১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আগামীকাল বড়ইতলা গণহত্যা দিবস

আগামীকাল বড়ইতলা গণহত্যা দিবস

নিজম্ব সংবাদদাতা, কিশোরগঞ্জ ॥ আগামীকাল ১৩ অক্টোবর। একাত্তরের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্বরোচিত, কাপুরুষোচিত ও নৃশংস নারকীয় হত্যাযজ্ঞটি সংঘটিত হয়েছিল বরইতলা নামক স্থানে। এখানে ৪ শতাধিক মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতদের ৩৬৫ জনের নাম পাওয়া গেছে। অন্যদের মধ্যে কেউ কেউ দুঃসময়ের স্মৃতি নিয়ে আহত ও পঙ্গুত্বের বোঝা ভয়ে বেড়াচ্ছেন আজও।

কিশোরগঞ্জ সদরের শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দক্ষিণপূর্বে নিকলী-কিশোরগঞ্জ সড়কের যশোদলের বরইতলায় পাকহানাদার বাহিনী দেশীয় তাঁবেদারদের সহায়তায় নিরীহ বাঙালির ওপর হামলা চালায়। স্বাধীনতার পর ওই এলাকাটির নাম রাখা হয়েছে শহীদনগর। মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ির অংশ হওয়ায় পাকহানাদার ও তাদের দোসরদের ওই এলাকা বিশেষ টার্গেট ছিল। ১৩ অক্টোবর একদল পাকসেনা ট্রেনযোগে শহীদনগর এসে তাদের সহযোগীদের সহযোগিতায় আশপাশের দামপাড়া, চিকনীরচর, কালিকাবাড়ি, তিলকনাথপুর ও গোবিন্দপুর গ্রাম থেকে প্রায় ৪শ’ নিরীহ লোককে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর জন্য অস্ত্রের মুখে যোগাড় করে। এরই মাঝে পাকসেনারা স্থানীয় আলবদর ও রাজাকারদের সহায়তায় গ্রামে লুটতরাজ এবং অগ্নিসংযোগ চালায়। এরপর পাকসেনারা গণনা শুরু করা হলে একজন কম পাওয়া যায়। এ সময় চিকনীরচর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার আবুল হাসিম খবর দেয় যে, মুক্তিযোদ্ধারা এলাকাবাসীর সহায়তায় একজন পাকসেনাকে মেরে ফেলেছে। এ খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে পাকসৈন্যদের অধিনায়ক জড়ো করা এলাকাবাসীকে হত্যার নির্দেশ দেয়। সঙ্গে সঙ্গে শাবল আর বেয়নটের খোঁচার পাশাপাশি চলে মেশিনগানের ব্রাশফায়ার। লুটিয়ে পড়ে শত শত মানুষ। সে সময় গণহত্যায় নিহতদের ভাগ্যে জোটেনি জীবনের শেষ গোসল। তবে দেহনিশ্রিত উষ্ণরক্তের ফোয়ারাতে তাদের শেষ গোসল সম্পন্ন হয়েছে। জীবনের শেষ প্রাপ্তি জানাজা ও কবর জোটেনি অনেকের ভাগ্যে। বরং ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল অজানার উদ্দেশ্যে নরসুন্দা নদীর পানিতে।

১৩ অক্টোবর পাকসেনা ও তাদের দোসরদের অত্যাচারে নিরাপরাধ শান্তিপ্রিয় মানুষ যারা স্বাধীনতার বেধিমূলে জীবন উৎসর্গ করেছিল তাদের স্মরণে এখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ। বেধির ওপর কালো অবয়বে শ্বেতপাথরের ফলকে খোদাই করা আছে উচ্চাসময় মিনতি ভরা উদাত্ত আহ্বান ‘দাঁড়াও পথিক বর, জন্ম যদি তব বঙ্গে তিষ্ঠ ক্ষনকাল-এ সমাধিস্থলে’। শহীদ স্মরণে নির্মিত এ স্তম্ভটির গায়ে তেমন কোনো কারুকার্য না থাকলেও স্থানীয় এলাকাবাসীর এ স্তম্ভটি মুক্তিযুদ্ধের শ্বাশ্বত চেতনা। জেলা পরিষদের অর্থায়নে স্মৃতিস্তম্ভের পাশে নির্মিত বেদীতে শহীদের নামের তালিকা সাঁটানো হয়েছে। এখানে সংঘটিত ঘটনাগুলো যেমনি মর্মান্তিক তেমনি ত্যাগের মমিমায় উজ্জ্বল।

প্রতি বছর ১৩ অক্টোবর বড়ইতলা ও পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকজন বেদনাবিধূর চিত্তে স্মরণ করেন নির্মম গণহত্যার কথা। প্রিয়জনরা শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের চোখের পানি ফেলেন। কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা ও অন্যান্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৪ বছর পরেও যে সকল রাজাকার আল বদররা এ গণহত্যার সাথে জড়িত সেই ঘাতকদের আজও কোনো বিচার হয়নি। কিশোরগঞ্জবাসী এ গণহত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।