২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

শৈশবের স্মৃতি

(১২ অক্টোবরের পর)

আমাদের চতুর্থ শ্রেণীর ক্লাস শিক্ষক ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। যিনি ইতিহাস ও ইংরেজী পড়াতেন। তার সঙ্গে আমার খুব মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং সেই সম্পর্কের ভিত্তি ছিল ইংরেজীতে আমার দক্ষতা। তার বাড়ি ছিল মৌলভীবাজারে, তবে অবসর নেবার পর তিনি সিলেটের কুমারপাড়ায় বসবাস করতেন। সেই সময়েও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। তিনি আমাকে নিয়ে গর্ব করতেন এবং তার সূচনা যখন ছাত্র ছিলাম তখন থেকে। তিনি একদিন বললেন, ‘তুমি তো ইংরেজীতে ভাল। ইংরেজীতে বক্তৃতা দিতে পারবে?’ আমি বললাম যে, আমি চেষ্টা করতে পারি। তার পরে তিনি ক্লাসে একদিন আমাকে বক্তৃতা দিতে বললেন। বলা যেতে পারে যে, তিনি আমাকে একজন ইংরেজীতে বক্তৃতা দেয়ার উপযুক্ত ছাত্র বলে মনে করতেন। এই সময় আসাম সরকারের জনশিক্ষা বিভাগের ডাইরেক্টর (ডাইরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন) এস. এন. সেন স্কুল পরিদর্শনে আসেন। আমার শিক্ষক বললেন যে, ডাইরেক্টর সাহেব আমাদের ক্লাসে এলে আমি সুযোগ নেব যাতে তুমি একটা বক্তৃতা দিতে পার। ডিপিআই সাহেব তার লোকজন নিয়ে এবং হেডমাস্টারের সঙ্গে আমাদের ক্লাসে এলেন। তিনি পরিদর্শন করে যখন যেতে উদ্যত হয়েছেন তখন আমাদের ক্লাস শিক্ষক বললেন যে, Sir, I have a student who can deliver aû speech in English. Would you be interested in listening to him?। ডিপিআই সাহেব থেমে গেলেন এবং বললেন, তোমার ছাত্রকে বক্তৃতা দিতে বলো। আমি একটি বক্তৃতা খানিকটা তৈরি করে রেখেছিলাম তাকে অভিনন্দন জানাবো বলে এবং সেটার খসড়া প্রস্তুত করি মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সিলেটের একটি ছাত্রদের মাসিক পত্রিকা ‘সবুজ পতাকায়’ যে বাণীটি দিয়েছিলেন সেইটি অনুকরণ করে। ডিপিআই সাহেব খুব খুশি হলেন। আমার শিক্ষক যেন বাজিমাত করলেন এবং রাতারাতি আমি স্কুলে বিখ্যাত হয়ে গেলাম। চতুর্থ শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণীতে উন্নীত হওয়ার সময় আমি প্রথম ১০ জনের মধ্যে একটি স্থান করে নিলাম। কিন্তু স্কুলজীবনে আমি কখনও ক্লাস পরীক্ষায় প্রথম হতে পারিনি এবং তা নিয়ে আমার খুব খেদও ছিল না।

আমাদের স্কুলে টিফিনের ব্যবস্থা ছিল এবং টিফিন প্রায়ই ছিল আদা ও লবণ মিশ্রিত ভেজা ছোলা। এটিকে খুব স্বাস্থ্যসম্মত খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হতো। মাঝে মাঝে অবশ্য সন্দেশ বা সিঙ্গাড়া দেয়া হতো। আমরা ছোলা খেতাম বলে অন্য স্কুলের ছেলেরা আমাদের ঘোড়া বলে বিদ্রƒপ করত। তারা বলত তোমরা তো ঘোড়ার খোরাক খাও। আমরাও জবাব দিতাম, ‘আমরা তো তবুও ঘোড়ার খাবার খাই, তোমাদের তো কোন টিফিনই নেই।’ কারণ তখন সব স্কুলে টিফিনের ব্যবস্থা ছিল না।

পঞ্চম শ্রেণীতে আমাদের ক্লাসে একটি মজার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো। ক্লাস শিক্ষক আমাদের সব ছাত্রকে দুই ভাগে ভাগ করে দিতেন। যারা ডানপাশে বসে তারা একটি দল, যারা বামপাশে বসে তারা আর একটি দল। এই দুই দলের মধ্যে তিনি জ্ঞানের প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান করতেন নানা বিষয়ে। নানা ধরনের প্রশ্ন করা হতো। যে দল সঠিক উত্তর দিতে পারত না তারা হারত এবং যে দল সঠিক উত্তর দিতে পারত তারা হতো বিজয়ী। এই সমুদয় প্রক্রিয়াটি লেখাপড়ার জন্য খুবই উত্তম ছিল। যেমন- প্রতিটি দলের ভাল ছাত্ররা তখন দুর্বল ছাত্রদের তালিম দিত, যাতে তারাও প্রশ্নোত্তর দিতে সক্ষম হয়। আমার মনে হয় আমি তেমন ভাল ছাত্র না হলেও তালিম দিতে খুব ওস্তাদ ছিলাম। আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুখময় চক্রবর্তী (জন্ম: ২৫ জুলাই ১৯৩৪ এবং মৃত্যু ২২ আগস্ট ১৯৯০) এই বিষয় নিয়ে মজা করত। সে আমাকে বিদ্রƒপ করত এই বলে যে, আমি সব বুড়ো বুড়ো ছেলের বাচ্চা শিক্ষক ছিলাম। সেও কিন্তু মাস্টারিতে কম যায় না। দিল্লীর স্কুল অব ইকোনমিক্সের একজন প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক ছিল সুখময় চক্রবর্তী। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই সুখময় চক্রবর্তী বাংলাদেশে ভারতীয় প্ল্যানিং কমিশনের প্রতিনিধি হিসেবে আসে এবং প্রথমদিকে আমাদের বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নে নানা ধরনের সহায়তা প্রদান করে। সুখময় চক্রবর্তীর পিতা সোমনাথ চক্রবর্তী সিলেটে তিন বছর মুন্সেফ অথবা সাবজজ ছিলেন। তিনি পরবর্তীকালে ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি হন। তাদের বাড়ি ছিল ময়মনসিংহে। সুখময় তুখোড় ছাত্র ছিল। কলকাতার বালিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে ১৯৪৯ সালে সে পশ্চিমবঙ্গের প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে এবং প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে পড়াশোনা করে। নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেনও তার সহপাঠী ছিলেন। সে নেদারল্যান্ডস থেকে নোবেল লরিয়েট ঔধহ ঞরহনবৎমবহ-এর অধীনে অর্থনীতিতে পিএইচডি করে এবং এক সময় হার্ভার্ডে শিক্ষকতা করে। সে এক সময় ভারতের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা কমিশনের চেয়ারম্যান ছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করে। তিন বছরব্যাপী একসঙ্গে পড়াশোনা আমাদের মধ্যে একটি অটুট বন্ধুত্ব স্থাপন করে।

আমি যখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা নাটকে অভিনয় করার জন্য একটি প্রচেষ্টা নিই। কিন্তু আমি তাতে মনোনীত হতে পারলাম না। তার প্রতিশোধ নিলাম ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’-এ ইংরেজী নাটকে বাসানিওর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে। এছাড়া স্কুলে থাকতে ‘নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা’ নাটকেও আমি ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পাই। আমাদের সময় স্কুলে বেশ জাঁকজমক করে বার্ষিক সাহিত্য সম্মেলন হতো। তাতে প্রবন্ধ লেখা, কবিতা আবৃত্তি, বক্তৃতা প্রদান ইত্যাদি বিষয়ে প্রতিযোগিতা হতো এবং একটি বড় ধরনের অনুষ্ঠানে পুরস্কার দেয়া হতো। পুরস্কার প্রথমেই দেয়া হতো যারা পরীক্ষায় ভাল করত তাদের এবং পরে অন্যদেরও দেয়া হতো। এসব অনুষ্ঠানে সবসময়ই একজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে প্রধান অতিথি করা হতো। আমার মনে আছে যখন আমি নিম্ন শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম তখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী স্যার মোহাম্মদ সাদুল্লাহ একটি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক মন্ত্রী মিস মবিস ড্যান। আমি এই মহিলার হাত থেকে কয়েকটি পুরস্কার গ্রহণ করি। আমার জীবনের প্রথম পুরস্কারটি পাই আমি যখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। পুরস্কার ছিল একটি বই। যেখানে বিভিন্ন ধরনের খেলা সম্বন্ধে তথ্য ছিল। এই বইটির নামও মনে নেই, তার লেখকের নামও জানি না। এই বইটি যেদিন পুরস্কার পাই সেদিনই আমরা নানাবাড়িতে লম্বা সফরে যাই। সেখানে আমার মামা স্থানীয় সৈয়দ শাব্বির আহমদ একটি গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই গ্রন্থাগারটি এখনও চলছে। সেই গ্রন্থাগারে আমি আমার প্রথম পুরস্কার এই বইটি দান করি। কিন্তু বইটি পরে আর দেখতে পাইনি। আমি জীবনে যত সব বই পুরস্কার পেয়েছি সম্ভবত এই বইটি ছাড়া অন্য কোন বই আর হারায়নি।

আমার আর একটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে আছে, তা হলো- সিলেটে রাজার স্কুলে মুসলিম লীগ আয়োজিত একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে আমি আবৃত্তি করি স্থানীয় কবি মরহুম আবদুর রাজ্জাকের লেখা একটি কবিতা ‘সিরাজ আবার তোমারে চাই’। এই আবৃত্তি করার পর পিএম শাহাবুদ্দীন নামে একজন রাজনৈতিক নেতা একটি স্বর্ণপদক ঘোষণা করলেন। পিএম শাহাবুদ্দীন সিলেটে বহিরাগত ছিলেন। তার পিতা ব্যবসা সূত্রে কাশ্মীর সীমান্ত থেকে সিলেটে এসে চারাদীঘির পাড়ে বসতি স্থাপন করেন। তাদের ছিল মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। শাহাবুদ্দীন রাজনীতি করে সম্ভবত মুসলিম লীগের দফতর সম্পাদক নির্বাচিত হন। তাদের বাড়িটিও ছিল বেশ বড় এবং সুন্দর। পিএম শাহাবুদ্দীন কিশোরদের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং তার বাড়িতেও আমাদের সভা-সমিতি করতে দিতেন। তার কোন সন্তান ছিল না এবং সম্ভবত তিনি অবিবাহিত ছিলেন। এই স্বর্ণপদকটি আমি কোনদিনই পাইনি; কিন্তু সেজন্য কোন খেদ ছিল না। কারণ শাহাবুদ্দীন অত্যন্ত সজ্জন এবং বড় মনের মানুষ ছিলেন। বিশেষ করে টাকা-পয়সার ব্যাপারে তিনি দরাজ হাত ছিলেন। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় যে, ১৯৪৮ সালে তিনি একটি হত্যা মামলায় জড়িয়ে পড়েন। আবদুল বারী (কালা) নামের একজন যুবক ছিলেন মুসলিম লীগের উৎসাহী কর্মী এবং তিনি সচরাচর ঢাক-ঢোল দলের নেতৃত্ব দিতেন। তিনি সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন এবং মোটামুটিভাবে লম্বা ছিলেন। একদিন সকালে খবর পাওয়া গেল যে, তিনি আঁততায়ীর হাতে রাত্রিবেলা নিহত হয়েছেন। আমরা শুনলাম যে, রাজনৈতিক রেষারেষির কারণে জনাব শাহাবুদ্দীনের প্ররোচনায় কিছু গু-া তাকে হত্যা করে। এই মামলা হাইকোর্ট পর্যন্ত যায় এবং বিচারে জনাব শাহাবুদ্দীনের যাবজ্জীবন কারাদ- হয়। কারাগারে শাহাবুদ্দীন একজন অত্যন্ত ভাল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান এবং জেলাররা তাকে খুব সমীহ করতেন। আমি সম্ভবত সাত বছর পর যখন জেলে ছিলাম তখন শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে দেখা হয়। শাহাবুদ্দীন উচ্চশ্রেণীর কয়েদী ছিলেন। তার খানাদানা ভাল ছিল। সেখান থেকে তিনি প্রায়ই আমাদের জন্য খাবার পাঠিয়ে দিতেন। আমাদের ছাত্রদের জেলবাসের সময় তিনি আমাদের প্রতিবেশী ছিলেন এবং সারাদিনই আমাদের সঙ্গ দিতেন ও নানা কাহিনী শোনাতেন। তিনি প্রায় ১১/১২ বছর জেল খেটে মুক্তি পান এবং নিজের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু মুক্ত শাহাবুদ্দীন সহসাই পরলোকের ডাকে আর জীবন উপভোগ করতে সক্ষম হননি। আমার কেন জানি কোনদিনই মনে হয়নি যে, এ রকম একজন সুশ্রী ও সজ্জন মানুষ একটি হত্যাকা-ের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। অবশ্য এ ব্যাপারে তিনি নিজে কোনদিন কোন কথা বলেননি। চলবে...

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া