২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সিডনির মেলব্যাগ ॥ মিত্রতা জঙ্গীবাদ নির্মূলে কাজ দেবে

  • অজয় দাশ গুপ্ত

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমাদের দেশের এক ধরনের বাম ঘরানার মানুষের ভোল পাল্টে যায়। যৌবনে বা জীবনের এক বিরাট অংশ জুড়ে এরা সোভিয়েতের সুফল ভোগ করে শেষকালে নেমেছিল তার বিরোধিতায়। আজ যদি আমরা পেছন ফিরে তাকাই তাহলে দেখব, এই মানুষগুলো কেমন করে তাদের আসল চেহারা বের করে এনেছিল। বাংলাদেশে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী রাশিয়ায় বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা খুলতেন, বেজিংয়ে রোদ হলে দেশে পাঞ্জাবি গায়ে দিতেন। এরাই রাশিয়ার দুঃসময়ে হঠাৎ কেতাব প্রণয়ন করে আমাদের জানিয়ে দিলেন- খোলা মন খোলা জানালার নাকি সময় হাজির। আরও এক ধাপ এগিয়ে জানালেন, গ্লাসনস্ত আর পেরেস্ত্রয়কাই হতে হবে আগামী দিনের রাজনীতির সূত্র। সে মানুষগুলো দুনিয়ার ভারসাম্য নিয়ে চিন্তা করেননি। একবারও ভাবেননি আমেরিকার মতো দেশের হাতে দুনিয়ার ভার গেলে ভারসাম্যের অবস্থা কী হতে পারে! হয়ত তারা জানতেনও। কিন্তু সবার ওপর স্বার্থ। সবার ওপর লবিং আর কানেকশন। এখন তো এটা পরিষ্কার এরা আগেই জানতেন কেন এবং কোথায় কী হতে যাচ্ছে। সে চক্রের ফলাফলে দুনিয়ার অবস্থা যখন ত্রাহি ত্রাহি তখনও এরা নিজেদের অবস্থান বজায় রাখার জন্য মরিয়া। আজ দুনিয়া জুড়ে সন্ত্রাস আর জঙ্গীবাদের ভয়াবহ আগ্রাসন। আইএস নামের নতুন দানব বাংলাদেশের শান্তি বিনষ্ট করতে উদ্যত, যার যোগসূত্র আন্তর্জাতিক। এ সমস্যার একা সমাধান অসম্ভব।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এটা স্পষ্ট যে, জঙ্গীবাদের প্ররোচনা দেশে যেমন, তেমনি এর উৎস আছে বিদেশের মাটিতে। সোভিয়েত পতনের পর এই দানব এতটাই আগ্রাসী যে, তাকে রোখাও প্রায় অসম্ভব কাজ।

দুনিয়ার যেসব দেশে আজকাল মারামারি আর হানাহানি, যাদের জীবনে শান্তি বলতে কিছু নেই, তাদের বাস্তবতা কি আসলে তাদের তৈরি? আফগানিস্তানে একদা বিপ্লবের বীজ রোপিত হয়েছিল। সেই কবে সৈয়দ মুজতবা আলী এ দেশ নিয়ে লিখতে গিয়ে লিখেছিলেন- ডাকাত মাথায় পড়ল মুকুট আর মোল্লারা করল আশীর্বাদ। সে দেশের সরল মানুষের বিশ্বাসকে পুঁজি করে ধর্মের নামে অনাচার চলছে অনেককাল ধরে। কিন্তু সে অচলায়তনে আঘাত হেনে যারা তাকে সাম্যের পথ দেখিয়েছিল, তাদের করুণভাবে প্রাণ দিতে হয়েছিল। জোব্বা-কুর্তা ছেড়ে স্যুট-টাই পরা আফগানীদের নেতৃত্বে আসা বারবাক কারমাল, নূর মোহাম্মদ তারাকীদের নির্মমভাবে হত্যার পেছনে যে মৌলবাদ তার পেছনে ছিল আমেরিকা। আমেরিকার সৃষ্ট তালেবান এক সময় তাদের বৈরী হয়ে উঠল। কিন্তু আজ অবধি সে সমস্যার সমাধান হয়নি। একটা বিষয় তো ইতিহাসে দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে, আমেরিকা যখন কোন যুদ্ধে যায় বা যুদ্ধের আবহ তৈরি করে তার কোন সময়সীমা থাকে না। সে যুদ্ধ যেন নিরন্তরকাল চলার কোন ঘটনা। যতদিন বা যতক্ষণ পর্যন্ত না বিতাড়িত বা পরাজিত হচ্ছে ততদিন তারা তা চালাতেই থাকে। কে না জানে বিশ্বে আমেরিকার অস্ত্র ব্যবসা মানেই এক ধুন্দুমার জগত। সে দেশে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা যুদ্ধবিরোধিতার বিরুদ্ধে মিছিল করে। কী করে তারা শান্তির জন্য মরিয়া হবে কিংবা যুদ্ধ বন্ধ করতে আগ্রহী হবে? সে কারণে যেসব দেশে আমেরিকা যুদ্ধ বাধায় তার কোন শেষদিন বা জয়-পরাজয় নেই। আমাদের দেশেও তাই ঘটতে চলেছিল। একাত্তরে বিজয়ের ঠিক আগে আগে আমেরিকা পাকিদের সাহায্যের জন্য সপ্তম নৌবহর পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। পাঠিয়েও দিয়েছিল। কিন্তু মাঝপথে তারা খবর পায় রাশিয়াও বসে নেই। তারা তাদের মিত্র ভারত ও বাংলাদেশের সহায়তায় কুড়িতম রণতরী পাঠাচ্ছে, তখন হাস্যকরভাবে পিঠটান দেয় তারা। নির্লজ্জভাবে জানায়, তাদের নাকি উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরা। আমেরিকার যুদ্ধের ইতিহাস কোনদিনও জয়ের কিছু নয়। ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশ, কোথাও তারা জেতেনি। এমন নয় যে, তারা জিততে পারত না। আসলে জেতা-হারা নয়, আমেরিকার কাজ হচ্ছে যুদ্ধ জিইয়ে রাখা। আইএস সমস্যাও তাদের হাতের পাঁচ।

কিন্তু সময় কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। আমেরিকার একক মোড়ল হওয়ার দিন শেষের পথে। তাদের অজান্তে রাশিয়া আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নানাবিধ জুজুর ভয়ে অস্থির সময় ও দেশগুলোকে নতুন ভরসা জোগাতে এগিয়ে এসেছে লেনিনের দেশ। লেনিনের উত্তরসূরি পুতিন ছেড়ে কথা বলার মানুষ নন। তিনি কথিত একঘরে ইরানকে সঙ্গে নিয়ে আইএস নিধনে যে সাফল্য দেখিয়েছেন তাতে এটা স্পষ্ট যে, এতদিন ধরে যা চলছিল তার নাম যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। এ ঘটনা আমাদের জন্য নতুন পথের দিশারী। আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মিত্র চেনার নতুন সুযোগ হাজির। বহুকাল আগের কথা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহরু তখন আন্তর্জাতিক বন্ধু নির্ণয়ে বড় দুই দেশের পথে। ভারত তখন আজকের ভারত নয়। ভারত তখন যুদ্ধবিগ্রহ, জনসংখ্যা ও অর্থনীতির চাপে। নেহরু প্রথম গিয়েছিলেন আমেরিকায়। শীতার্ত আমেরিকায় তাঁকে এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এসেছিল এক সেক্রেটারি। প্রায় দু’দিন বসিয়ে রেখে দেখা দিয়েছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আর কর্তাব্যক্তিরা। সে সফরে মনের কথা মনে চেপে নেহরু গিয়েছিলেন পরের গন্তব্য রাশিয়ায়।

বরফ মোড়ানো মাইনাসে ঢাকা মস্কো বিমানবন্দরে টুপি মাথায় দাঁড়িয়েছিলেন স্বয়ং ক্রুশ্চেভ। ঠা-া ঝড়ে সে রাতের অভ্যর্থনা ও উষ্ণতা নেহরু কোনদিন ভোলেননি। সেইদিনই তাঁর আন্তর্জাতিক মিত্র চেনা হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, আমেরিকা আর রাশিয়ার আচরণ ও বন্ধুত্বের ফলাফল আজীবন ভোগ করেছে ভারত। ইতিহাস বলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া এমনকি আমাদের দেশেও আমেরিকার ইতিহাস পরাজয়ের ইতিহাস। আর রাশিয়ার ইতিহাস বিজয়ের।

সাম্যবাদ দমনের নামে দুনিয়াকে আপাতত তালুবন্দী ভাবলেও মূলত তাদের মিত্রতা বালির বাঁধ। অন্যদিকে আজকের আতঙ্ক আইএস দমনেও রাশিয়াই অগ্রণী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে আজ অবধি তাদের জয়ের ধারাবাহিকতা আমাদের মতো দেশের জন্য জরুরী।

এটা ঠিক করতে পারলে দেশের রাজনীতিতে বিদেশীদের কাছে ধরনা দেয়ার প্রবণতা কমবে। দালালি আর মীরজাফরীর রাজনীতিও পথ হারিয়ে ফেলবে। জামায়াত-বিএনপির মতো বিধ্বংসী দলগুলোকে সাইজে রাখাও হবে সম্ভব।

dasguptaajoy@hotmail.com

নির্বাচিত সংবাদ