১২ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সোনালি ধান

বাঙালী নামক জাতির ‘ভেতো বাঙালী’ অভিধা প্রাপ্তির বিষয়টি পুরনো হলেও ভাতের জন্য এখনও আঁকুপাঁকু করে ওঠে তার হৃদয়-মন-জিহ্বা। কবিকেও বলতে হয়েছে, তার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। ভাতের মাধ্যমেই পুষ্টি। আর সেই পুষ্টির ধারায় বেঁচে থাকা তার। দু’বেলা দু’মুঠো যোগাড়ে বাঙালীকে নিরন্তর শ্রম দিয়ে যেতে হয়। ভাত যে শুধু ক্ষুণিœবৃত্তি নিবারণ করে, তা নয়; দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টিও যোগান দেয়। বাঙালী ভাত বেশি খায়, ভাতই তাদের প্রধান খাবার। এক মুঠো ভাতের জন্য দুর্ভিক্ষকালে বাঙালীর কি করুণ আর্তনাদ দেখা গেছে! সেই ভাত যদি হয় সহজলভ্য, হয় ভিটামিনসহ পুষ্টিতে ভরপুর, তবে জীবন আর থমকে দাঁড়ায় না। ধন ধান্য পুষ্পে ভরা দেশে ধানের কদর অনেক। রবীন্দ্রনাথের সোনারতরী পূর্ণ হয়ে ওঠে সোনারই ধানে। সেই সোনালি ধান এবার যাবে ঘরে ঘরে। আর সেই ধান কেবলই নয় ধান। আছে তাতে ভিটামিন-‘এ’সহ বিটা ক্যারোটিন। এই ধান হতে উৎপাদিত চালের বর্ণ হচ্ছে হলদেটে বা সোনালি বর্ণের। তাই আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের এই নব্য আবিষ্কৃত ধানটির নাম ‘গোল্ডেন রাইস’ বা সোনালি ধান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে এবং তা উৎপাদনের আগেই। শীঘ্রই এর পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হতে যাচ্ছে। এতে সাফল্য পাওয়ার পর আগামী বোরো মৌসুমেই নিবিড় চাষাবাদের উদ্যোগ নিয়েছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট। তারাই বিশ্বের প্রথম সোনালি ধান উদ্ভাবন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। ভিটামিন ‘এ’সমৃদ্ধ এই ধান চাষের সম্ভাবনা বাংলাদেশসহ উন্নয়শীল দেশের বাস্তবতায় অনেক বড় সাফল্য। কারণ, এই ধানের ভাত দূর করবে শিশুদের অন্ধত্ব। প্রতিবছর দেশে অসংখ্য শিশু ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে অন্ধ হয়ে যায়। বাঙালীর প্রধান খাদ্য ভাতে ভিটামিন ‘এ’ সংযোজন করে যুগান্তকারী সাফল্য এনে দিয়েছেন বাঙালী বিজ্ঞানীরা, যা অভিনন্দনযোগ্য। জনপ্রিয় ধানের জাত বিরি ধান-২৯কে গবেষণার মাধ্যমে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে বিটা ক্যারোটিন পুষ্টি তথা ভিটামিন ‘এ’ অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন তারা। ধানের এই নতুন জাতটির নামকরণ করা হয়েছে জিআর-২ বিরি ধান-২৯। ন্যাশনাল টেকনিক্যাল কমিটি অন ক্রপ বায়োটেকনোলজি এই জাতটির অনুমোদন দিয়েছে। পুষ্টির ঘাটতি ও অন্ধত্ব নিবারণের বিরুদ্ধে এ এক নয়া বিপ্লব। একজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক প্রতিদিন দেড় শ’ গ্রাম সোনালি ধানের ভাত খেলে অনুমোদিত ভিটামিন ‘এ’-এর অর্ধেকেরই যোগান মিলবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজনের ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি রয়েছে। প্রসূতিদের প্রায় ২৪ শতাংশের মধ্যেই এ ঘাটতি রয়েছে। আর বিশ্বে প্রতিবছর ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে ৬৭ লাখ শিশু মারা যায়। এছাড়া প্রতিবছর আরও প্রায় সাড়ে তিন লাখ শিশু ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে রাতকানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সেখানে সোনালি ভাতই হবে ভিটামিনের একটি বড় উৎস। কমে যাবে অন্ধত্ব আক্রান্তের সংখ্যা। দেখা গেছে, ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে সব বয়সী মানুষের চক্ষুস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, চর্ম এবং যৌন সমস্যা দেখা দেয়। অপরিকল্পিত, অপর্যাপ্ত খাদ্যাভ্যাস এবং দারিদ্র্যের কারণে ভিটামিন ‘এ’-এর চাহিদা পূরণ না হওয়ায় এই স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হয় প্রধানত লাখ লাখ শিশু ও নারী। সোনালি ধান বাঙালীর জন্য যেন সোনায় সোহাগা। তবে এ ধরনের ধান মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিশ্চয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের জেনেটিক্যালি মডিফাইড (জিএম) কৃষি বীজ সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যে ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন তা অবশ্যই করতে হবে। জিএম শস্য নিয়ে নানা প্রশ্নের এখনও সমাধান হয়নি। তথাপি এই আবিষ্কার মানুষকে নীরোগ রাখার ক্ষেত্রে সহায়ক হবে বলে আশা করি।