ান আহমেদ শুভ (১৮), আরেক ছেলে মাস্টারমাইন্ড স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণীর শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ নিলয় (১২) এবং গৃহকর্মী সখিনা (৪০)। এদের মধ্যে মা রেহানা, ছেলে নিলয় ও গৃহকর্মী সখিনার অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পূর্ব আশকোনার পানির পাম্পের উত্তর পাশের ৬৫নং বাসায় এ ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দুর্ঘটনার ধ্বংসযজ্ঞ দেখে এলাকাবাসী বিস্মিত। এত সকালে বিকট শব্দ শুনে প্রতিবেশীরা ওই বাসায় গিয়ে দেখতে পান পরিবারের সবাই আগুনে পুড়ে বসে আছে সিঁড়িতে। তাদের যে যেভাবে পারছেন ধরাধরি করে হাসপাতালে পাঠানোর চেষ্টা করেন। তখনও তারা আগুনের ব্যাপারে সুস্পষ্ট কিছুই বলতে পারেননি। শুধু বলেছেন, বিকট শব্দে তাদের ঘুম ভাঙ্গার পর দেখতে পান চারপাশে আগুন। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারপাশ।

ঘটনার পর পরই সেখানে গিয়ে হাজির হন একই মহল্লার বাসিন্দা জনকণ্ঠের এই প্রতিনিধি। ততক্ষণে তাদের সবাইকে হাসপাতালে নিয়ে রওনা হয়ে গেছে স্বজনরা।

বছর কয়েক আগে নির্মিত দোতলা বাসার ওপর তলাতেই ছিলেন তারা সবাই। গৃহকর্তা আবুল কাসেম দীর্ঘ সাত বছর যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। গ্রীন কার্ড না হওয়ায় তিনি দেশে ফিরতে পারছিলেন না। সাত বছর ধরেই পরিবারের সঙ্গে ফোনে, ভাইবারে, স্কাইপে কথা হতো। তাদের আদিবাস ফেনীতে।

দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায় নিচ তলার ভাড়াটে আমিনুল ইসলাম সবুজ নামের এক যুবক র‌্যাবকে ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন।

এ সময় তিনি জনকণ্ঠকে বলেন, সকাল সাতটা ঠিক বাজেনি। হঠাৎ বিকট শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। দৌড়ে এসে সিঁড়ির কাছে এসে দেখি বাড়িওয়ালী রেহেনা আক্তার, সঙ্গে তার দুই ছেলে, এক মেয়ে ও কাজের মেয়ে সবার শরীরই আগুনে পোড়া। কারোর হাত কারও পা, কারও পিঠ দগ্ধ। সবচেয়ে বেশি পুড়েছে রেহেনা ও সখিনার। তাদের তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ওই বাসায় রেহেনার আর কোন স্বজন বা নিকটজন বলতে কেউ ছিলেন না তখন। র‌্যাব সদস্যরাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও আলামত তৈরি করছিলেন।

এ সময় দেখা যায়, দোতলায় পশ্চিম পাশের ইউনিটে বাড়িওয়ালী রেহেনার বসবাস। একটি বেডরুমে তিনি থাকেন মেয়েকে নিয়ে। পাশের দুই রুমে দুই ছেলে থাকে। মাঝে ছোট্ট একটা ড্রইংরুম। তার দক্ষিণেই রান্নাঘর। দুই পাশে দুটো বাথরুম।

প্রতিটি রুমে গিয়ে দেখা যায়, আগুনে পোড়ার ধ্বংসলীলা। রেহেনার বেডরুমের বিছানা, মশারি, খাট সবই পুড়ে ছাই। পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশের জানালা ও গ্রিল ভেঙ্গে গিয়ে পড়েছে রাস্তায়। বিস্ফোরণের তা-ব এখানেই থেমে থাকেনি। দক্ষিণের দেয়াল সবটাই ভেঙ্গে নিচে পড়ে গেছে। পশ্চিমের গ্রিল পড়ে গিয়ে পাশের বাসার জানালায় আঘাত হানায় সেটাও ্েভঙ্গে গেছে। সিঁড়ির কাছে গিয়ে দেখা যায় পাতিলের গরম ভাত পড়ে আছে স্তূপাকারে। বাসন, ঘটিবাটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে। মেঝেতে পোড়া দাগ। একটি দুটো ফ্রিজও বিস্ফোরণের আঘাতে ভেঙ্গে চুরমার। এমন প্রতি দরজার জানালার লক ও তালার হুক পর্যন্ত ভাঙ্গা।

সবুজের মতে গোটা বিস্ফোরণটাই অবিশ্বাস্য বলে মনে হচ্ছে। গ্যাসের পাইপ কিংবা সিলিন্ডার যেটা থেকেই বিস্ফোরণ হোক, পরিণাম যে এতটা ভয়াবহ হতে পারে সেটা আগে জানা ছিল না।

দোতলার অপর ভাড়াটে শাহেদা জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতি ভোরে পাশের বাসা থেকে কাজ করতে আসেন গৃহকর্মী সখিনা। রবিবার ভোরের আজানের সময় সখিনা এসে রেহেনার ঘরে ঢুকে রান্না শুরু করেন এবং দুই ঘণ্টার মধ্যেই রান্না শেষ করে যাবেন, ঠিক এমন সময় রান্নাঘরে বিস্ফোরণ ঘটে। বিকট শব্দে আমাদের সবার ঘুম ভেঙ্গে। আমরা দৌড়ে এসে দেখি পড়ে আছে তারা সবাই।

শাহেদা বলেন, রান্নাঘর থেকেই বিস্ফোরণ ঘটে থাকতে পারে। কারণ গত কয়েকদিন ধরে রান্না চুলোতে লিক থাকায় গ্যাস নির্গত হচ্ছিল। গ্যাসের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছিল। সেটা ঠিক করার জন্য দুদিন আগে মিস্ত্রিও ডাকা হয়। কিন্তু আসেনি। এরপরই এ দুর্ঘটনা। তবে রান্না শেষ করার পর কোথায় কিভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে সেটা নিশ্চিত হতে পারেনি কেউ। এ ছাড়াও গ্যাসের একটি সিলিন্ডারও ছিল বেডরুমের পাশের বেলকোনিতে। সেটাও ছিল অক্ষত। মাঝে মাঝে চুলোয় গ্যাস না থাকলে সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো।

এ প্রশ্ন উঠেছে রান্নাঘরের গ্যাস লিক থেকে বিস্ফোরণ ঘটত, ভোর পাঁচটায় সখিনা রান্নাঘরে ঢুকে ম্যাচ জালানোর পর থেকেই। রান্না শেষ করার পর সেটা কেন হলো এ হিসাব মেলাতে পারছে না কেউই।

এ বিষয়ে রেহেনার ছেলে শুভ হাসপাতালে জানান, রান্নাঘরের চুলো ধরাতে গেলে গ্যাস সংযোগের পাইপ বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ফ্ল্যাটের পাঁচ কক্ষের তিন কক্ষেই ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘরের সবাই দগ্ধ হন। প্রায় সময়ই সংযোগ থেকে গ্যাসের গন্ধ ছড়াত।

রাতে ঢামেকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রেহেনা ও সখিনার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাদের শরীরের ৫০ শতাংশেরও বেশি দগ্ধ। মেয়ে ও দুই ছেলের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত। তাদের হাত ও পা পুড়েছে।