১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

প্রভাবশালীদের চাপের মুখে সুফল মিলছে না ॥ রেলের জমি উদ্ধার শুধু মুখে মুখেই

  • মোট জমি ৬১ হাজার একর ্র পাঁচ হাজার একরের বেশি বেদখল ;###;রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চলছে দখল ;###;ফের বেহাত হচ্ছে রাজধানীর রেললাইনের দু’পাশের জমি ;###;জমি উদ্ধার করে রাস্তা নির্মাণের পরামর্শ

রাজন ভট্টাচার্য ॥ যুগের পর যুগ বেহাত হয়ে আছে রেলের জমি। যাও আছে তাও দিন দিন যাচ্ছে প্রভাবশালীদের পেটে। জমি কমছে প্রতি বছর। কিন্তু মূল্যবান এসব সম্পত্তি উদ্ধারে কোন উদ্যোগই চোখে পড়ার মতো নয়। কথায় আছে কার গরু, কে দেয় ধুঁয়। আলোচনা আছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই বেহাত হচ্ছে মূল্যবান এসব জমি। সারাদেশে রীতিমতো সরকারী জমি দখলের প্রতিযোগিতা। সহজ ভাষায় বললে কাড়াকাড়ি। তাইতো মন্ত্রী হয়েই রেলের কালো বিড়াল ধরতে চেয়েছিলেন সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। অভিযানও শুরু করেছিলেন বেশ ঘটা করেই। তাঁর শুভ তৎপরতায় রেলের মোট জমি? দখল হওয়া জমি ও জমির প্রকারভেদ জানতে জরিপও শুরু হয়েছিল। কিন্তু সাহসী এই উদ্যোগেও সমাপ্তি যেমন হয়নি তেমনি লুকিয়ে থাকা বিড়ালেরও খোঁজ মেলেনি। মন্ত্রিত্ব গেছে তাঁর। কিন্তু বহুল আলোচিত শব্দ ‘কালো বিড়াল’-এর কথা মানুষ ভুলেনি। প্রশ্ন হলো কালো বিড়াল ধরার অসমাপ্ত কাজের কি কোন অগ্রগতি আছে? নাকি মন্ত্রী বদলের পর সবকিছু আগের অবস্থাতেই রয়ে গেছে।

অনুসন্ধান বলছে, সারাদেশে রেলওয়ের অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধারে মন্ত্রণালয়ের তেমন কোন তৎপরতা নেই। সার্বিক অগ্রগতিও কম। প্রভাবশালীদের চাপের মুখে পুরো বিষয়টিই কার্যত মুখে মুখেই। আরেকটু এগিয়ে বললে, চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ রেলেও জমি উদ্ধার প্রক্রিয়া। রেলের মোট জমির পরিমাণ ৬১ হাজার একর। অব্যবহৃত জমি প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার একর। পাঁচ হাজার একরের বেশি অবৈধ দখলে। দখলের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা। সরকারী কাজে লিজ দেয়া জমির অর্থ আদায়ে ব্যর্থ রেল কর্তৃপক্ষ। জমি ব্যবহারের সুষ্ঠু কোন পরিকল্পনা নেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। এ প্রেক্ষাপটে জনবল সংকটের মধ্যে দখল হওয়া জমির রেকর্ড উদ্ধারের নামমাত্র চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ১৯৮৩ সালের নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় গাজীপুর থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইনের দু’পাশে রাস্তা নির্মাণের প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এতে বলা হয়, দু’পাশের রাস্তা হবে ওয়ানওয়ে। নারায়ণগঞ্জ-গাজীপুর পর্যন্ত যেতে লেবেল ক্রসিংয়ের কারণে কোন গাড়িকে এক মিনিটের জন্যও থামতে হবে না। পরবর্তী সরকারগুলো এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। এই প্রেক্ষাপটে রেলের জমি দখলমুক্ত রাখতে লাইনের দু’পাশে রাস্তা নির্মাণের পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এতে জমি দখল ঠেকানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি যানজট কমবে। দ্রুত সময়ের মধ্যে পৌঁছানো সম্ভব হবে নারায়ণগঞ্জ থেকে গাজীপুর। ফলে নগরীতে জনসংখ্যার চাপও কমবে বলে মনে করেন পরিকল্পনাবিদদের অনেকেই।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক সংসদকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের ৪ হাজার ৪৮৬ দশমিক ৬৯ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বাঞ্চল রেলের এক হাজার ৭৮ দশমিক ১৫ একর এবং পশ্চিমাঞ্চল রেলের ৩ হাজার ৪০৮ দশমিক ৫৪ একর জমি। মন্ত্রী জানান, দখল হওয়া জমির মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে রয়েছে এক হাজার ২৫৪ দশমিক ৯৫ একর। বেসরকারী ও ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠানের দখলে আছে ৩ হাজার ২৩১ দশমিক ৭৪ একর। অবৈধ দখলে থাকা এসব জমি থেকে দখলকারীদের বিভিন্ন সময় উচ্ছেদ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ সালে পূর্বাঞ্চলে অবৈধ দখলদার উচ্ছেদের মাধ্যমে ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে ১৭ দশমিক ৩৭ একর, ২০১১ সালে ৭৯ দশমিক শূন্য ৯ একর, ২০১২ সালে ৪৭ দশমিক ৮৭ একর এবং ২০১৩ সালের মে মাস পর্যন্ত উচ্ছেদের মাধ্যমে উদ্ধার করা হয়েছে ৯ দশমিক ৬০ একর। এছাড়া পশ্চিমাঞ্চলে উচ্ছেদ করা হয়েছে ২০১০ সালে ২ দশমিক ৮২ একর, ২০১১ সালে ১০ দশমিক ৯৮ একর, ২০১২ সালে ১০ দশমিক ৯২ এবং ২০১৩ সালের মে পর্যন্ত ৭ দশমিক ৯৭ একর ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলওয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ফিরোজ সালাহউদ্দীন জনকণ্ঠকে বলেন, রেলওয়ের বেহাত হওয়া জমি চিহ্নিত করে রেকর্ড উদ্ধারের চেষ্টা করছি। আমাদের সম্পত্তি বিভাগ এ কাজটি করছে। ধীরে ধীরে আমরা জমি উদ্ধারে এগিয়ে যাচ্ছি। জমি উদ্ধারের জন্য লোকবল সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনবল সঙ্কট অনেক বেশি। তাই এই মুহূর্তে সব জমি উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। তবে প্রচেষ্টা আছে বলে জানান তিনি।

মোট জমি ৬১ হাজার একর ॥ রেলওয়ের অবকাঠামো বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে রেলের মোট জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৬০৫ দশমিক ৮৪ একর। এর মধ্যে অপারেশনাল অর্থাৎ ট্রেন চলাচলের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ৩০ হাজার ৫১৪ দশমিক ০৮ একর। রেলের দখলে থাকা অব্যবহৃত জমির পরিমাণ ১৩ হাজার ৪২৩ দশমিক ২৪ একর। কর্মকর্তারা বলছেন, রেলের জমির কিছু অংশ দখল করেছে সরকারী, আধা সরকারী প্রতিষ্ঠান। বাকি জমি লাইসেন্সের নামে স্বল্পমূল্যে ইজারা নিয়েছেন প্রভাবশালীরা আর লিজ ছাড়াই অবশিষ্ট জমি বছরের পর বছর ধরে ভোগ করছেন দখলদাররা। রেললাইনের পাশে রেলের জমিতে খোলা বাজার, বস্তি, আধাপাকা এমনকি পাকা স্থাপনাও গড়ে তুলছেন তারা। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে জমি দখলের প্রতিযোগিতা শুরু হয় ৯০ দশকের শুরুর দিকে। যা এক সময়ে মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। জমি দখলমুক্ত করতে অভিযান চালিয়েও ব্যর্থ হয় রেলের সম্পত্তি বিভাগ। সম্প্রতি রাজধানীর কাওরান বাজারের রেল দুর্ঘটনায় পাঁচজনের মৃত্যুর ঘটনার পর পরই রেললাইনেই দু’পাশের জমি উদ্ধারে তৎপরতা শুরু হয়। এতে সফলতা যে একেবারেই আসেনি তা নয়। কিছুটা এসেছে। কিন্তু যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছিল সেখানে আবারও বসতি হয়েছে। খিলগাঁও থেকে মালিবাগ রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনের দু’পাশের জমিতে এখন ফলছে নানা জাতের সবজি। মালিবাগ রেল গেটের পর থেকে আবারো জমি দখলের চেষ্টা শুরু হয়েছে। উচ্ছেদ হয়নি বস্তিগুলো। রাজনৈতিক কার্যালয়গুলোও আগের মতো রয়েছে। প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় বসছে দোকানপাট।

রেলওয়ের ৫ হাজার একর জমি অবৈধ দখলে ॥ প্রশাসনের অবহেলায় রেলের প্রায় পাঁচ হাজার একরের বেশি জমি এখনও অবৈধ দখলে। যার বর্তমান মূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকারও বেশি বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়। এছাড়া রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চের মিলে মোট জমি রয়েছে ৬১ হাজার ৬০০ একর। কিন্তু এর মধ্যে অপারেশন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে মাত্র ৩০ হাজার একর। বাকি জমির অর্ধেকই বৈধ-অবৈধভাবে দখলে রয়েছে। এছাড়া বৈধভাবে ১৩ হাজার ৩৩ একর জমি ইজারা দেয় রেল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইজারা দেয়া জমির অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে রেলওয়ে। তাই বিভিন্ন বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জমি ইজারা বাবদ ৫৮ কোটি টাকা আটকা আছে বলে রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে। সূত্রগুলোর দাবি, আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ যে দল ক্ষমতায় থাকে ওই দলের অনুসারীরা জমির লিজ পেয়ে থাকেন। জোর করেও জমি দখল নিয়ে চলছে মাটি ভাড়ার বাণিজ্য।

রেওয়ের সূত্রে জানা যায়, মোট জমির মধ্যে ৪ হাজার ৬৩৫ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। এর মধ্যে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মোট জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৪০০ একর। রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে মোট জমি ৩৭ হাজার ২০০ একর অবৈধ দখলে রয়েছে ৩ হাজার ৩৮৭ একর। এছাড়া রেলওয়ের দখলে থাকা অব্যবহৃত রয়েছে ১৩ হাজার ৪২৩ জমি। এছাড়া ৭৯৫ দশমিক ১৯ একর মৎস্য, ৩০ দশমিক ৫৫ একর নার্সারি, ১২ দশমিক ৪৭ একর সিএনজি স্টেশন, ৪৫ দশমিক ৬৭ একর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ২১০ দশমিক ৬৯ একর সরকারী-আধাসরকারী ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কাছে লাইসেন্সের মাধ্যমে ইজারা দেয়া আছে। বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা দেয়া হয়েছে ৯০৯ দশমিক ৮৪ একর জমি।

উপেক্ষিত প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ॥ গেল বছর মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে রেলওয়ের জমি দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধাওে উচ্ছেদ কার্যক্রম অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, অবৈধ দখলদাররা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রেলওয়ের কি পরিমাণ জমি রয়েছে তার জন্য নতুন করে সার্ভে করতে হবে। এর পাশাপাশি কি পরিমাণ জমি দখলে রয়েছে তার জন্য একটি প্রতিবেদন দিতে হবে। এজন্য রেলওয়ের একজন উর্ধতন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দিতে হবে। সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘রেলওয়ে সম্পত্তি (অবৈধ দখল উদ্ধার) আইন, ২০১৪’ নিয়ে আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। সর্বশেষ রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ বাস্তবায়নে তেমন কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। তাছাড়া রেলওয়ের ভূমি বিভাগ থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের কর্তাব্যক্তিরা কখনই জমি উদ্ধারের বিষয়ে আন্তরিক নন। সূত্র বলছে, সারাদেশে রেলেওয়ের জমি লিজ দেয়ার সঙ্গে রেল বিভাগের অনেক কর্মকর্তাই জড়িত। সঙ্গত কারণেই ব্যক্তি স্বার্থেই তারা চান না জমি উদ্ধার তৎপরতা এগিয়ে যাক।

সিটি কর্পোরেশনের কাছে রেলেওয়ের পাওনা ॥ রেলওয়ের সূত্রে জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১২টি মার্কেট নির্মাণের জন্য ১৯৮৫ সালের রেলওয়ের অব্যবহৃত ১২ দশমিক ৫৫ একর জমি ইজারা নেয় ঢাকা সিটি কর্পোরেশন। ইজারা নেয়া জমিতে মার্কেট নির্মাণ করে নিয়মিত ভাড়া আদায় করলেও ইজারামূল্য বাবদ বছরে ৫০ লাখ ২১ হাজার টাকা রেলওয়েকে পরিশোধ করেনি সংস্থাটি। রেলওয়ের পক্ষ থেকে ইজারার অর্থ চেয়ে বার বার চিঠি দিলেও কোন লাভ হয়নি। গত ২৭ বছরে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের কাছে ইজারা মূল্য বাবদ রেলওয়ের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। এছাড়া রাজধানীর দিলকুশায় কৃষি ভবন নির্মাণের জন্য ১৯৮১ সালে ১৪ দশমিক ৫৫ একর জমি ইজারা নেয়া হয়। কিন্তু ইজারামূল্য বাবদ রেলওয়ের ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি বিএডিসি।

প্রতি বছর ইজারামূল্য অগ্রিম পরিশোধের শর্তে জমি ইজারা দেয়া হলেও বেশিরভাগ সরকারী প্রতিষ্ঠানই তা পালন করেনি। এ কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের কাছে ইজারামূল্য বাবদ আটকে আছে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৫৮ কোটি টাকা। দীর্ঘদিন ইজারার অর্থ পরিশোধ না করায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলাও করেছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের তথ্য মতে, পাট মন্ত্রণালয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭২ সালে চাঁদপুরে ৬ দশমিক ৩৪ একর জমি বাংলাদেশ জুট ট্রেডিং কর্পোরেশনকে জমি ইজারা দেয়া হয়। ইজারামূল্য বাবদ সংস্থাটির কাছে রেলওয়ের পাওনা প্রায় ১০ কোটি ২২ লাখ টাকা। কয়েক বছর ইজারার অর্থ পরিশোধ না করায় পাট মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা চলমান রয়েছে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীনে আগারগাঁওয়ে বন ভবন নির্মাণের জন্য রেলওয়ের ৮ দশমিক ৭৬ একর জমি ইজারা দেয়া হয় ১৯৬৬ সালে। প্রথমদিকে নিয়মিত ইজারামূল্য পরিশোধ করলেও গত ১৬ বছরে তা দেয়নি সংস্থাটি। প্রধান বন সংরক্ষকের কাছে ১৬ বছরে ইজারামূল্য বাবদ রেলের পাওনা রয়েছে প্রায় ৮ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। একইভাবে চন্দ্রঘোনায় কর্ণফুলী পেপার মিলসের কারখানা স্থাপনের জন্য রেলের অব্যবহৃত ১ দশমিক ৮৯ একর জমি ইজারা দেয়া হয়। সংস্থাটির কাছে রেলওয়ে পাওনা রয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। চট্টগ্রামের দ্য রেলওয়ে মেন্স স্টোরস লিমিটেডের ভবন নির্মাণের জন্য ১৯৯৫ সালে ১ দশমিক ৭৫ একর জমি ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু রেলওয়ের ১ কোটি ৪৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেনি সংস্থাটি। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে রেলওয়ের পাওনার মধ্যে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে ৮৮ লাখ, তিতাস গ্যাস কোম্পানির কাছে ৬৫ লাখ, ঢাকা ওয়াসার কাছে ২৯ লাখ, চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলের কাছে ২২ লাখ, বাংলাদেশ তার ও টেলিফোন বোর্ডের কাছে ১৯ লাখ, বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে ১৬ লাখ টাকা।

এছাড়া রেলের ১ দশমিক ১৩ একর জমি ইজারা চট্টগ্রামের কদমতলীর ধুম শুভপুর বাস টার্মিনাল ও ২ দশমিক ৫২ একর জমি ইজারা নিয়ে চট্টগ্রাম আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয় ১৯৭৮ সালে। প্রথম দিকে রেলের ইজারামূল্য নিয়মিত পরিশোধ করলেও পরবর্তী তা বন্ধ করে দেয় উভয় মালিক সমিতি। বর্তমানে বাস মালিক সমিতির দুটির কাছে রেলওয়ের পাওনার পরিমাণ যথাক্রমে ১ কোটি ১৫ লাখ ও ৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। দীর্ঘদিন ইজারামূল্য পরিশোধ না করায় মালিক সমিতি দুটির নামে পৃথক দুটি সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করে রেলওয়ে।

জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেই রেলওয়ের ॥ বছরের পর বছর পড়ে আছে রেলওয়ের পতিত জমি। মূল্যবান জমিতেই রেলের কোন কাজ নেই। এক সময় স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন জমি দখলে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে দখলেরও খোঁজ রাখে না রেল কর্তৃপক্ষ। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে রেলের দখলে অব্যবহৃত ১৩ হাজার ১০৭ একর জমির মধ্যে কৃষি জমির পরিমাণ ১০ হাজার ৭১৬ দশমিক ৮১ একর। এসব দখলের থাকা জমির বেশিরভাগই অর্থনৈতিক আয়ের বড় রকমের উৎস হতে পারে। যা রেলওয়ের উন্নয়ন ও ভর্তুকি হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। ফলে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ কমে আসবে। নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ রেল স্টেশনের পাশে রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ জমি বছরের পর বছর বেহাত হয়ে আছে। গুরুত্বপূর্ণ এসব জমি কৃষি কিংবা বাণিজ্যিকভাবে আয়ের উৎস হিসেবে কাজে লাগানো যেতে পারে। এছাড়া মোহনগঞ্জ রেল স্টেশনের পাশে অন্তত তিন শতাধিক দোকানপাট আছে রেলের জমিতে। অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব দোকানপাট কারা দখলে নিয়েছে কেউ খোঁজ রাখে না।

টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের জমি উদ্ধারে তৎপরতা বন্ধ ॥ টঙ্গী থেকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশন পর্যন্ত দখল হয়ে যাওয়া রেলওয়ের প্রায় তিনশ বিঘা জমি পুনরুদ্ধারে দখলদারদের কাছে চিঠি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে এতে কতটা কাজ হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ এসব জমি জাল দলিল ও অবৈধ বরাদ্দপত্রের মাধ্যমে সরকারী ও শরিক দলের প্রভাবশালীরা দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছেন। এ দখলদারদের তালিকায় রয়েছে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নামও। এ অবস্থায় চিঠি দিলেই দখলদাররা জমির দখল ছেড়ে দেবে এমন প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।