২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ইতিহাসের সাক্ষী কায়সার হামিদ

  • টি ইসলাম তারিক

একথা সত্য যে, আকাশে জ্বল জ্বল করে জ্বলা লক্ষ তারার সঙ্গে পূর্ণিমার চাঁদও উজ্জ্বল। পূর্ণিমার চাঁদ আলো ছড়ায় গোটা পৃথিবীতে যা সবার দৃষ্টিগোচর হয়। যা কারও নজর এড়ায় না। ঠিক তেমনি বাংলাদেশের পূর্ণিমার চাঁদ রানী হামিদ, যার নাম বিশ্বজুড়ে। তিনি আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্রের মাতা। তিনি আর কেউ নন বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনে যার বিশাল পরিচিতি, যিনি মাঠ মাতিয়েছেন তার ফুটবল শৈলী দিয়ে, স্টপার ব্যাক হয়েও মাঠে এবং মাঠের বাইরে যার আচরণ সাবলীল, কোটি সমর্থক যাকে চিনেন এক নামে, যিনি তার খেলোয়াড়ি জীবনে কখনই অখেলোয়াড়জনিত কারণে তেমন বিতর্কিত হননি। তিনি আমাদের কায়সার হামিদ।

১৯৮২ সালে রহমতগঞ্জ ক্লাবের হয়ে যাত্রা শুরু। ১৯৮৩ সালে বিজেএমসি, ’৮৪ সালে আবার রহমতগঞ্জে ফিরে আসা। এরপর ১৯৮৫ সালে মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবে যোগ দিয়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত একটানা খেলে গেছেন প্রিয় দল সাদা-কালোদের হয়েই। মাঝে মধ্যে দলবদলের হুঙ্কার দিলেও সাদা-কালো আর সমর্থকদের টানেই থেকে যান মোহামেডানে। জাতীয় দলের অপরিহার্য খেলোয়াড় ছিলেন ১৯৮৪ থেকে টানা ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত। সব চাইতে মজার বিষয় হচ্ছে, জাতীয় দলে খেলার সময় কখনই মাঠের বাইরে ছিলেন না। আর একটা হলুদ কার্ডও তিনি দেখেননি।

নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দল বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছে। আগামী মাসে অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দলের বাংলাদেশে আসার কথা আছে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলতে। এই ম্যাচ খেলতে সকারুরা আসবে কিনা তা বলা মুশকিল। তবে শঙ্কার কালো মেঘ ঠিকই আছে। এ প্রসঙ্গে কায়সার হামিদ বলেন, কোন দেশ অন্য কোন দেশে আসলে নিরাপত্তা চাইবেন এটাই স্বাভাবিক। এদিক থেকে বাংলাদেশ ভিনদেশীদের নিরাপত্তা দিতে সর্বদাই প্রস্তুত। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে। তাই বলে সফর বাতিল করার মতো কোন ঘটনা ঘটেনি। তিনি আরও বলেন, ২০১০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। সেখানে অনেক জায়গা আছে যেখানে নিরাপত্তার চরম অবনতি দেখা যায়। পর্যটকরা সেখানে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও করতে পারেন না। তাই বলেতো সেটা বিশ্বকাপ আয়জনের কোন বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। পাকিস্তানেও তো অস্থিতিশীল অবস্থা। তারপরও তো সেখানে বাংলাদেশের নারীরা গিয়ে ক্রিকেট খেলে আসলো। অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটের পরাশক্তি, তাই বলে বাংলাদেশ তাদের নিরাপত্তা দিতে পারবে না এমনটা ঠিক নয়। অস্ট্রেলিয়া না আসাতে তাদের কোন ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে আমাদের। তবে অস্ট্রেলিয়া ফুটবল দলের বাংলাদেশে খেলতে আসা উচিত বলে মনে করেন কায়সার।

বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান সময়টা খুব একটা ভাল যাচ্ছে না। এরপরও সাফ অনুর্ধ-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে আশার আলো জ্বালিয়েছে বাংলার কিশোররা। কায়সার হামিদ মনে করেন এই ১৬ দল কে ঠিক মতো গড়ে তুলতে পারলে আগামী কয়েক বছর পর তারাই চমক দেখাতে পারবে। অনুর্ধ দলের সজীব, আতিক, শাওন, ফাহিম, মোর্শেদ, হৃদয় এবং নিপুদের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছেন তিনি। তার মতে, ফুটবল ফেডারেশনের উচিত শুধু অনুর্ধ ১৬ নয়, অনুর্ধ ৮ থেকে ১০, ১২, ১৪, ১৬ এবং ২০ দল তৈরি করতে হবে। তাছাড়া স্কুল ফুটবলের ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের ফুটবলে বেশ দ্রুতই কোচ পরিবর্তন হয়ে থাকে। এটা সমর্থন করেন না কায়সার। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিদেশীদের দিকে বিশেষ করে যে সমস্ত দেশ ক্রমান্বয়ে ফুটবলে উন্নতি করে চলেছে তাদের দিকে নজর দিতে হবে। অস্ট্রেলিয়ায় আগে রাগবি ছিল প্রধান খেলা। কিন্তু তারা অল্প সময়ের মধ্যে শুধুমাত্র সঠিক পরিকল্পনার কারণেই আজকে ফুটবলে দারুণ উন্নতি করেছে। তা ছাড়া জাপান, কোরিয়ার দিকে তাকালে বিষয়টা আর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে অনেক স্মরণীয় খেলা আছে কায়সারের। তবে এর মধ্যে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ দলের হয়ে প্রেসিডেন্ট কাপ চ্যাম্পিয়ন তার কাছে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া ১৯৮৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে চুন্নু এবং তার নিজের দেয়া গোলে জয়লাভ করার ঘটনা কায়সারকে আজও তৃপ্ত করে। ক্লাবের হয়ে সেরা খেলা তার আবাহনীর বিরুদ্ধে ১৯৮৭ সালের লীগের শেষ ম্যাচে। যে ম্যাচটা আজও কায়সারকে শিহরিত করে তোলে। তিনি ওই ম্যাচটাকে অসাধারণ একটা ম্যাচ হিসেবে উল্লেখ করেন। যেখানে আবাহনী ড্র করলেই চ্যাম্পিয়ন, সেখানে মোহামেডানকে চ্যাম্পিয়ন হতে হলে জিতে আবার রিপ্লে ম্যাচ খেলতে হবে। এরকম একটা শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মোহামেডান ওই ম্যাচ হারতে হারতে ৩-২ গোলে জিতে যায়। তারপর রিপ্লেতে ড্র হলে পরবর্তীতে দর্শকদের চাপ সামলানোর জন্য এরশাদ আর্মি স্টেডিয়ামে দর্শকশূন্য অবস্থায় খেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে ২-০ গোলে জিতে মোহামেডান অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। কায়সারের কাছে এটা অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে আছে। এছাড়া কায়সারের কাছে সেরা মুহূর্ত মোহামেডানের হয়ে ১৯৮৬, ’৮৭, ’৮৮, ’৮৯ অপরাজিত হ্যাটট্রিক লীগ চ্যাম্পিয়নের স্বাদ পাওয়া। যা ঢাকার মাঠে ইতিহাস হয়ে আছে। তাছাড়া মিরপুর মাঠে এশিয়ান ক্লাব কাপ চ্যাম্পিয়নশিপের খেলায় ইরানের পিরুজি ক্লাবকে হারানোর মুহূর্তটা আজও অম্লান বলে জানান। কোচ নাসের হেজাজির নিবিড় প্রশিক্ষণের কথাও উল্লেখ করেন। হেজাজির প্রশিক্ষণে মোহামেডান এশিয়ান ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। ডিফেন্ডার হলেও ক্লাবের ও দেশের হয়ে অনেক স্মরণীয় ও দৃষ্টিনন্দন গোল করে আছে কায়সারের। তবে তিনি সেরা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ১৯৯৩ সালে ডামফা কাপের ফাইনালে আবাহনীর বিরুদ্ধে ৩০ গজ দূর থেকে ফ্রিকিক থেকে করা গোলটিকে। স্টপার পজিশনে খেলার পরও প্রতিবছর দলের হয়ে কমপক্ষে ৫/৬টা গোল তিনি করতেন।

কায়সারের প্রিয় খেলোয়াড়ের তালিকায় অনেকেই আছেন। এর মধ্যে সাব্বির, বাদল রায়, সালাম মুর্শেদী, জোশি, মোনেম মুন্না এবং কাজী সালাহউদ্দিনের নাম উল্লেখযোগ্য। বিদেশীদের মধ্যে জিকো, সক্রেটিসের পাশাপাশি বর্তমানের মেসি, রোনাল্ডো ও নেইমারের খেলা পছন্দ করেন। একজন দর্শক হিসেবে স্টপার ব্যাক কায়সার নাকি মোনেম মুন্না কাকে এগিয়ে রাখবেন? এমন প্রশ্নে কায়সার সাবলীলভাবে বলেন, কেউ কারও স্থান কখনও দখল করতে পারেন না। আর এগিয়ে রাখার বিষয়ে দর্শকরা রায় দিবেন। তবে একথা সত্যি মুন্নার চার্জ করার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তার অকাল মৃত্যু আমাকে আজও কষ্ট দেয়।

চট্টগ্রাম আবাহনী চট্টগ্রামেই আয়োজন করতে যাচ্ছে শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট। দেশী তিনটি দলসহ বিদেশী পাঁচটি দল নিয়ে টুর্নামেন্টটি অনুষ্ঠিত হবে। দেশী দলগুলোর মধ্যে আছে ঢাকা মোহামেডান, ঢাকা আবাহনী এবং চট্টগ্রাম আবাহনী। বিদেশী দলের মধ্যে কলকাতা মোহামেডান, ইস্ট বেঙ্গল এবং পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তানের একটি করে দল। কায়সার হামিদ এ আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মনে করেন দুই দলের দর্শক জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করে মোহামেডান এবং আবাহনীর উচিত হবে ভাল দল গঠন করে এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করা এবং দর্শক জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখা। প্রতিবছরই এরকম আয়োজন হলে দেশের ফুটবলের জোয়ার আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে বলে মনে করেন তিনি। কায়সার হামিদ বলেন, দেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তা মোটেও কমেনি। এখনও ঢাকার বাইরে খেলা হলে দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যায় গ্যালারি। খেলার মান বাড়লে ফুটবলের জনপ্রিয়তাও বাড়বে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে দর্শকদের চাপে ঠিকমত প্র্যাকটিস করতে পারতাম না আর এখন মোহামেডান-আবাহনীর খেলায় দর্শক হয় হাতেগোনা ! দেশীয় ফুটবলকে জাগিয়ে তোলার বিষয়ে সাবেক তারকা ফুটবলারদের এগিয়ে আসতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে উপস্থিত থেকে বাচ্চাদের উৎসাহ দিতে হবে। দেশের ফুটবলের জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরতে হবে। বিগত দিনে ফুটবলের অবস্থান কোথায় ছিল তা তাদের জানাতে হবে।

স্ত্রী লোপা হামিদ আর দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে কায়সার হামিদের সুখের সংসার। তাঁর ফুটবল প্রেম সংসারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনই। বাংলাদেশের সাবেক তারকা এই ফুটবলারের আশা, দেশের ফুটবল একদিন ফিরে পাবে হারানো গৌরব। আবার দর্শক স্টেডিয়ামমুখী হবেন।

নির্বাচিত সংবাদ
এই মাত্রা পাওয়া