২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফিলিস্তিন আরবদেরই

অনলাইন ডেস্ক ॥ তেল আভিভের বেন গুরিয়েন বিমানবন্দর থেকে বেরিয়ে কনভয় মুখ ঘুরিয়ে নিল উত্তর পশ্চিম দিকে। রুক্ষ সাদাটে পাহাড়় কেটে তৈরি প্রশস্ত হাইওয়ে ধরে এর পর পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বেইতুনিয়া চেক পয়েন্ট! বিতর্কিত সীমান্তের কথা যেখানে জানান দিচ্ছে কংক্রিটের পাঁচিল, কাঁটাতারের বেড়া, বেআইনি পারাপারের চেষ্টা রুখতে লাল রঙের সাইনবোর্ডের কড়া শাসানি। দেমাকে নল উঁচিয়ে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র, হাজির শতাধিক বৈদ্যুতিন চোখও। গাড়ি থেকে নেমে সীমান্তটুকু হেঁটে পার হতে হল ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কেও। এ দিকের গাড়ি ও দিকে যাবে না। ওপারে রামাল্লায় অপেক্ষা করছে অন্য কনভয়। চলতে চলতেই বাঁ হাতের কব্জি ঘুরিয়ে সময়টা এক বার দেখে নিলেন রাষ্ট্রপতি। ১১ টা ২৯ মিনিট। সময়টা ঢুকে পড়েছে ইতিহাসে। কারণ, এই প্রথম প্যালেস্তাইনে পা রাখলেন ভারতের কোনও রাষ্ট্রপতি।

নরেন্দ্র মোদী সরকারের বহুমেরুর রাজনীতির দূত হয়ে পশ্চিম এশিয়ায় ভারসাম্যের বার্তা দিচ্ছেন রাষ্ট্রপতি। ইজরায়েলের পাশাপাশি আরব দেশগুলিকেও বোঝাতে চাইছেন, তাদের লড়াইয়ে ভারতের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। স্বাধীন প্যালেস্তাইনের দাবির প্রতি প্রথম থেকেই সহানুভূতিশীল দিল্লি। আজ রামাল্লার হাতে টেকনো পার্ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি গড়তে ১ কোটি ৮০ লক্ষ ডলার তুলে দিয়ে ফের সংঘর্ষক্লান্ত প্যালেস্তাইনিদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিল ভারত।

আরব মুলুকের বাইরে ভারতই প্রথম প্যালেস্তাইনি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে ইয়াসের আরাফতের প্যালেস্তাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। আশির দশকে প্যালেস্তাইনকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিও দেয় নয়াদিল্লি। সেই কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের শরিক ছিলেন প্রণববাবুও। আজ রামাল্লায় পা দিয়েই সেই ঐতিহ্যকে স্মরণ করতে চাইলেন তিনি। হোটেলে একটু বিশ্রাম নিয়ে সটান চলে গেলেন আরাফতের সমাধিতে। পরে তাঁর হাতেই প্যালেস্তাইনের একটি সড়কের নতুন নাম হল ‘সরিয়া অল হিন্দ’। প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট মেহমুদ আব্বাসের সঙ্গে প্রণববাবুর বৈঠকে বার বারই ঘুরে ফিরে এসেছে আরাফতের সঙ্গে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধীর বন্ধুত্বের কথা। আরাফতের সঙ্গে নিজের আলোচনার স্মৃতিও আব্বাসকে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। প্রণববাবু স্পষ্টই জানিয়েছেন, প্যালেস্তাইনকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম সংযু্ক্ত রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চায় নয়াদিল্লি। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে যে প্যালেস্তাইনের সীমানা সুনির্দিষ্ট থাকবে। প্যালেস্তাইন সম্পর্কে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীর একটি মন্তব্যও উদ্ধৃত করে রাষ্ট্রপতি বলেন,-“ঠিক যে ভাবে ইংল্যান্ড ইংলিশদের, ফ্রান্স ফরাসিদের, তেমনই প্যালেস্তাইন শুধু আরবদের।”

ভারতীয় কূটনীতিকদের মতে, রাষ্ট্রপতির প্যালেস্তাইন সফর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,. প্যালেস্তাইন ও ইজরায়েলের মধ্যে ফের সংঘাত শুরু হয়েছে। এই অবস্থায় তৃতীয় বারের জন্য অভ্যুত্থানের হুমকি দিতে শুরু করেছেন প্যালেস্তাইনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তাতে অশনি সঙ্কেত দেখছে উন্নত দেশগুলি। তাদের এও আশঙ্কা যে সেই অভ্যুত্থানের সুযোগ নিতে পারে পশ্চিম এশিয়ার জঙ্গি সংগঠন আই এস। এই পরিস্থিতিতে ইজরায়েল সফরের আগে প্যালেস্তাইনে এসে দিল্লির অবস্থান স্পষ্ট করতে চেয়ে রাষ্ট্রপতি কূটনৈতিক ভাবে ঠিক পদক্ষেপ করেছেন বলে মনে করছে সাউথ ব্লক।

প্রশ্ন হল, কতটা আশ্বস্ত হল প্যালেস্তাইন? কূটনীতিকদের মতে, সম্প্রতি রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার কমিশনে ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ভোটাভুটিতে যে ভাবে নয়াদিল্লি অনুপস্থিত থেকেছে তা ভাল চোখে দেখেনি প্যালেস্তাইন। পিএলও নেতারা এই বিষয়ে প্রকাশ্যেই খেদ জানিয়েছেন। তবে প্রণব-আব্বাস বৈঠকের পর বিদেশ মন্ত্রকের সচিব (পূর্ব) অনিল ওয়াধা বলেন, ‘‘রাষ্ট্রপুঞ্জের ভোটাভুটির ঘটনা অতীত।. এই বিষয়ে নয়াদিল্লির সীমাবদ্ধতার কথা রাষ্ট্রপতি আব্বাসকে ব্যাখ্যা করেছেন।’ ওয়াধা জানিয়েছেন,. আঞ্চলিক শান্তি ফেরাতে প্রণববাবুর আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন প্যালেস্তাইনি প্রেসিডেন্ট। আব্বাস জানিয়েছেন, হিংসায় আগ্রহ নেই প্যালেস্তাইনেরও। বরং গাঁধীর পথ তাঁরাও আঁকড়ে ধরতে চান। ১৯৬৭ সালের চুক্তি অনুসারে ইজরায়েলের সঙ্গে সীমান্ত নির্ধারণে নয়াদিল্লিকে পাশে চেয়েছেন আব্বাস।

ইরাকে আইএসের হাতে অপহৃত ৩৯ জন ভারতীয় বেঁচে আছেন বলে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে জানিয়েছেন প্যালেস্তাইনের প্রেসিডেন্ট মেহমুদ আব্বাস। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ওই ভারতীয়দের ফেরাতে প্যালেস্তাইন ভারতকে সাহায্য করবে বলেও জানিয়েছেন আব্বাস। তবে তাঁদের বেঁচে থাকার পক্ষে কোনও প্রমাণ প্যালেস্তাইনিরা দেননি বলেও জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক। ইরাকে অপহৃত ওই ৩৯ জন ভারতীয়কে ফেরানোর বিষয়ে এখনও বিশেষ সাফল্য পায়নি নয়াদিল্লি। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়ার বাসিন্দা সমর টিকাদার, খোকন শিকদার-সহ ওই ৩৯ জনকে আইএস জঙ্গিরা খুন করেছে বলে দাবি করেছিলেন হাসান বলে এক বাংলাদেশি। পরে হাসান বার বার বয়ান বদল করায় তাঁর বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়।

সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা