২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

একই সূত্রে গাঁথা এসব হত্যাকা-ে জেএমবি জড়িত

  • তদন্তকারীদের ধারণা

গাফফার খান চৌধুরী ॥ শুধু ফাদার লুক হত্যাচেষ্টা নয়, বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা খিজির খান, গোপীবাগে কথিত পীর লুৎফর রহমান ফারুক ও তার ছেলেসহ ৬ জন ও তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আইয়ের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা একইসূত্রে গাঁথা। হত্যাকা-ের সঙ্গে জেএমবি জড়িত বলে তদন্তকারীদের ধারণা। এমনকি গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যাকা-ে জেএমবির জড়িত থাকাও বিচিত্র নয়। ইতোমধ্যেই ব্লগার হত্যাকা-েও জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠীর যোগসূত্র থাকার অনেক আলামত পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই কোন বিশেষ গোষ্ঠী জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা অন্য কোন নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন দ্বারা এসব হত্যাকা-ের ঘটনা ঘটাচ্ছে। আর আইএস কর্তৃক এসব হত্যার দায় স্বীকার করে দেশকে আন্তর্জাতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকেও এমনটাই দাবি করা হচ্ছে।

গত ৫ অক্টোবর সকালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদীর ব্যাপ্টিস্ট মিশনের ফেইথ বাইবেল চার্চ অব গড-এর ফাদার লুক সরকারকে স্কুলপাড়ার ভাড়া বাসায় তিন যুবক ধর্মের বাণী শোনার ছলে বাসায় ঢুকে গলা কেটে হত্যাচেষ্টা করে। তার চিৎকারে লোকজন জড়ো হলে হত্যাচেষ্টাকারীরা পালিয়ে যায়। পরদিন ওবায়দুর রহমান (২২) নামে এক ছাত্র শিবির কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ওবায়দুল তাদের কর্মী নয় বলে শিবির দাবি করেছে।

সোমবার পাবনার পুলিশ সুপার আলমগীর কবির পরাগ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ফাদার হত্যাচেষ্টায় জেএমবির এক আঞ্চলিক কমান্ডার রাকিবুল ইসলাম রাকিব ওরফে তাওহিদ (৩০) ও জেএমবি সদস্য জিয়াউর রহমান (৩৫), শরিফুল ইসলাম তুলিব (২২), মোঃ আলীম (৩৬) ও মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন (৩০) গ্রেফতার হয়। গ্রেফতারকৃতরা সবাই ছাত্র শিবিরের সদস্য ছিল। দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করতেই গ্রেফতারকৃতরা ধর্মযাজককে হত্যার চেষ্টা চালায়।

ফাদার লুকের হত্যাচেষ্টার দিনই গত ৫ অক্টোবর রাত পৌনে ৮টার দিকে রাজধানীর বাড্ডা থানাধীন মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকার জ- ব্লকের ১০/১ নম্বর বাড়িতে গলা কেটে হত্যা করা হয় পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে। ৬ তলা বাড়ির তৃতীয় তলায় খিজির খানের পরিবারের যেসব সদস্য বাসায় ছিল তাদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে পর্দার কাপড় কেটে হাত পা বেঁধে রাখে। বাড়িটির দ্বিতীয় তলায় খানকা শরীফে পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান খিজির খানকে হাত পা বেঁধে গলা কেটে হত্যার পর লাশ অজুখানায় ফেলে রাখে। ব্যক্তিজীবনে খিজির খান নকশেবন্দিয়া মুজাদ্দেদীয়া তরিকতের ‘রহমতীয়া খানকা শরীফ’ এর ঈমাম ছিলেন।

গুলশান জোনের উপ-কমিশনার এসএম মোস্তাক আহমেদ খান বলেছেন, ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে খিজির খানকে হত্যা করা হতে পারে। এমন দাবি ওঠেছে খিজির খানের ভক্ত ও পরিবারের তরফ থেকেও। তারা বলছেন, ধর্মের নামে নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে যারা অর্থ নিতেন তাদের বিরুদ্ধে ছিলেন খিজির খান। তাদের ধর্ম ব্যবসায়ী হিসেবেও বয়ান করতেন তিনি। এজন্য তার শত্রু থাকা খুবই স্বাভাবিক।

মামলাটির ছায়া তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেছেন, ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণেই খিজির খানকে হত্যা করা হয়েছে বলে অনেকটাই নিশ্চিত হওয়া গেছে। হত্যাকা-ের সঙ্গে জেএমবির জড়িত থাকার সম্ভবনা বেশি।

ডিবির একজন উর্ধতন কর্মকর্তা বলছেন, ব্লগার হত্যা থেকে শুরু করে হালনাগাদ সব চাঞ্চল্যকর খুনের সঙ্গেই জেএমবি, আনসারুল্লাহ বাংলা টিমসহ বিভিন্ন উগ্র মৌলবাদী এবং নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠনের কোন না কোনভাবে যোগসূত্র রয়েছে। এমনকি চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী ব্লগার ড. অভিজিত রায় ও গুলশানে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা হত্যায়ও জেএমবির জড়িত থাকা বিচিত্র নয়।

নিষিদ্ধ বিভিন্ন জঙ্গী সংগঠন এসব হত্যাকা- ঘটিয়ে আইএসের নামে দায় স্বীকার করা হচ্ছে। এটি হত্যাকারী ও হত্যাকারী সংগঠনের কৌশল। আইএসের নামে দায় স্বীকার করে প্রকৃত হত্যাকারীরা নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে সন্ত্রাসী ও জঙ্গী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে কূটনৈতিকভাবে চাপে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ কোন গোষ্ঠী এসব হত্যাকা-ের নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছে বলে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার হওয়াদের জবানবন্দী এবং জব্দকৃত আলামত পর্যালোচনায় তেমন ধারণারই জন্ম দিচ্ছে।

এ বিষয়ে ডিবির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার মাহফুজুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, সবদিক মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে। ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলা ও খিজির খান থেকে শুরু করে ব্লগার হত্যার মতো চাঞ্চল্যকর সব হত্যাকা-ের সঙ্গে জেএমবির জড়িত থাকা বিচিত্র নয়। এসব পরিকল্পিত হত্যার সঙ্গে বিশেষ একটি গোষ্ঠী জড়িত থাকতে পারে।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত বারবারই বলে আসছেন, বাংলাদেশে আইএসের কোন তৎপরতা নেই। আইএসের নামে এসব হত্যার দায় স্বীকার করে বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে বিশ্বের কাছে চাপে রাখার অপচেষ্টা মাত্র।

প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক প্রকৌশলী, লেখক ও ব্লগার ড. অভিজিত রায়কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। বাধা দিতে গিয়ে আহত হন তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। গত ২৮ সেপ্টেম্বর গুলশান কূটনৈতিক পাড়ায় ইতালীয় নাগরিক সিজার তাভেলাকে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর গত ৩ অক্টোবর রংপুরে জাপানী নাগরিক হোশি কুনিওকে একই কায়দায় গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এর আগে খিজির খানের মতো ২০১৩ সালের ২১ ডিসেম্বর রাজধানীর ওয়ারীর রামকৃষ্ণ মিশন রোডের একটি বাড়িতে ইমাম মাহদীর প্রধান সেনাপতি ও বিশ্বত্রাণ কর্তা দাবিদার লুৎফর রহমান ফারুক (৫৫) ও তার ছেলে সানোয়ারুল ইসলাম মনিসহ (৩০) ৬ জনকে এবং ২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট তেজগাঁওয়ের পূর্ব রাজাবাজারের নিজ বাড়িতে বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল আই-এর শান্তির পথে ও কাফেলা নামক ইসলামী অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুুরুল ইসলাম ফারুকীকে হত্যা করা হয়।