২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গীরা সমাজে অচ্ছুৎ-মারা গেলে দাফন হয় বেওয়ারিশ!

  • স্বজনরা পর্যন্ত লাশ নিতে আসেন না, পরিচয় দেন না

শংকর কুমার দে ॥ নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গী সংগঠনগুলোর সদস্যদের প্রতি সমাজে ঘৃণা, বিদ্বেষ, নিন্দা, ধিক্কার সৃষ্টির অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে। এমনকি জঙ্গীদের মা-বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজনরা পর্যন্ত তাদের পরিচয় দিচ্ছে না লজ্জায়। কোন অপারেশনে মারা গেলে তাদের লাশ হয়ে যাচ্ছে বেওয়ারিশ। মর্গ থেকে কেউ নিতেও আসছে না। বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই দাফন হচ্ছে নিহত জঙ্গীরা। গত সপ্তাহে চট্টগ্রামে নিহত জামা‘আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সামরিক শাখার প্রধান জাবেদ নিহত হওয়ার পর তার লাশ কেউ নিতে না আসায় বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে। জঙ্গীদের প্রতি সমাজ সচেতনতার কারণে তাদের আত্মপরিচয় গোপন করে চলতে হয়। সমাজ জঙ্গীদের ঘৃণার চোখে এবং মা-বাবা লজ্জায় জঙ্গী সন্তানদের পরিচয় দেয় না।

গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর থেকে গ্রেনেড-বিস্ফোরণ-অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেফতার করা হয় জেএমবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সামরিক শাখার প্রধান মোহাম্মদ জাবেদকে। এর পর পুলিশ তাকে নিয়ে অভিযান পরিচালনার সময় গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত হয় জাবেদ। তারপর দুই দিন তার লাশ পড়েছিল মর্গে। কিন্তু পরিবারের কেউ তার লাশ গ্রহণ করতে আসেনি। এরপর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করা হয়। গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত জাবেদের বাড়ি চট্টগ্রামের মীরাসরাই উপজেলায়। তবে কোন গ্রাম বা তার পূর্ণ পরিচয় পুলিশ জানাতে পারেনি। টেক্সটাইল প্রকৌশল নিয়ে পড়ালেখা করা জাবেদ ২০১২ সাল থেকে জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়। সে জেএমবির সামরিক শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আত্মঘাতী দলের সদস্য ছিল। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সদরঘাটের বাংলাবাজারে ছিনতাইয়ের সময় নিজেদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে নিহত দুই জেএমবি সদস্যকেও বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করেছিল আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম। চট্টগ্রাম মেডিক্যালের মর্গ থেকে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলামকে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।

আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের অনুরোধে আমরা জেএমবি নেতা জাবেদের মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে নগরীর চৈতন্যগলিতে দাফন করেছি।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, নিষিদ্ধ জেএমবির সামরিক কমান্ডার জাবেদসহ কয়েক সদস্য ছিল আত্মঘাতী স্কোয়াডের সদস্য। তারা পুলিশের অভিযান পরিচালনার সময়ে নিজেদের ছোড়া গ্রেনেড-বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়েছে। তারপর তাদের লাশ পরিবার পরিজনের কেউ নিতে আসেনি। মর্গে পড়ে থাকার পর বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে তাদের দাফন করা হয়েছে।

গত ৫ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যায় নগরীর কর্ণফুলী থানার খোয়াজনগর এলাকায় একটি ভবনের নিচতলা থেকে জেএমবি চট্টগ্রামের সামরিক শাখার কমান্ডার মোহাম্মদ জাবেদের বাসা থেকে নয়টি শক্তিশালী হ্যান্ড গ্রেনেড ও বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জাম, অস্ত্র তৈরির মেশিন, একটি বিদেশী পিস্তল, দশটি ছোরা, দুইশ রাউন্ড এ কে ২২ অস্ত্রের গুলি, জিহাদী বই উদ্ধার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। ওই দিন নগরীর অক্সিজেন ও মাদারবাড়ি থেকে মাহবুব, কাজল, বাবু ও ফুয়াদ নামে আরও চার সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তবে মঙ্গলবার ভোর রাতে জাবেদকে নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ বায়েজিদ থানার অনন্যা আবাসিক এলাকায় গ্রেনেড উদ্ধারের অভিযানে গেলে সেখানে গ্রেনেড বিস্ফোরণে মারা যায় জেএমবি নেতা জাবেদ।

এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সদরঘাটের বাংলাবাজারের জনতা ব্যাংকের সামনে গুলি করে ছিনতাইকালে জনতার প্রতিরোধে গ্রেনেড বিস্ফোরণ করে পালিয়ে যাওয়ার সময় নিহত হয় দুই জেএমবি সদস্য। দুই দিন পর গত ২৫ সেপ্টেম্বর তাদেরও বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম দাফন করে। সে সময় তাদের নাম পরিচয় জানা গেলেও কেউ লাশ নিতে আসেনি।

গত ৫ অক্টোবর জেএমবির সামরিক কমান্ডার জাবেদ নিহত হওয়ার আগে যখন গ্রেফতার হয় তখন তার সঙ্গে গ্রেফতার হয়েছিল পাঁচ জেএমবি সদস্য। গ্রেফতারের পর তাদের নাম পরিচয়ও নিশ্চিত হয় পুলিশ। গ্রেফতার হওয়া পাঁচ জনের একজনের নাম হচ্ছে বুলবুল আহমেদ ওরফে ফুয়াদ।

ফুয়াদ গ্রেফতার হওয়ার পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, ছিনতাইয়ের ঘটনার সময়ে নিজেদের ছোড়া গ্রেনেড বিস্ফোরণে মারা যান জেএমবি সদস্য রফিক ও রবিউল। আটক মাহবুব, কাজলও ছিনতাইয়ে গিয়ে বিস্ফোরণে নিহত রফিকের তিন ‘ভাই’। এই তিন ভাইয়ের বাড়ি হচ্ছে নোয়াখালী জেলায়। আর তাদের ভাগ্নি জামাই হচ্ছে গাইবান্ধার বুলবুল আহমেদ ওরফে ফুয়াদ, যাকে গোয়েন্দা পুলিশ জেএমবির চট্টগ্রাম অঞ্চলের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

লাশ নিতে না আসা সম্পর্কে আটক ফুয়াদ জানায়, জেএমবির সাংগঠনিক নির্দেশ হচ্ছে, অপারেশনে মারা গেলেও কারও নাম-ধাম-পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। এ জন্যই রফিকের মৃত্যুর খবর জেনেও তার লাশ নিতে কেউ যায়নি। জঙ্গী সংগঠনের সিদ্ধান্ত হচ্ছে আপন ভাই মারা গেলেও ধরা পড়ার ভয়ে লাশ গ্রহণ করতে না যাওয়ারও সিদ্ধান্ত রয়েছে। এমনকি একজনের নাম ছয়-সাতটি হওয়ায় নিজ সংগঠনের একজন আরেকজনকেও চেনে না। একেকজন একেক নামে চেনে।

গোয়েন্দার এক কর্মকর্তা বলেছেন, জেএমবির নিহত সামরিক কমান্ডার জাবেদকে তার সহযোগী বাবু ও ফুয়াদ চিনত মেহেদী নামে। আটকের পর মেহেদী কোনটা গোয়েন্দা পুলিশ জিজ্ঞেস করে বাবুকে। বাবু তখন জাবেদকে দেখিয়ে দিয়ে বলেছিল, এই হচ্ছে মেহেদী। জেএমবিসহ জঙ্গী সংগঠনগুলোর সদস্যরা একেক জনে একাধিক নামে পরিচিত হওয়ায় কেউ কাউকে প্রকৃত নামে চেনে না। এমনকি তারা মা-বাবা, ভাই, বোন, আত্মীয়স্বজন ও সমাজ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। সমাজ তাদের ঘৃণাভরে দেখে এবং তাদের মা-বাবা লজ্জায় সমাজে জঙ্গী সন্তনের পরিচয় দেন না।