২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাস হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে

  • বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর

ইতিহাসকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রে যুক্ত জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং জেএমবি; এই তিন দলের রাজনীতি বাংলাদেশের সমাজ এবং রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করা। অস্থিতিশীল করার প্রথম শর্ত ধর্মান্ধতাকে ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে আসা। দ্বিতীয় শর্ত হচ্ছে ধর্মকে সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রক্রিয়ায় স্থাপন করা। তৃতীয় শর্ত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ধর্মান্ধতাকে ধর্মজ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে প্রচার করা। এ হচ্ছে ইতিহাসের প্রান্তিক অভিজ্ঞতা এবং এই অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রিক করার অসৎ প্রয়াসে মেতেছে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং জেএমবি। এই অভিজ্ঞতা মানুষের ইতিহাসকে কালিমালিপ্ত করেছে। আমাদের এখান থেকে উদ্ধার পেতে হবে।

এই প্রান্তিক অভিজ্ঞতার মধ্যে মানুষের বেঁচে থাকার জয়ধ্বনি নেই, আছে হত্যার জয়ধ্বনি। মানুষকে ধর্মের নামে হত্যা করে ধর্মের শক্তি ব্যবহার করার মধ্যে কোন কৃতিত্ব নেই। কিন্তু একেই কৃতিত্ব বলে ব্যবহার ও প্রচার করছে জামায়াতে ইসলামী, বিএনপি এবং জেএমবি। সাধারণ মানুষ অবাক হচ্ছে, আল্লাহর কাছে হাত তুলে দোয়া চাচ্ছে : রক্ষা করো আমাদেরকে এই উন্মাদদের হাত থেকে।

আপনারা কি ডেনিয়াল পাইপসের এই বইটি পড়েছেন : ইন দি পাথ অব গড : ইসলাম এ্যান্ড পলিটিক্যাল পাওয়ার। বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন ধর্মান্ধতা জ্ঞানের সহায়ক নয়, ধর্মান্ধতা জঙ্গীবাদী হস্তক্ষেপমূলক রাষ্ট্রের সাহায্যে কাজ করে থাকে। ধর্মান্ধতার প্রয়াস হচ্ছে পাকিস্তান এবং ভারত এবং বাংলাদেশকে জনকল্যাণের পথ থেকে সরিয়ে আনা। পাইপস্ ধর্ম সম্বন্ধে বলেছেন : সে ধর্ম ইসলাম কিংবা খ্রীস্টান কিংবা ইহুদী কিংবা হিন্দু : সব ধর্মের মধ্যে একটা অধস্তনতার বোধ আছে, অনগ্রসরতার একটা প্রয়াস আছে, যেন ধর্ম খুব সহজ ব্যাপার। ধর্ম থেকে ধর্মান্ধতার দূরত্ব মাইল মাইল নয়। দরজা খুললেই ধর্মান্ধতা হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এর সুযোগ নিচ্ছে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এবং জেএমবি।

ধর্মজ বিদ্রোহের মধ্যে ধর্মজ পুনরুজ্জীবনের যে জয়ডঙ্কা বেজে উঠেছে তা ভাববার মতো। পাইপের কথায় ফিরে আসি, পাইপ ঘুরে ঘুরে ফিরে ফিরে বলেছেন : ধর্ম হচ্ছে একটা বিপজ্জনক বিজনেস, একটা রাজনৈতিক আন্দোলন, যে আন্দোলন পৃথিবীজোড়া লিবারেলিজমের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করে চলেছে, মানুষের সভ্যতাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে, ফেনিয়ে তুলেছে সর্বত্র ফ্যানাটিসিজম এবং ইনসারেকশন।

জামায়াতে ইসলাম এবং বিএনপি এবং জেএমবি কি ধর্ম সম্বন্ধে উৎসাহ বাড়াতে পেরেছে? বোধহয় নয়। যা বাড়াতে পেরেছে সে হচ্ছ ভয় এবং হত্যা। মানুষ খুন করাকে সহজ করে তুলেছে জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপি এবং জেএমবি। এই খুনের অন্য দিক হচ্ছে : ভয়। ধর্মের নামে মানুষ খুন করা যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি মানুষ হত্যার সঙ্গে ভয় যুক্ত হয়ে গেছে। যদি বলি মানুষ ধর্মকে ভয় করা শুরু করেছে, তাহলে হয়ত ভুল বলা যাবে না।

ধর্মজ উৎসাহের বিপরীত পিঠ হচ্ছে মৌলবাদ। মৌলবাদ দেশে দেশে ঘোষণা করে চলেছে তারা মানবিকতার শত্রু। আবার মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে ঐতিহাসিক বিজ্ঞানগুলো। দুই-ই ফোকাস করে চলেছে সেক্যুলারিজমের গুরুত্ব। ভিকো বলেছেন মানুষ নিজেদের ইতিহাস তৈরি করে। এই বোধ হচ্ছে সকল ইতিহাসভিত্তিক জ্ঞানের কেন্দ্র : একে অস্বীকার করার জো নেই।

এ সকল কারণে ইতিহাসের কাছে আমাদের কমিটমেন্ট আছে। আমরা ইতিহাসের মধ্য দিয়ে পাবলিক স্ফিয়ারে প্রবেশ করে থাকি। সেজন্য জ্ঞানের ক্ষেত্রে বিতর্কে প্রবেশ করা কিংবা রাজনীতির ক্ষেত্রে অবস্থান নেয়ার মধ্যে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ভয় পেলেই ধর্মের নামে মৌলবাদ আমাদের ঘিরে ধরবে। ঘিরে ধরাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে পাগল করা ব্যাপার। বিতর্কে আমরা যাব না। রাজনীতির ক্ষেত্রে অবস্থান নেব না। আমরা ভাল মানুষ হয়ে থাকব। আসলে ভাল মানুষ হয়ে থাকা যায় না। রাজনীতির ক্ষেত্রে অবস্থান নেয়া ছাড়া বাঁচা যায় না। সেজন্য অবস্থান নেয়া জরুরী। অবস্থান নিলেও কল্লা যাবে (ইসলামিক রাষ্ট্রের কর্ণধারগণ তা প্রমাণ করছেন)। অবস্থান না নিলেও কল্লা নিরাপদ না। তাহলে?

বুদ্ধিজীবী মাত্রের ম্যান্ডেট থাকে। ম্যান্ডেট ছাড়া বুদ্ধিজীবী হয় না। সারা জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে গুন্টার গ্রাস এই সত্যে উপনীত হয়েছেন। আমরাও, এই দেশে, এই সত্যে উপনীত হচ্ছি প্রত্যহ, রোজ, জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে। জীবনযাপন ধর্মের চেয়ে বড়। আমরা জীবনযাপন করে প্রমাণ করি জীবন অনেক বড়। আমরা সেদিকে হাত বাড়িয়ে আছি। আডর্নোর কথা উদ্ধৃত করে আমার বক্তব্য শেষ করি : লেখক নিজের বাড়ি গুছিয়ে তোলেন। যে মানুষের কোন স্বভূমি নেই, লেখা সেক্ষেত্রে তার ঘরবাড়ি।

আমার সঙ্গে এই বাড়িতে থাকতে আসবেন? আমার হাত ধরে ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কি রুখে দাঁড়াবেন? আপনারা কি আমার সঙ্গে এই যুদ্ধে শামিল হবেন?