২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

জঙ্গী নেতা মুফতি জসিমের কোটি কোটি টাকার ব্যাংক লেনদেনের তথ্য মিলেছে

  • আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের প্রধান কারাবন্দী এই নেতাকে ফের রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে

শংকর কুমার দে ॥ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) প্রধান কারাবন্দী মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর কোটি কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা। এজন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবারও রিমান্ডে আনার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গী সংগঠন আল কায়েদার মতাদর্শের অনুসারী এবিটি দেশের মধ্যে ইতোমধ্যেই প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগার খুনের মধ্য দিয়ে দুর্ধর্ষ জঙ্গী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। এবিটি প্রধানের অস্বাভাবিক ও সন্দেহজনক লেনদেনের মধ্যে আছে বিভিন্ন ব্যাংক ও শেয়ার মার্কেটের হিসাব-নিকাশে পাওয়া গেছে। গোয়েন্দা সংস্থা সূত্রে এ খবর জানা গেছে। গোয়েন্দা সূত্র জানান, জঙ্গী সংগঠন এবিটির ৩০ সহযোগীসহ আল কায়েদার মতাদর্শে চলা এ আধ্যাত্মিক নেতা গ্রেফতারের পর তার কিছু আর্থিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। তারা এ বিষয়টি অবহিত করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংককেও। একইসঙ্গে অর্থ প্রদানকারী ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন গোয়েন্দারা। এজন্য এবিটি প্রধানকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রয়োজনীয়তা মনে করছেন গোয়েন্দারা। গ্রেফতার হওয়ার আগে দেশের বাইরেও তার ঘন ঘন যাতায়াত ছিল তার। মুফতি রাহমানী এবিটির প্রধান এবং এ দেশে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার ছকও তৈরি করে। উগ্রপন্থিরা বিভিন্ন অপরাধে বিপুল অর্থও ব্যয় করে থাকে, যা রাহমানীও কথিত জেহাদে অর্থ খরচ করেছে বলে গোয়েন্দারা খবর পেয়েছেন।

গোয়েন্দা সংস্থা যে তথ্য পেয়েছে তাতে দেখা যাচ্ছে, এম সিকিউরিটিজ লিমিটেডে মোঃ জসিমউদ্দিনের নামে বিও হিসাবটি খোলা হয়। যার কোড নম্বর ৫০৬০৮। বিও হিসাবটি ২০০৯ সালের ৭ জুন তারিখে খোলা হয়েছে। হিসাব খোলার সময় জসিমউদ্দিন আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক কর্তৃক ইস্যুকৃত একটি প্রত্যয়ন জমা দেন। বিও খুলতে তিনি এই শাখার একটি হিসাব নম্বর ব্যবহার করেন। তদন্তে দেখা গেছে, ২০০৯ সালের ৭ জুন থেকে ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই ব্যাংকের শাখা থেকে ৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা জমা এবং পরে তা উত্তোলন করা হয়। হিসাবটির লেনদেন বিবরণী পর্যালোচনা করে দেখা যায়, শেয়ার ক্রয়ের জন্য এম সিকিউরিটিজ লিমিটেডের অনুকূলে ২০০৯ সালের ১০ জুন প্রদানকৃত ৪ লাখ টাকা, পরদিন ১১ জুন ১ লাখ টাকা ছাড়া অন্য সকল পেমেন্ট গ্রাহকের রাজধানীর ধানম-ি শাখায় হিসাবে প্রদান করা হয়েছে। এই বিও হিসাবে ১৮ সেপ্টেম্বরের পর আর কোন লেনদেন করা হয়নি। হিসাব বর্তমান স্থিতি দেখা যায় মাত্র ৬৬.৪১ টাকা।

গোয়েন্দা সূত্র জানান, বরিশাল শাখার একটি ব্যাংকে মোঃ আবুল বাশারের এ্যাকাউন্টস হোল্ডার থেকে এবিটি প্রধানকে ১১ লাখ ২৬ হাজার টাকা ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আরেকটি ব্যাংকের বরিশাল শাখার হিসাবে জমা করেন। এ্যাকাউন্টস হোল্ডারের পর্যালোচনায় গোয়েন্দারা দেখতে পায়, বাশার হচ্ছেন জসিমের আপন ছোট ভাই। জসিমের ব্যাংক হিসাবসমূহে আবুল বাশারকে নমিনি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। হিসাব খোলার ফর্মের নমিনি ডিক্লারেশন অংশে জসিম এবং বাশার আপন ভাই বলে উলেখ করা হয়। উভয়ের পিতা নূর মোহাম্মদ এবং মাতার নাম ফজিলাতুন্নেসা উলেখ থাকে। গোয়ন্দারা লেনদেন পর্যালোচনা করে দেখতে পান যে, আবুল বাশার ২০১০ সালের ২৬ আগস্ট ক্লিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ১২ লাখ টাকা এবং একই সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১১ লাখ ২৬ হাজার টাকা জসিমের হিসাবে প্রদান করেন। কিন্তু বাশারের এসওডি হিসাবের ঋণসীমা মাত্র ৩ লাখ টাকা। কিন্তু একই শাখায় বাশারের আরও একটি সঞ্চয়ী হিসাব পরিচালিত হলেও সঞ্চয়ী হিসাবে অর্থ জমা না করে এসওডি হিসাবে ঋণসীমার ৪ গুণ অর্থ জমা করে। এ বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে করছেন তদন্তকারীরা।

গোয়েন্দা সংস্থার একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৩ সালের ১২ আগস্ট এবিটি প্রধান জসিমউদ্দিন রাহমানী ৩০ জন সহযোগীসহ গ্রেফতার হন।

গোয়েন্দা সূত্র জানান, ২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ২ কোটি ৬৮ লাখ ৪৪ হাজার ৭৪৩ টাকা জমা করা হয়েছে। প্রায় সমপরিমাণ টাকা উত্তোলনও করা হয়। পর্যালোচনায় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বিশাল অংকের লেনদেন একজনের মসজিদের ইমামের পক্ষে করা অস্বাভাবিক বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। ধানম-ি শাখায় মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর পরিচালিত দুটি মেয়াদি আমানত হিসাবে একটিতে ১৫ লাখ ও অন্যটিতে ১০ লাখ ২০ হাজার টাকার তথ্য পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১০ লাখ ২০ হাজার টাকার এফডিআর সচল আছে। পেশাগত ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে, মারকাজ মাদ্রাসা, বছিলা রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা। অন্যদিকে আমানত হিসাবটির অর্থের উৎস দেখা হয়- জমি ক্রয়-বিক্রয়, প্রাইভেট সার্ভিসকে। পেশাগত ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে- ইমাম, হাতেমবাগ মসজিদ, ধানম-ি, ঢাকা। মেয়াদি আমানত হিসেবে দুটিতে দুই ধরনের পেশা ও ঠিকানা ব্যবহার করা হয়।

গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তা বলেন, এবিটি প্রধান জসিমের উল্লেখযোগ্য অর্থ প্রদান হয়েছে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে। জসিমউদ্দিন রাহমানী উল্লেখযোগ্য যেসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ প্রদান করেছেন তার মধ্যে ট্রাভেল এজেন্ট এরোনেট ইন্টান্যাশনাল ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ২৫ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, এয়ার ট্রিপ ইন্টারন্যাশনালকে আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মাধ্যমে ২৯ লাখ ১৬ হাজার টাকা এবং তানভীর ট্রাভেলসকে জনতা ব্যাংকের মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে। রাহমানীর শিষ্যরা গণজাগরণ মঞ্চ প্রতিষ্ঠার পর গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যা করা হয়। রাজীব থাবাবাবা ব্লগে লিখতেন। ব্লগে ধর্ম নিয়ে কটাক্ষকারীদের কথিত ইমানি দায়িত্ব নিয়ে হত্যা করে থাকে রাহমানীর শিষ্যরা। রাজীব হত্যার ঘটনায় ওই বছর ১ মার্চ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পাঁচজন ছাত্র ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ, মাকসুদুল হাসান ওরফে অনিক, এহসান রেজা ওরফে রুম্মন, নাঈম সিকদার ওরফে ইরাদ ও নাফিস ইমতিয়াজকে গ্রেফতার করে ডিবি। হত্যার দায় স্বীকার করে এ পাঁচজন আদালতে জবানবন্দীও দিয়েছেন। এ মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে মুফতি রাহমানীর নাম। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি সংগঠনের প্রধান তিনি। আর গ্রেফতার ছাত্ররা সবাই তার শিষ্য। তদন্তে বের হয়ে আসে, জঙ্গী অর্থায়নের মূল শক্তিই এবিটি প্রধান জসিমউদ্দিন রাহমানী।