২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এ যুগের নাজীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়া একা কেন?

  • মমতাজ লতিফ

এটা একটা অদ্ভুত নিয়তি! ১৯৪০-এ যখন ইউরোপে হিটলারের উত্থান ঘটে এবং জার্মানরা ইহুদী বিরোধী নাজীবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পাঁচ বছরে ইউরোপের দেশগুলো একের পর এক দখল করছিল, লাখ লাখ ইহুদী ও বুদ্ধিজীবী, প্রগতিশীল পরিবারের নারী, পুরুষ, শিশু, কিশোর, কিশোরী হত্যা করছিল, হত্যার উদ্দেশ্যে ট্রেনভর্তি নারী-পুুরুষ, শিশুদের গ্যাসচেম্বারে এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্পগুলোতে নিয়ে যাওয়ার কথা আজ ২০১৫ তে দাঁড়িয়ে ভাবতে গিয়ে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে! কেন না, ওই বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ও হিটলারকে পরাজিত করতে যদিও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ ও সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে মিলে মিত্রবাহিনী গঠন করে যুদ্ধে যোগদান করেছিল, তবু ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, জাপান যদি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার আক্রমণ না করত, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাভাল শক্তি তার ফলে বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত যদি না হ’ত, তাহলে সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র ওই হিটলার ও নাজী ফ্যাসিস্টদের সমূলে ধ্বংস করতে ওই যুদ্ধে মিত্রবাহিনীতে অংশগ্রহণ করত কিনা, সন্দেহ হয়!

এর কতগুলো কারণও রয়েছে-

প্রথমত : যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মূল যুদ্ধক্ষেত্র ইউরোপ থেকে বহুদূর নিরাপদ এক মহাদেশে অবস্থিত ছিল এবং আছে। যুক্তরাষ্ট্র দেখছিল ওই যুদ্ধে যেহেতু পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিষ্ঠিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া দখলের জন্য হিটলার অগ্রসর হচ্ছিল, যা একদিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে অসস্তুষ্ট করেনি। বরং সম্ভবত হিটলারের দ্বারা সোভিয়েতের ক্ষয়ক্ষতি, প্রয়োজনে দখল যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত দূরে দাঁড়িয়ে মজা দেখতে, গোঁফে তেল দিতে উৎসাহিত করত। কিন্তু বিধি বাম! জাপানের কোন জেনারেল যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবারে অপ্রস্তুত আমেরিকান নৌবাহিনী এবং জাহাজের ওপর বোমা হামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ইতিহাসে তা আর জানা যাবে কিনা সন্দেহ, যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র বাহিনীতে অংশ নিতে বাধ্য করেছিল! কেননা, ইউরোপ অংশে লাখ লাখ সোভিয়েত সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা, সেনাসদস্য ও জনগণ নাজীবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেও লেনিনগ্রাডে নাজীদের অবরোধকে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে ঠেকিয়ে রেখেছিল রাশিয়ার তীব্র শীতকাল পর্যন্ত! সোভিয়েত জেনারেলদের কৌশল ছিল, শীতকাল এসে গেলে জার্মান নাজী সেনারা রাশিয়ার তীব্র শীতে কাবু হবে, তখন তাদের পর্যুদস্ত করা সহজ হবে! সেই হিসাব ও কৌশল সফল হয়েছিল। স্ট্যালিন ও তার জেনারেলরা লাখ লাখ সেনা হারিয়েও ওই অবরোধ ভেঙ্গে পড়তে দেয়নি এবং তীব্র শীতে খাদ্য, পানীয় ফুরিয়ে আসা হাজার হাজার নাজী মৃত্যুবরণ করেছিল! এ সুযোগে সোভিয়েত বাহিনী ও মিত্র বাহিনী তীব্র বেগে নাজীদের হাত থেকে ইউরোপের বেশিরভাগ দখল হয়ে যাওয়া দেশ দখলমুক্ত করতে করতে বার্লিনে পৌঁছে যায়! এদিকে জাপানীদের পার্ল হারবার আক্রমণের শিক্ষা দিতে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রথম পরমাণু বোমা হামলা ঘটায়! ইউরোপকে চার্চিল ও স্ট্যালিন নাজীমুক্ত করে, যুক্তরাষ্ট্রেরও এখানে মিত্র হিসেবে কিছু অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা হামলা শুধু জাপান নয়, পুরো পৃথিবীকে স্তম্ভিত করে দেয়! হিটলার তার প্রেমিকাসহ আত্মহত্যা করে। যুদ্ধ শেষে হিটলারের জেনারেলদের দ্রুত বিচারের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও রাশিয়া ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে লাখ লাখ নারী, পুরুষ, শিশু হত্যা ও জাতিগত বিদ্বেষকে হত্যার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার দায়ে ফাঁসি দেয়া হয়! জার্মানিকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়- পূর্ব জার্মানি ও পশ্চিম জার্মানি, বন ও বার্লিন। জাপান পরমাণু বোমা হামলার পরপরই আত্মসমর্পণ করে। এভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়।

পাঠক, এই ২০১৪-১৫ তে মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে বর্তমানে যে আইএস নামের নব্য নাজী বাহিনী গড়ে উঠেছে তার বিরুদ্ধে এতদিনেও কি সেই হিটলার-নাজী বাহিনীর বিরুদ্ধে যেমন বিশ্বশক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তেমনি পুরো বিশ্বের একটি মিত্র বাহিনী গড়ে ওঠার দরকার ছিল না? ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ ক্ষয়ক্ষতির মুখে না পড়েও হিটলারের পতনের পর দেশটি এক অর্থে লাভ করে পশ্চিম জার্মানি, প্রতিষ্ঠিত করে ন্যাটো প্রধানত সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার ওপর নজর রাখতে। এখানে অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে দৃষ্টি দিলে একটি বিষয় বড় হয়ে ওঠেÑ এটি আরব মুসলিমদের দেশ এবং এটি বিশ্বের প্রধান একটি খনিজ তেলের অঞ্চল। এ অঞ্চল থেকেও যুক্তরাষ্ট্র অনেক অনেক দূরে, নিরাপদ, যুদ্ধবিগ্রহ, জাতিগত হানাহানির এ কেন্দ্রস্থল থেকে বহুদূরে অবস্থিত! জার্মানি পদানত বা অধীনস্ত হওয়ায় ইউরোপে ন্যাটোর সাহায্যে সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত রাশিয়াবিরোধী নানা চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র করা সিআইএ, পেন্টাগনের জন্য সহজসাধ্য হয়েছিল। পরিণামে হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, চেকোসেøাভাকিয়া ইত্যাদি দেশে সমাজতন্ত্র ধ্বংসকারী শক্তির জন্ম দেয়া সম্ভব হয়েছিল এবং আরও পরে, সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতন্ত্র পেরেস্ত্রইকা, গণতন্ত্র উদ্ধার ইত্যাদি নামে দেশটির পতন সংঘটনও সম্ভব হয়! অপরদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম সেমেটিক জাতি বহু উপদলে বিভক্ত, অধিকাংশ সময় উপজাতিগুলো হানাহানি, সংঘর্ষে জড়িত থাকে। ৭০-৮০ বছর যাবত মুসলিম প্যালেস্টাইনীদের একটি ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে তাঁরা কখনো কোন কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ করেনি! মিশরের জাতীয়তাবাদী নেতা নাসের ছাড়া প্যালেস্টাইন মধ্যপ্রাচ্যের আরব-মুসলিমদের আর কোন রাষ্ট্রের নেতার স্বীকৃতিও লাভ করেনি! আশ্চর্যজনক এক লোভী, বিলাসী, সংঘর্ষপ্রবণ, আত্মস্বার্থসর্বস্ব জাতি এই আরব-সেমেটিকেরা!

যা হোক, এই মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ, খনিজ সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রকে এবং ইউরোপকে এ অঞ্চলের দেশ ও দেশের নেতাদের প্রতি আকৃষ্ট করেছে, যা মানবাধিকার বা গণতন্ত্র রফতানির দাবির ছদ্মাবরণে আফগানিস্তানে সমাজতন্ত্র উচ্ছেদের সময় যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা ব্যবহার করা হয়েছিল। সেটি কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োজন নেই, হোক না এসব নেতা ও মোল্লা সমাজ প্রতি মুহূর্তে মানবাধিকার দলনে পটু, এসব দেশে না থাকুক নারী-স্বাধীনতা, নারীর চলাচলের স্বাধীনতা, নির্বাচন বা ভোটাধিকার বা পছন্দ করে বিয়ে করার অধিকার! পশ্চিমা নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে এসব ভুলেও কামনা করে না! নানা সময়ে নানা সূত্রে জানা যায় সাদ্দাম, গাদ্দাফীর কাছ থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ উপঢৌকন এই পশ্চিমা নেতারা গ্রহণ করেছে বলে জানা যায়। কিন্তু, যখন তেলখনি দখল করা দরকার হয়েছে তখনই, ওই পরম বন্ধু অঞ্চলে ওই লৌহমানবদের কঠোর শাসনে ঘুমিয়ে থাকা আরব উপজাতিদের জাতিগত সংঘর্ষকে উস্কে দেবার প্রয়োজন হলো! প্রয়োজন হলো লাদেনের আল কায়েদা ও তালেবানদের উত্থানের! মিশর, লিবিয়া, ইরাক, এরপর ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাকে নতুন মুসলিম জঙ্গী গোষ্ঠীর জন্ম দেয়া হলোÑ আইএস ও আল-নুসরা! সত্যিই যদি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো, পেন্টাগন, সিআইএ, এফবিআই এবং ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমানের জঙ্গী, মুসলিম নাজী দলÑ আইএসকে উৎখাত করতে চাইত, তাহলে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মতো এখনই একটি ‘মিত্র বাহিনী’ গঠন করা হতো। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মানবতা ধ্বংসে উদ্যত এই নব্য নাজী বাহিনীকে ধ্বংস করতে রাশিয়াকেই এগিয়ে আসতে হলো! শুধু মাত্র যে আসাদ সরকারকে রক্ষা করাই রাশিয়ার লক্ষ্য তা নয়, এই বিপুল তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলটিতে সব পক্ষের স্বার্থে, আরব, সিরীয়, ইরাকী, লিবীয়Ñ সবার স্বার্থেই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরী, এটিও রাশিয়ার পুতিন অবশ্যই মনে করেছেন এবং এ সম্পদকে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কব্জা থেকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। পুতিন জানেন এটি করা সম্ভব হলে রাশিয়া বিশ্বব্যাপী বিপুলভাবে তার হারানো জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি ফিরে পাবে! যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার আইএস স্থাপনার ওপর বোমা হামলাকে বেসামরিক নাগরিকের স্থাপনার ওপর হামলা বলে হৈ চৈ শুরু করেছে এবং বলছে, রাশিয়া আইএস-এর ওপর হামলা করছে না, বাশার-বিরোধীদের ওপর হামলা করছে- যা সত্যের অপলাপ মাত্র! এটাও সত্য, বহুদূর থেকে ছোড়া রকেট- মিসাইলের দু’চারটি লক্ষ্যচ্যুত হবে না, এমনও নয়। তবে, সত্য হচ্ছে- বর্তমানে এই একবিংশ শতাব্দীতে জন্ম নেয়া মধ্যপ্রাচ্যের আইএস নামের ভ- বর্রর খুনী ইসলামী জঙ্গীগোষ্ঠীর উৎখাতে বিশ্বের ক্ষমতাধর সব রাষ্ট্রের একযোগে লড়াই-এ যোগদান প্রথম দায়িত্ব। বিশ্বের রাষ্ট্রনায়কদের উপলব্ধি করতে হবে যে, নিজ দেশের অদূরে আগুন জ্বললে বা যুদ্ধ হলে নিজেরা নিরাপদ থাকা যায় না! মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ায় ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে মাতৃভূমি ত্যাগকারী হাজার হাজার সিরীয়-যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফ্রিকানদের বিপদসঙ্কুল ভূমধ্যসাগরে ডিঙ্গি নৌকায় জীবনের মায়া তুচ্ছ করে গ্রীসে পাড়ি দেয়া এবং প্রাণ হাতে নিয়ে সন্তানদের জীবন রক্ষা ও ভবিষ্যতের চিন্তা করে সমুদ্রের জোয়ারের মতো ইউরোপে উন্নত, নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রবেশ করছে! এ থেকে এটি প্রমাণ হয় যে, প্রতিবেশী অথবা যে কোন দেশের জনমানুষের ঘরে আগুন লাগলে, যুদ্ধ শুরু হলে, তারা প্রকৃতির নিয়মেই প্রাণরক্ষার তাগিদে প্রতিবেশী দেশে, সে দূরে হোক কাছে হোক, যুদ্ধ-মুক্ত পরিবেশে চলে যাবে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ইউরোপে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলেও এই ইউরোপগামী বিপুল অভিবাসীর স্রোত ঠেকানো দরকার। তাদের মাতৃভূমিতেই ফিরে যাবার ব্যবস্থা করা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপের নিজ স্বার্থেই প্রথম কর্তব্যের মধ্যে পড়ে! সিরীয় অভিবাসীরা বার বার একটি কথাই বলছে- ‘আমরা পরিবেশ ফিরে এলে নিজ দেশে ফিরে যেতে চাই। আমরা ভিন্ন দেশে বাস করতে চাই না’। কেউই শখ করে প্রবাসী হতে চায় না।

বিশ্ববাসী এই একবিংশ শতকে একবার যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে জন্ম নেয়া ধর্মান্ধ জঙ্গী তালেবান আল কায়েদার বর্বরতা থেকে রক্ষা পেতে লাখ লাখ আফগান নারী, পুরুষ-শিশুকে উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে দীর্ঘকাল বাস করতে হচ্ছে। এরপর বিশ্ববাসী দেখেছে, ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের বুশ সরকার গণমারণাস্ত্র মজুদ থাকার মিথ্যা অজুহাত তুলে ইরাকের সবকিছু ধ্বংসকল্পে লাখো মানুষ হত্যা করলে হাজার হাজার ইরাকী দেশত্যাগে বাধ্য হয়! এখন দেখছে, ইরাকে, সিরিয়ার কুর্দী, শিয়া ও সুন্নী এবং আল কায়েদা-আল নুসরা, সম্প্রতি আইএস-এর খিলাফত প্রতিষ্ঠার বর্বর লড়াই চলছে, যা বিস্তৃতি লাভ করেছে সিরিয়ায়! ফলে নিহত হয়েছে নিরীহ লখো নারী-পুরুষ-শিশু ! কথা হচ্ছে, কেন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ, তেল-দখলে উদগ্রীব মহলটি বার বার মুসলমানদের একাংশকে বর্বর এবং জঙ্গী করে তুলতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পরিচালনা করে? কেন? এবং কেন বার বার নতুন নতুন জঙ্গীগোষ্ঠী দিয়ে মুসলিম দেশগুলোকে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে? সেটি সম্ভবত আবার পুনর্গঠন, পুনর্নির্মাণের বিশাল, বিপুল এক কর্মযজ্ঞ শুরু করে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা তৈরি করেছে! একি পশ্চিমাদের কোন পরিকল্পনা ছিল? আবার নতুন নতুন শাসক গোষ্ঠীর সঙ্গে যুদ্ধবাজ জঙ্গী উৎপাদনকারী পশ্চিমাদের স্বার্থ, তেলের ওপর দখলসহ নানা খনিজ পদার্থ উত্তোলন ও সরবরাহের ব্যবসাও কি এতে অন্তর্ভুক্ত আছে! তা না হলে শিল্প- ইতিহাস বোদ্ধা পশ্চিমারা মধ্যপ্রাচ্যের সব ঐতিহাসিক অমূল্য শিল্প-স্থাপনা ধ্বংস হতে দিল কেন?

সম্প্রতি, পশ্চিমা দুনিয়া আকস্মিকভাবে, একটি ইতিবাচক কাজ করেছে। তারা তাদের এ বছরের শান্তির জন্য নোবেল প্রদানে কোন ঘোরপ্যাঁচ না কষে, প্রত্যক্ষভাবে তিউনিসিয়ার চারটি সংস্থার পক্ষের প্রতিনিধিকে এ পুরস্কার প্রদান করেছে! এরা স্বদেশে সরকার গঠনে ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সবদলকে ঐকমত্যে আনতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে, এই চারটি সংস্থাকে তিউনিসিয়ায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য পুরস্কারটি প্রদান করা হয়েছে যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ হতে পারে! যদিও, এখানে একটি সংগঠন হচ্ছে- শরিয়াপন্থী ধর্মভিত্তিক সংগঠন। সে কারণে প্রগতিশীল ব্যক্তিদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, এটি শান্তির জন্য স্থায়ী সমাধান নাও হতে পারে। কেননা, আরব বসন্ত তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, ইয়েমেনে সংগঠিত হয়েছিল উদার প্রগতিশীল, মুক্তমনা তরুণ-তরুণীদের দ্বারা। অথচ এগুলো পরে শরিয়াপন্থী কট্টর মুসলিমদের নেতৃত্বের কাছে নির্বাচনে হেরে যায়, যেমনটি ঘটেছে মিসরে! এখন মিসর তো আবার সেনা শাসনে। লিবিয়ায় উপজাতীয়দের আন্তঃসংঘর্ষে ওই বিপ্লব, গাদ্দাফীর মর্মান্তিক মৃত্যু সত্ত্বেও, চরম অশান্তির মধ্যে ঠেলে দিয়েছে লিবিয়াকে! সিরিয়া ও ইরাকে কুর্দী, সুন্নী ও শিয়া এ তিন পক্ষকে ঠেলে দেয়া হয়েছে এক ভ্রাতৃঘাতী বর্বরতম যুদ্ধে! এর মধ্যে আবার জিহাদী জঙ্গী দল-আইএস এবং আল-নুসরারও জন্ম দেয়া হয়েছে! বিশ্ব নাগরিক ও বিশ্ব নেতারা নীরবে প্রতিদিন হাজার হাজার নিরীহ মানুষের মৃত্যু দেখছে। অথচ তারা এ লড়াই থামিয়ে দিতে একযোগে এই মধ্যপ্রাচ্যকে জঙ্গীমুক্ত করার যুদ্ধটি করে একটি শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল অবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। ‘ওয়ার এগেইনস্ট টেরর’ প্রকৃত অর্থে, কবে শুরু হবে বিশ্ববাসী, মধ্যপ্রাচ্যবাসী অপেক্ষায় আছে!

বলা চলে, আমাদের মতো শান্তিকামী দেশের জনগণ পশ্চিমাদের এইসব মুখে এক, কাজে আরেক রূপ দেখে শঙ্কিত। এসবের মধ্যে রাশিয়াকে সিরিয়াকে জঙ্গীমুক্ত করতে এগিয়ে আসতে দেখে স্বস্তি বোধ করছে। রাশিয়া আসাদ সরকারকে রক্ষা করতেই যদি এ জঙ্গীবিরোধী-যুদ্ধে নামে, তাহলেও তারা শান্তিকামী বিশ্ববাসীর কাছে ধন্যবাদ পাবে। যদি সত্যিই মধ্যপ্রাচ্যে আইএস, আল-নুসরা বিলুপ্ত হয়, অন্তত দুর্বল ও নিষ্ক্রিয় হয়! এ মুহূর্তে বিশ্ব-জনগণের জন্য ইরাক-সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যকে আইএসমুক্ত করা, মিশরকে মুসলিম ব্রাদারহুডমুক্ত করা, আফগানিস্তানকে তালেবানমুক্ত করা প্রথম কর্তব্য।

একই সঙ্গে বাংলাদেশের জনমানুষকেও বাংলাদেশকে সবরকম জঙ্গী, জামায়াত শিবির-জেএমবি-হিজবুত, আনসারুল্লাহ ও জঙ্গীমিত্র-বিএনপির দুই নেতার নেতৃত্বের হাত থেকে মুক্ত করার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এখানে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বের সুযোগ নেই। নেই কোন বিকল্প। দেশের শক্র ও মিত্রকে চিনতে হবে এবং সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।

লেখক : শিক্ষাবিদ, গবেষক