২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

চীন কি অর্থনৈতিক পরাশক্তির পথে

  • অনুবাদ : এনামুল হক

গত আগস্ট মাসের প্রথম দিকে চীন তার মুদ্রা ইউয়ানের ৩ শতাংশ অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে বিশ্ব বাজারে কম্পন সৃষ্টি করেছিল। সবাই হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনা বৃহত্তর এক প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছিল। তা হলো- চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মন্থরতা থেকে সৃষ্ট চাপের কারণে কি চীন বিশ্ব অর্থনৈতিক মঞ্চে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার উচ্চাভিলাষ থেকে সরে এসেছে? বাস্তব অবস্থা, চীন সরে আসেনি।

চীনের অর্থনীতি কোন কোন ক্ষেত্রে উন্মুক্ত, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে রুদ্ধ। দুটি মিলে এক অসম্বদ্ধ বা ঢিলেঢালা সামগ্রিক এক রূপ ধারণ করেছে। বিদেশীরা সেখানে কারখানা খুলতে পারে, কিন্তু বন্ড কিনতে পারে না। মূল চীনের ভোক্তারা বিএমডব্লিউ গাড়ি ও পুসি হ্যান্ডব্যাগ কিনতে পারে, কিন্তু এগুলোর প্রস্তুতকারক কোম্পানির শেয়ার কিনতে পারে না। পিপলস ব্যাংক অব চায়না বিশ্বের সবচেয়ে স্বচ্ছ বন্ড বাজারের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী অথচ এই ব্যাংকটাই আবার সবচেয়ে অস্বচ্ছ বা ঘোলাটে। চীনের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক আফ্রিকায় ঋণ দেয়ার সময় সিংহের মতো রূপ ধারণ করে। আবার সেই একই ব্যাংক পাশ্চাত্যের মূলধন বাজারে ইঁদুরের মতো ভীরু হয়ে দাঁড়ায়। চীন হোঁচট খেলে তেলের দরও পড়ে যায়। এমন স্ববিরোধিতা শেষ পর্যন্ত একটা পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেয়। বাস্তবে কিছু একটা হচ্ছেও তাই। যেমন চীনে কঠোর আইন- কানুনের সুবিশাল প্রাচীর আছে। তার মধ্যে আবার ফাঁক-ফোকরও আছে। সেই ফাঁক-ফোকর দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ বেরিয়ে ম্যানহাটানের প্রোপার্টি ও সুইস বন্ডে গিয়ে শেষ হয়। অন্যদিকে বিদেশীদের চীনের বন্ড ও শেয়ার কিনতে দেয়ার ফলে বাইরে থেকে চীনে অর্থের যে প্রবাহ ঘটে, তাতে একটা ভারসাম্য রক্ষিত হয়।

তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকা পালন করার যে ক্ষমতা বা সম্ভাবনা চীনের রয়েছে সে ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারটা ন্যস্ত আছে মূলত চীনা নেতাদের হাতে। সেটা প্রয়োগের আগে তাদের একদিকে উচ্চাভিলাষ এবং অন্যদিকে স্বদেশে অস্থিরতার গভীর আশঙ্কা এই দু’টিকে আপেক্ষিক হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে।

চীনের উচ্চাভিলাষ থাকাটা বোধগম্য। চীন ন্যূনতম যা চায় তা হলো- সেই সুযোগ-সুবিধাগুলো যা এক বিশাল অর্থনীতি প্রত্যাশা করতে পারে। যেমন অর্থায়ন ও বাণিজ্যের বৈশ্বিক নিয়ম-কানুনের ব্যাপারে নিজের অধিকতর ভূমিকা থাকা এবং নিজের মুদ্রাটিকে বহুল ব্যবহৃত করে তোলা। চীনের এমন প্রত্যাশা অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অতি যৌক্তিক। আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীনের ভূমিকা যত শক্তিশালী হবে ততই চীন ডলার জোনে তার অধস্তন বা গৌণ ভূমিকা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। আর ইউয়ানকে সময়মতো ফ্লোট করতে দেয়া হলে অর্থনীতির পক্ষে ভালভাবে খাপ খাইয়ে নেয়া এবং বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমিয়ে আনা সহজতর হবে। মূলধন হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হলে বিদেশীদের পক্ষে চীনা বন্ড ও শেয়ার কেনা এবং ইউয়ানের পক্ষে বৈশ্বিক মুদ্রায় পরিণত হওয়া হবে সহজতর। চীনা কোম্পানিগুলো যদি ইউয়ানে ব্যবসা বাণিজ্য করতে ও ঋণ নিতে পারে, তাহলে তার ডলারের প্রয়োজন কম হবে এবং ডলার মজুদ করার প্রবণতাও কমে যাবে। এর সমান্তরাল একটা লাভ হলোÑ চীন তার অর্থলগ্নি বাজার সংস্কার করতে বাধ্য হবে।

তবে এই সঙ্গে অস্থিরতার আশঙ্কাটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রবৃদ্ধি যদি মন্থর হয়ে পড়ে, তাহলে চীনের সংস্কারকরা পরিবর্তনের বিরোধী কায়েমী স্বার্থের তরফ থেকে আক্রমণের সম্মুখীন হতে পারেন। তবে প্রবৃদ্ধি এখনও তেমন কমে আসেনি। সরকারী হিসাবে প্রবৃদ্ধি বর্তমানে ৭ শতাংশ হারে হচ্ছে। চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হতে চায়। আর সেজন্য ইউয়ানকে ডলারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে লেনদেনযোগ্য মুদ্রায় পরিণত করতে চায়। চীনের এই উচ্চাভিলাষ পূরণের পথে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো গত জুন মাসে বেজিংয়ে এশীয় অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক (এআইআইবি) প্রতিষ্ঠা। এই ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন থাকবে দুই হাজার কোটি ডলার। ন্যাটোর ১৩টি সদস্য দেশ, ইরান, ইসরাইল, সৌদি আরবসহ ৫০টি দেশ এতে স্বাক্ষর করে। এই ব্যাংকে চীনের থাকবে ২৬ শতাংশ ভোট, যার ফলে ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়া ও চাকরিচ্যুত করা, গঠনতান্ত্রিক পরিবর্তন ও অন্যান্য বিষয়ে চীনের কার্যত ভেটো ক্ষমতা থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র এ নিয়ে অস্বস্তিবোধ করতে পারে। কিন্তু চীন বলতে পারে যে, ব্যাংক মূলধনের ৩০ শতাংশ জোগাচ্ছে সে। কাজেই তার এমন ক্ষমতা থাকতেই পারে। চীন, ভারত ও ১৪টি এশীয় দেশ মিলে বিশ্ব জিডিপির ৩০ শতাংশ সৃষ্টি করছে। চীনের এখন লক্ষ্য হচ্ছে, তার ইউয়ানকে ডলারের মতো আন্তর্জাতিক মুদ্রায় পরিণত করা। চীনের বৈদেশিক লেনদেন যে পরিসরে ইউয়ানে পরিচালিত হচ্ছে তা এখনও সীমিত। ১০ শতাংশের কম।

তবে প্রায় ৪০ হাজার কোটি ডলারের সমপরিমাণ ইউয়ান অফশোর-এ এবং প্রধানত এশিয়ায় জমা হয়ে আছে। কিন্তু এশিয়ার প্রধান অর্থলগ্নি কেন্দ্র হংকং ও সিঙ্গাপুরে জমে থাকা ডলারের অঙ্কে ইউয়ানের প্রায় চারগুণ। অবশ্য বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান হারে ইউয়ানে লেনদেনের ফলে এই হার গত দু’বছরে বদলে গেছে। চীন আশা করে যে, ইউয়ানে লেনদেন ক্রমশ বাড়বে। চীন বিশ্বের বৃহত্তম ভোগ্যপণ্যের ক্রেতা। তার একটা বড় অংশ তেল। এই তেল সে সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশ থেকে ডলারে কেনে। চীন এখন চাইছে যে, এই দেশগুলো তাদের বিক্রীত তেলের দাম ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে নিক। অন্তত আংশিকভাবে নিক। সেক্ষেত্রেও ইউয়ান একটা শক্তিশালী অবস্থানে আসবে এবং তার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এভাবে চীন ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক পরাশক্তির পথে এগিয়ে যেতে পারবে।

সূত্র : দ্য ইকোনমিস্ট