২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

‘তিনটা মিনিটই ছিল খুব উত্তেজনাকর’

  • প্রথমবার স্যার ভিভের সাক্ষাতের আনন্দ

মোঃ মামুন রশীদ

সময় মানুষকে বদলে দেয়, বদলে দেয় অবস্থান। সেটা বিরল সম্মানের কারণে মর্যাদারও হতে পারে আবার হতে পারে পতিত লজ্জার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যুগে যুগে সর্বজনবিদিত, সবার কাছে সম্মানীয় ও মর্যাদার উচ্চ শিখরে উঠিয়েছে অনেককেই। মানুষের মন জয় করে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তায় শীর্ষে উঠেছেন অনেকেই। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত সারাবিশ্বের মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে নাম। অনেকে তো আবার পুজোনীয় এবং ২২ গজি ক্রিকেট পিচের ঈশ্বর হিসেবেও স্বীকৃতি পেয়েছেন। ক্রিকেট ইতিহাসে ওয়ানডে ও টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক রান ও সেঞ্চুরির মালিক শচীন টেন্ডুলকর অনেক উপাধি, পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছেন। তাঁকেই তো ভারতবাসী ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ উপাধি দিয়ে পুজো করেছেন। সে সম্মান ও মর্যাদা অর্জনের জন্য টানা ২৪ বছর ২২ গজের ক্রিকেটে বিপুল বিক্রমে নিজেকে মেলে ধরেছেন। কিন্তু শুরুতে শচীন যা করেছিলেন তাতে করে শুধু ‘লিটল মাস্টার’ তকমাটাই জুটেছিল। ভারতীয়দের ‘ক্রিকেট ঈশ্বর’ হয়েছেন আরও পরে। সেই শচীনও অনেক কিংবদন্তিকে অনুসরণ করেছেন, অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে নিয়েছেন বিশেষ কোন মহান ক্রিকেটারকে। সেই ক্রিকেটারের নাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি স্যার ভিভ রিচার্ডস। হ্যাঁ তাঁকে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ‘হিরো’ হিসেবেই বিবেচনা করতেন শচীন। ক্যারিয়ার শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই যখন স্যার ভিভকে সরাসরি দেখেছেন অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থেকেছেন। পরে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন। তখন ভিভ অনেক বড় তারকা এবং যথেষ্ট সময়ও ছিল না হাতে। তাই শচীন তাঁর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন মাত্র তিন মিনিট। নিজের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’-তে সেই স্মরণীয় ঘটনার স্মৃতিচারণ করেছেন শচীন। সেখানে তিনি ভিভের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের মাত্র তিন মিনিটের মুহূর্তকে অন্যতম প্রাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সেই চমকপ্রদ ঘটনা নিয়েই এবারের লেখা-

সিডনিতে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছিলেন। অপরাজিত ১৪৮ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলে ওই সফরে সেরা সাফল্যটা পেয়েছিল ভারতীয় দল। টানা দুই টেস্ট বাজেভাবে হারের পর সিডনি টেস্টে শচীনের দারুণ এই সেঞ্চুরির কল্যাণেই ড্র করে মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের দল। আগেই ২-০ ব্যবধানে এগিয়েছিল পাঁচ টেস্টের ওই সিরিজে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া। সিডনিতে তৃতীয় টেস্ট হারলেই সিরিজ হাতছাড়া হয়ে যেত। ১৯৯১ সালের নবেম্বরে ভারত ক্রিকেট দলের অস্ট্রেলিয়া সফরের কথা সেটি। শচীনের ক্যারিয়ারে প্রথম অস্ট্রেলিয়া সফর। দীর্ঘ একটা বছর কোন টেস্ট খেলেননি। ১৯৯০ সালের নবেম্বরে ইংল্যান্ড সফরের শেষ টেস্টে ১১৯ রানের হার না মানা ইনিংস খেলেছিলেন। সেটি ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট শতক। সে বছরেরই নবেম্বরে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে একটি টেস্ট খেলে টানা এক বছর মাঠের বাইরে ছিলেন তিনি। এরপরই ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিনতম সফরে আসেন শচীন। অস্ট্রেলিয়ায় টানা এক বছর টেস্ট ক্রিকেটের বাইরে থাকার পর এসে দারুণ দুর্গতির মধ্যে পড়ে ভারতীয় দল। শচীনও নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি প্রথম তিনটি টেস্টেই। ব্যাটিং ব্যর্থতায় বেহাল অবস্থা ছিল অবশ্য পুরো ভারতীয় দলেরই। দুই টেস্টেই ব্যাট হাতে লিটল মাস্টার শচীনও ব্যর্থ। চার ইনিংসে করতে পেরেছিলেন ১৬, ৭, ১৫ ও ৪০ রান। তবে তৃতীয় টেস্টে জ্বলে উঠলেন শচীন। ক্যারিয়ারসেরা ১৪৮ রান করে থাকলেন অপরাজিত। ফুরফুরে মেজাজ নিয়েই সিরিজের চতুর্থ টেস্ট খেলার জন্য এ্যাডেলেইডে আসতে পেরেছিল ভারতীয় দল। তরুণ শচীনও মানসিকভাবে বেশ চাঙ্গা! মার্ক টেলর, ডেভিড বুন এবং এ্যালান বোর্ডারদের সঙ্গে মাঠেই খেলে ফেলেছেন। সে সময়ের বিশ্ব মাতানো ক্রিকেটার তাঁরা। মাঠে প্রতিপক্ষ এবং মাঠের বাইরেও তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাত হয়েছে তরুণ শচীনের। কিন্তু যাঁকে গুরু মনে করেন, যাঁকে মনে করেন নিজের ‘নায়ক’ হিসেবে সেই স্যার ভিভের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিন বছর পার হয়ে গেছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে। কিন্তু এ্যাডেলেইডে আসার পরই সেই কাক্সিক্ষত সুযোগটা মিলল। ভিভের খেলা দেখেছেন, কিন্তু তাঁর সঙ্গে খেলা হয়নি। এমনকি দেখা হয়নি সরাসরি। তবে মাঠের বাইরে এ্যাডেলেইডে দেখা হলো এ কিংবদন্তির সঙ্গে। বন্ধু সঞ্জয় মাঞ্জেরেকারের সঙ্গে প্রতিটা মুহূর্তই কাটান শচীন। এমনকি প্রথমদিকে যে কোন সফরে দু’জন হোটেলের একই কক্ষে থাকতেন। বাইরে বেরোলেও মাঞ্জেরেকার। এ্যাডেলেইডের একটি হোটেলের বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন দু’জন। হঠাৎ বাইরে একটি গাড়ি থামল এবং শচীন দেখলেন মাথায় টুপি পরা এক কৃষ্ণাঙ্গ বের হলেন গাড়ি থেকে। দূর থেকে তাঁকে বেশ চেনা চেনা লাগছিল শচীনের। মাঞ্জেরেকারকে শচীন বললেন, ‘আমি এই লোকটাকে আগে কোথায় যেন দেখেছি।’ তাকিয়েই ছিলেন, দৃষ্টি ফেরাননি শচীন। কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি কাছে আসার পরই চেঁচিয়ে ওঠেন শচীন, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, ওটা তো ভিভ রিচার্ডস!’

হোটেল লবিতে উঠে শচীন-মাঞ্জেরেকারকে পাশ কাটিয়েই চলে গেলেন ভিভ, অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলেন শচীন। ভিভ চলে যাওয়ার পর মাঞ্জেরেকারকে তিনি বলেন, ‘এইমাত্র আমি তাঁকে দেখেছি এবং আমি শুধু তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতে চাই।’ এরপর মাঞ্জেরেকার তাঁকে নিয়ে হোটেলের রিসেপশনে গেলেন। সেখান থেকে স্যার ভিভের কক্ষের নম্বর জেনে নেন দু’জন। এরপর শচীন অনুরোধ করে মাঞ্জেরেকারকে দিয়ে ভিভেব রুমে ফোন কল করান। ১৯৮৯ সালে মাঞ্জেরেকার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ভিভের সঙ্গে খেলেছিলেন। সে কারণেই তাঁকে দিয়ে কল করিয়েছেন শচীন। অবশেষে সাক্ষাত করার সুযোগ পেলেন দু’জন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ভিভের কক্ষে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত! যেন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছিল শচীনের। কারণ সেটিই প্রথমবার ভিভকে সরাসরি দেখা এবং কথা বলা। যদিও মাত্র তিন মিনিট তাঁর রুমে ছিলেন শচীন-মাঞ্জেরেকার। সামান্য কুশল বিনিময় ছাড়া আর কোন কথা হয়নি। তবে দারুণ চঞ্চলতা বোধ করছিলেন শচীন এবং উত্তেজনা কাজ করছিল তাঁর মধ্যে। এ বিষয়ে তিনি লিখেছেন, ‘সেটা ছিল খুবই উত্তেজনাকর এক মুহূর্ত। তিনটা মিনিট ছিল খুব আনন্দের!’ অথচ এই শচীনই পরবর্তীতে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার ক্রিকেটারের স্বপ্নের ‘নায়ক’ হয়ে গেছেন। সবাই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে, দেখা করতে এবং খেলার সুযোগ করে নিতে উন্মুখ হয়েছেন।

তথ্যসূত্র : শচীন টেন্ডুলকরের আত্মজীবনী ‘প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে’ অবলম্বনে।