২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বালিকাবধূর সংখ্যা কমছে

  • বাল্যবিয়ের হার কমেছে ১৬ শতাংশ ॥ শূন্যের কোটায় আনতে নানা কর্মসূচী

সমুদ্র হক ॥ দেশে বালিকাবধূর সংখ্যা কমছে। বাল্যবিয়ে শূন্যের কোটায় নামিয়ে আনতে মাঠ পর্যায়ে সরকারী ও বেসরকারীভাবে সচেতনতামূলক কর্মসূচী পালিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বাল্যবিয়ে রোধে শীঘ্রই আইন পাস করে তা বাস্তবায়ন করা হবে, এমনটি জানিয়েছে সূত্র। উল্লেখ্য, ১৯২৯ সালে বাল্যবিয়ে নিরোধ যে আইন হয় তাতে ১৯৬০ সালে প্রথম সংশোধনী আনা হয়। এরপর গত শতকের ’৮০-এর দশকের প্রথম ভাগে সর্বশেষ সংশোধনীতে মেয়েরদের বিয়ের বয়স সর্বনিম্ন ১৮ বছর ও ছেলেদের ২১ বছর করা হয়। এই আইনটি এখনও বহাল আছে। তবে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে আইনটিকে আরও যুগোপযোগী করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত বছর ১৫ সেপ্টেম্বর বাল্যবিয়ে নিরোধ আইনের খসরা মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদন করে। এটি সংসদে পাসের অপেক্ষায়।

এদিকে প্রায় দশ বছরের ব্যবধানে বাল্যবিয়ে অন্তত ১৬ শতাংশ কমেছে। এই হার আরও কমিয়ে আনতে সর্বস্তরে সচেতনতামূলক এবং উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রতিটি জেলার তথ্য অফিস এই বিষয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। এই বিষয়ে বগুড়া জেলা তথ্য কর্মকর্তা মজিবর রহমান জানান, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিয়ে রোধে তাদের দুটি ইউনিট সর্বক্ষণিক সক্রিয় থাকে। উপজেলা, ইউনিয়ন, গ্রাম পর্যায়ে তারা সর্বস্তরের লোকজনকে নিয়ে নিয়মিত কর্মশালা ও গৃহস্থ বাড়ির উঠানে মাল্টিমিডিয়ায় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করছে। গ্রামের হাট-বাজারে মোবাইল চলচ্চিত্র ইউনিট যাচ্ছে। আরেকটি সূত্র জানায়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জেলা পর্যায়ে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে শিশুর প্রতি সহিংসতা ও বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই বিষয়ে পাবনার সূচনা সমাজকল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক পূর্ণিমা ইসলাম জানান, পাবনার ১২ উপজেলাতেই এই কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রতিটি কর্মশালায় মাঠ পর্যায়ের সর্বস্তরের শতাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি উপস্থিত থাকেন। সরকারী ও বেসরকারীভাবে নেয়া কর্মসূচীতে ভাল সাড়া মিলছে।

এদিকে এ বছর জুলাই মাসের ২৯ তারিখে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের এক নীতি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এক তথ্যে জানানো হয় দেশে বাল্যবিয়ে ১৬ শতাংশ কমেছে। তবে বাল্যবিয়ে একেবারে রোধ করা যায়নি। অনুষ্ঠানে ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বিগবেদার বলেন বাল্যবিয়ে বন্ধে বর্তমান নীতিমালা সংস্কারের প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে খোঁজ করে জানা যায়, দেশের প্রায় ৮৮ শতাংশ অভিভাবক জানে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮। তার পরও তারা জেনেশুনে অল্প বয়সী মেয়েদর বিয়ের পিঁড়িতে বসাচ্ছেন। সচেতন মানুষের কথা- এই জায়গাটিতেই আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। তা যে হচ্ছে না াও নয়। যখনই বাল্যবিয়ের ঘটনা প্রকাশ হচ্ছে তখনই এলাকার মানুষ তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানাচ্ছে। এমনকি হালে স্কুলের সহপাঠী ও গ্রামের শিশুরা বাল্যবিয়ে ঠেকাতে মাঠে নেমেছে। তাদের কথা, প্রশাসন তাদের কথা বিশ্বাস করে সামান্য সহযোগিতার হাত বাড়ালেই বাল্যবিয়ে দ্রুত নিরোধ হবে। বগুড়ার সোনাতলা এলাকার কয়েক শিশু বলল, বাল্যবিয়ের খবর থানায় জানালে কখনও বলা হয় অভিভাবকদের সঙ্গে আনতে। থানার অফিসারদের উচিত বাল্যবিয়ে রোধে সহযোগিতার হাত বাড়ানো।

খোঁজ করে এবং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র দেখে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যে এলাকায় নারী শিক্ষার হার বেশি সেখানে বাল্যবিয়ের হার অনেক কম। উন্নত গ্রামগুলোতে যেখানে পরিবার থেকে শিশুরা শিক্ষার আলোক ধারায় বেড়ে উঠছে সেখানে বাল্যবিয়ে ঠেকাতে শিশুরা সোচ্চার হয়ে উঠছে। তারাই মুরব্বিদের খবর দিচ্ছে। বাল্যবিয়ে ঠেকাতে এমন পজিটিভ ধারা শুরু হয়েছে। এই বিষয়ে বগুড়া সরকারী আযিযুল হক কলেজের সহকারী অধ্যাপক ড. ত্বাইফ মামুন বললেন, বাল্যবিয়ে রোধে আইন একটি মাধ্যম। তবে সবচেয়ে বড় মাধ্যম হলো নারী শিক্ষা ও সমাজ সচেতনতা। বর্তমান প্রজন্ম বিষয়টি বুঝে যে এগিয়ে এসেছে এই এগিয়ে আসাকেই কাজে লাগাতে হবে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে।

বিশিষ্ট গাইনোকোলজিস্ট ডাঃ গুলশান আরা স্পষ্ট করে বললেন কোন অবস্থাতেই ১৮ বছরের আগে বিয়ে নয়। অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন মেয়েদের সন্তান ধারণ উপযুক্ত সময় ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। উন্নয়নশীল দেশে মেয়েদের বিয়ে ২০ বছরে হলে সামগ্রিকভাবে জন্মহার কমে যাবে (জন্মনিয়ন্ত্রণসাপেক্ষে)। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতরে কেরালা রাজ্য তার বড় প্রমাণ, সেখানে মেয়েদের বিয়ের সর্বনি¤œ বয়স ২২ বছর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বগুড়ার সুধীজন বললেন, কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিলে তাদের শৈশবের আনন্দের দিনগুলো কেড়ে নেয়া হয়। যা অমানবিক। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যগত যে সমস্যা দেখা দেয় তা অভিভাবকের সামনেই ঘটে জীবনভর বয়ে বেড়াতে হয় সেই শিশুকে। এক তথ্যে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও উন্নত বিশ্বের মেয়ে গর্ভধারণ ও প্রজনন প্রক্রিয়ায় যৌবনের মাত্র ১০ থেকে ১২ বছর ব্যয় করে সেখানে বাংলাদেশের নারী ব্যয় করে যৌবনের ২৫ থেকে ২৮ ভাগ সময়। যা সুন্দর সমাজ ব্যবস্থা গড়ার বড় অন্তরায়।