২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অস্তিত্ব সঙ্কটে জামায়াত কোন নির্বাচনই করতে পারবে না দলটি ॥ স্থানীয় সরকার আইন সংশোধনে

  • এ পরিস্থিতি সামলাতে দলের একটি কূটনৈতিক মিশন কাজ করে যাচ্ছে ;###;বিদেশে থেকে আন্তর্জাতিক লবিংয়ের কাজ করছেন ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক

বিভাষ বাড়ৈ ॥ নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জাতীয় নির্বাচনের পর এবার ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভাসহ সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও অযোগ্য হচ্ছে দলগতভাবে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত সংগঠন জামায়াত। আগামীতে স্থানীয় সরকারের সকল নির্বাচন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে হওয়ায় সে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না বিএনপির রাজনৈতিক এ মিত্র। দলীয়ভাবে নির্বাচন হলে কেবল নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোই তাতে অংশগ্রহণ করতে পারবে। ফলে নিবন্ধন বাতিল হওয়া জামায়াত ওই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। এ অবস্থায় আনুষ্ঠানিকাভাবে নিষিদ্ধ না হলেও রাজনীতির মাঠে কার্যত নিষিদ্ধই হতে যাচ্ছে জামায়াত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন করতে না পারলে সেই রাজনৈতিক দলকে আর কার্যকর কোন দল বলা যায় না। তবে স্থানীয় সরকারে অযোগ্য হওয়ার হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দলটি।

নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক জানিয়ে দিয়েছেন, দলীয় পরিচয়ে দলের প্রতীকে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনী আইনে যদি সংশোধনী আনা হয় তাহলে অনিবন্ধিত বা নিবন্ধন বাতিল হওয়া কোন দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সর্বোচ্চ আদালতে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় জামায়াতে ইসলামীও দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণ করতে না পারারই কথা। সরকার যদি স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করতে চায় তাহলে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্ত্রিসভায় ও জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার আইনের অনুলিপি প্রজ্ঞাপন আকারে আমাদের পাঠালে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করব। এর আগে গেল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ হারায় মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরা জামায়াত। তবে দলীয় পরিচয় ও প্রতীকে না হওয়ায় এতদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার সুযোগ পায় এ দলটির প্রার্থীরা। এবার সে সুযোগও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এরই মধ্যে নির্বাচনী আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

সোমবার নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন ও প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য পাঁচটি আইন সংশোধনের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনের নির্বাচন আইন সংশোধনের খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অংশ নিতে পারবেন। এটা ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন সব ক্ষেত্রে। এই পাঁচটি আইনের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হয়। এই সংশোধন ছোট হলেও রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে এর প্রভাব অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে কথার নিয়ম চলে এলেও বাস্তবতা ভিন্ন। ২০০৮ সালে চার সিটি করপোরেশনে নির্বাচন একসঙ্গে করার অভিজ্ঞতার পর তখনকার নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল আইনের পাতাতেই আছে। প্রকারান্তরে দলীয় নির্বাচনই তো হচ্ছে। দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে যে কোন সমস্যার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো দায়ী থাকে। কাজেও অনেক সুবিধা হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেন, উন্নত গণতন্ত্রে স্থানীয় সরকার নির্বাচনও দলীয় মনোনয়নে হয়। যেমন ব্রিটেন। ভারতেও স্থানীয় নির্বাচন দলীয় মনোনয়নে হয়।

এদিকে এখন পরিষ্কার যে, সংশোধনী চূড়ান্ত হলে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা বা জেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী দলটির অংশ নেয়ার আর কোন সুযোগ থাকবে না। জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হাইকোর্টের রায় যতদিন পর্যন্ত বহাল আছে ততদিনে জামায়াত দলীয়ভাবে কোন নির্বাচনেই অংশ নিতে পারবে না।

২০১৩ সালে ১ আগস্ট রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের এই রায়ের ফলে জামায়াত এর পরই দলীয়ভাবে কোন নির্বাচনে অংশ নেয়ার অযোগ্য হয়ে যায়। তবে হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করেছে জামায়াত। সেটির এখনও নিষ্পত্তি হয়নি। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব মওলানা সৈয়দ রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ ২৫ ব্যক্তি জামায়াতের নিবন্ধন নিয়ে এক রিট পিটিশন দায়ের করেন। কয়েক দফা শুনানির পর হাইকোর্ট ২০১৩ সালের ১ আগস্ট এক রায়ে, জামায়াতকে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন দেয়াকে আইনগত কর্তৃত্ব বহির্ভূত ও আইনগত অকার্যকর মর্মে ঘোষণা করায়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নামের রাজনৈতিক দলটির নিবন্ধন বাতিল হয়ে যায়।

এদিকে দলীয়ভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়টিতে বিএনপির মতো জামায়াতও ষড়যন্ত্র দেখছে। দলের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সরকার দেশের আসল সমস্যা সমাধান না করে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে নিতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছে। এদিকে দলটি বাইরে যাই বলুক না কেন নির্বাচনের বিষয়ে হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে নতুন করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে দলটি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতার ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আরও বেশ কয়েকজনের দ- কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। দলের নেতা-কর্মীরা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কেবল দলের নেতারা নয়, দল হিসেবেও জামায়াত যে যুদ্ধাপরাধ করেছে তারও বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানিয়েছে সরকার। জামায়াত নিষিদ্ধের দাবিও জোরালো হয়েছে। এই অবস্থায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আইন পাস হলে কার্যত জামায়াতের কোন প্রকাশ্য ভূমিকাই থাকবে না রাজনীতিতে।

নিজেদের সঙ্কটের মূল্যায়ন করেছে জামায়াত ॥ দলীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে পড়েছে স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। অন্তত পাঁচটি কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে দলটির কয়েক স্তরের নেতাকর্মী ও সহযোগী ছাত্র সংগঠন ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে। কারণগুলো হচ্ছে- একের পর এক জামায়াতের শীর্ষনেতাদের ফাঁসির আদেশ ও রায় কার্যকর, আধ্যাত্মিক গুরু গোলাম আযমের মৃত্যু, স্বল্পসময়ের ব্যবধানে কয়েক হাজার নেতাকর্মী গ্রেফতার এবং মানবতা বিরোধিতার বিচার বন্ধে ক্রমশ বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর হস্তক্ষেপ ও প্রভাব হ্রাস। এসব বিষয়কে চিহ্নিত করে দলের একটি বিশেষ টিম শীর্ষ পর্যায়ে রিপোর্টও জমা দিয়েছে বলে জানা গেছে।

নেতাকর্মীরাই বলছে, জোট ও ভোটবন্ধু বিএনপি অনেকাংশে জামায়াতের বিতর্কিত বিষয়ে নীরব থাকায় চলমান সঙ্কটে আরও একা পড়েছে দলটি। এসব কারণে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবেলায় শক্তিশালী অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে তারা। দলটির মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, পুরানা পল্টনের মহানগরী অফিসসহ অধিকাংশ মহানগর, জেলা-উপজেলা কার্যালয় এখন তালাবদ্ধ। প্রকাশ্যে কোন কর্মসূচী পালন করতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। গণদাবির কারণে জামায়াত-শিবির দমনে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সরকার। স্বাধীনতার পর এমন সঙ্কট আর আসেনি দলটিতে, জানিয়েছেন একাধিক নেতা। নানা দিক থেকে সঙ্কট ও কোণঠাসা জামায়াত আগামী দিনে কোন পথে পরিচালিত হবে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন অধিকাংশ মানুষ। বৈধভাবে রাজনীতি করতে পারবে, নাকি পারবে না? কিংবা নতুন কোন দল বা জোটে একীভূত হয়ে রাজনীতির মাঠে আসবে জামায়াত- এ প্রশ্ন এখন বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে।

কী করবে এখন দলটি?

জামায়াত সূত্রগুলো বলছে, রাজনীতির মাঠে টিকে থাকতে সম্ভাব্য সব পথেই হাঁটছেন দলটির বর্তমান শীর্ষ নেতারা। মানবতাবিরোধী অপরাধে শীর্ষ নেতাদের মুক্তির জন্য চলমান আন্দোলন অব্যাহত রাখবে জামায়াত-শিবির। এ ক্ষেত্রে কিছু কৌশলী কর্মসূচীতে যাবে তারা। অন্যদিকে দলের নিবন্ধন ফিরে পেতে আপীল বিভাগে লড়বে আইনজীবী প্যানেল। তবে শেষ পর্যন্ত নিবন্ধন ফিরে পাওয়া সম্ভব হবে না, বরং নিষিদ্ধ হবে-এ কথা ধরে নিয়েই এগোচ্ছেছন দলের নেতারা। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখছেন তারা। জামায়াতের একাধিক সূত্র জানায়, একটি মধ্যপন্থী ইসলামী দল হিসেবে আমেরিকা ও ইউরোপের মতো দেশগুলোর সঙ্গে জামায়াত সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছে অনেক আগেই। এর ধারাবাহিকতায় পাশের দেশ ভারতের সঙ্গেও সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায় জামায়াত। এ জন্য জামায়াতের একটি কূটনৈতিক মিশন কাজ করছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব সফর করে দলের পক্ষে আন্তর্জাতিক লবিংয়ের কাজ করছেন সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক।

নতুন পরিকল্পনাকে সফল করতে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের আইনজীবী রাজ্জাক এ মুহূর্তে অবস্থান করছেন আমেরিকায়। ছুটে বেড়াচ্ছেন কখনও নিউইয়র্ক, কখনও ওয়াশিংটন বা ক্যালিফোর্নিয়ায়। প্রকাশ্যে তৎপর না থাকলেও ব্যরিস্টার রাজ্জাক নিভৃতে বসে নেই বলে জানা গেছে। তার সঙ্গে নিউইয়র্কের জামাতী মিডিয়া ও জামাতী মতাদর্শের সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করে। এ সময় তারা ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ (আইডিএল) নামে তাদের কার্যক্রম চালায়। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের সরকার তথাকথিত বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলে জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনীতি করার সুযোগ পায়।