১১ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া এগোচ্ছে আমেরিকা গুটিয়ে নিচ্ছে

মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বের বিরাট তল্লাটজুড়ে যে যুদ্ধ চলছে, তাতে দুই বিশ্বশক্তিকে দুই ভূমিকায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। একদিকে ক্লান্ত ও পরিশ্রান্ত আমেরিকা নিজকে গুটিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়ন মধ্যপ্রাচ্য থেকে কার্যত উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর রাশিয়া আবার সেখানে ফিরে আসছে। যার পরিণতিতে সিরিয়ায় সরাসরি রুশ হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বেড়ে গেছে। এ অবস্থায় মুসলিম বিশ্বে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে রাশিয়াকে নতুন জনতার ভূমিকায় আবির্ভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এবং অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ভীরুতা ও দোদুল্যমানতার পরিচয় দিতে দেখা যাচ্ছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার জেট জঙ্গীবিমানকে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশারের অবরুদ্ধ সৈন্যদের সাহায্যার্থে এ্যাকশনে যেতে দেখা যায়। রাশিয়া এখন ইরাক ও ইরানের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য দেয়া-নেয়ার এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। রুশ অর্থোডক্স চার্চও এখন খোলাখুলিই ধর্মযুদ্ধের কথা বলছে। অবশ্য ইসলামিক স্টেটের (আইএস) বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে দাবি পুতিন করেছেন, সেটা কতখানি আন্তরিক তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ সিরিয়ায় আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে প্রথম দিনেই রাশিয়া অন্যান্য সুন্নি বিদ্রোহীর ওপর বোমা ফেলেছে, যাদের কোন কোন গ্রুপ আমেরিকার সাহায্য-সহায়তায় লালিত। তবে যাই হোক, এই হামলার মধ্য দিয়ে রাশিয়া দীর্ঘদিন পর এমন এক এলাকায় ফিরে আসার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় চালটি দিয়ে ফেলেছে, যে এলাকায় এতদিন ছিল আমেরিকার রাজত্ব।

ওদিকে, আফগানিস্তানে আমেরিকার তালেবানবিরোধী যুদ্ধ মার খেয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর তালেবানরা উত্তরের কুন্দুজ শহর দখল করে নেয়। তিন দিন পর আফগান বাহিনী শরহটি পুনর্দখল করে নিলেও এই তিন দিন শহরটি যে তালেবানদের দখলে চলে গিয়েছিল, সেটাই আফগান বাহিনীর জন্য চরম লজ্জার ব্যাপার। বলা বাহুল্য, ২০০১ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম তালেবানদের হাতে কোন নগরীর পতন ঘটল।

তালেবানদের কুন্দুজ দখল আর সিরিয়ায় রাশিয়ার কার্যত হস্তক্ষেপ মোটামুটি একই সূত্রে গাঁথা। এ হলো মুসলিম বিশ্বের চলমান যুদ্ধ থেকে আমেরিকার হাত গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টার অনিবার্য পরিণতি। আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা ও দখলদারীর পর এক ল-ভ- অবস্থা করে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আমেরিকা এখন নিজেকে কার্যত গুটিয়ে নিয়েছে। কারণ আমেরিকা যে অর্থে স্থিতিশীলতা চাইতে, সেটা আর এই অঞ্চলে কখনই ফিরে আসবে না। আবার আমেরিকার হাত গোটানোর ফলে আপাতত যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, সেটাও ওই অবস্থায় থাকতে পারছে না। পূরণ হয়ে যাচ্ছে বা হওয়ার পথে রয়েছে প্রতিবেশী বা আঞ্চলিক শক্তিগুলো জড়িয়ে পড়ার ফলে। এতে করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটা ছাড়া উন্নতি ঘটছে না এবং ঘটবেও না। আমেরিকা ও তার মিত্ররা এখানে এমন সর্বনাশা অবস্থা তৈরি করেছে এবং এমন এক অস্থিরতার জন্ম দিয়েছে যে, পরিস্থিতির অবনতি মার্কিন হস্তক্ষেপ ঘটলেও হবে, না ঘটলেও হবে। সুতরাং রক্তপাত আরও বাড়বে। রুশ হস্তক্ষেপ সেই রক্তপাতকে আরও বাড়িয়ে তুলবে।

সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে ডব্লিউ বুশ ইরাককে যে ধরনের বারুদের স্তূপে পরিণত করেন তা দেখে প্রেসিডেন্ট ওবামা বোধগম্য কারণেই বেশ ক্লান্তি বোধ করেছিলেন। সে কারণেই তিনি সেখানে নতুন করে হস্তক্ষেপে নিরুৎসাহিত হয়েছিলেন। কিন্তু ইরাক ও সিরিয়ায় উগ্র সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা যে হারে বেড়ে চলেছে, আইএস যেভাবে হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে তাতে একটা সময় আমেরিকা হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হতে পারে। কিন্তু ওবামা যেভাবে দোদুল্যমানতার পরিচয় দিয়ে চলেছেন তাতে করে বিকল্প পথগুলো উত্তরোত্তর কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে আমেরিকার জন্য। ওদিকে, পুতিন এক স্বৈরাচারীকে সমর্থন জুগিয়ে এবং দেশের শিয়া-সুন্নি বিভাজনকে গভীরতর করে আমেরিকার জন্য পরিস্থিতিটা আরও নাজুক করে তুলেছেন। পুতিন একজন জুডোকা শত্রুর দুর্বলতাকে কিভাবে কাজে লাগাতে হয় জানেন। কাজেই আমেরিকা যখন পিছু হটছে, তিনি সামনে বাড়ছেন। তাই বলে পরিস্থিতিও যে তার জন্য খুব সুবিধার হবে তা মনে করার কারণ নেই। যতই তিনি স্বৈরাচারী আসাদকে সমর্থন করবেন, ততই সিরিয়াও এই অঞ্চলের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে। সিরিয়া তথা এই তল্লাটের আগুনে এক সময় আমেরিকার মতো রাশিয়ারও হাত পুড়বে।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট