২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অসহিষ্ণুতা

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। ‘মেরে মহান ভারত’ বলে হাঁকডাক দিতেন ভারতের রাষ্ট্রনায়করা। সেই মহান ভারতকে একালে এক কবি অন্যভাবে সম্বোধনও করেছেন। স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৬৮ বছর পার হওয়ার মুহূর্তে ভারতের বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সম্প্রীতি, অসাম্প্রদায়িকতা যেন মুখ থুবড়ে পড়ছে। ধর্মীয় উন্মাদনা তৈরি করে হানাহানি, দাঙ্গা-হাঙ্গামার পথই খোঁজা হচ্ছে। দোষ ধর্মের নয়, দোষ মানুষের মনের। মনের বিকার সব জিনিসকেই বিকৃত করে দেখে। আর তা দেখে বলেই বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারতে বাড়ছে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিপীড়ন, হিন্দুত্ববাদের প্রসার, এমনকি গুজব ছড়িয়ে ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। তাই কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো ভারতের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধারাবাহিকতাকে বিনষ্ট করা শুধু নয়; উপমহাদেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করে এক ধরনের ফায়দা লুটতে চায়। জঙ্গী সংগঠন আইএস শরিয়াভিত্তিক ইসলামী খেলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষ হত্যাও কেবল নয়, প্রাচীন সব ঐতিহ্য ধ্বংস করে চলছে। এমনকি মসজিদে প্রার্থনারতদের ওপরও গুলি-বোমাবর্ষণ করে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। ভারতের শিবসেনা, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘসহ আরও কট্টর সংগঠন বিজেপির জোটভুক্ত হয়ে সেই স্টাইলে হিন্দুভারত বানানোর এক নৃশংস খেলা শুরু করেছে। যা ভারত নামক দেশটিকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। এই একুশ শতকে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের যুগে ভারতের রাজনীতির প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে গরু ও গরুর মাংস। গরু বিতর্ককে কাজে লাগিয়ে ভোটের রাজনীতিতে জেতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে বিজেপি। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে মেতে ওঠার পরিণাম ভোট ছাড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার পথকে প্রশস্তই করে তুলবে। বিজেপির ধর্মভিত্তিক রাজনীতির পরিণাম ক্রমশ ভয়াবহ উঠেছে। তার তৃণমূল সমর্থকরা ধর্মীয় উগ্রতা ছড়াচ্ছে। যা সীমা লঙ্ঘন করছে। বিষয়টি মোটেও হেলাফেলার নয়। ভারতে এমনিতেই প্রায়ই সাম্প্রদায়িক বিভেদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এটা হতেই পারে। বহু বর্ণ, জাতপাত, নানান ধর্ম ও শ্রেণীর মানুষের বসবাস ‘মেরে মহান ভারত’ জুড়ে যার অধিকাংশ মানুষ নিরক্ষর। বহু স্থানে আধুনিকতা ও সভ্যতার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। দলিত হরিজন শ্রেণীরা মানুষের মর্যাদা পায় না। এসবের দিকে দৃষ্টিপাত না করে গরু নিয়ে বাড়াবাড়ি আর যাই হোক সুস্থতার পরিচায়ক নয়। গণতান্ত্রিক ভারতে মানুষের ভিন্নমত পোষণকে টুঁটি চেপে ধরার নজির প্রতিদিনই বাড়ছে। আধুনিক ভারতে ধর্মবিশ্বাসের কারণে গো-মাংস ভক্ষণের দায়ে কেউ খুন হতে পারে, এমনটি প্রত্যাশিত নয়। কারণ এসব কর্মকা- অন্যদেশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। যা কাম্য নয়। গণতান্ত্রিক ভারতে ক্ষমতা বা ভোটে জেতার জন্য ভারতীয় নেতাদের ধর্মকে হাতিয়ার করা মোটেও সমীচীন নয়। রাজনীতি করার মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভারতের রয়েছে। সে সবে মনোযোগ না দিয়ে ‘গো-মাংস’ নিয়ে হল্লা করা সঠিক কাজ নয়। বিস্মকর যে, গো-মাংস রফতানিকারক বিজেপি বিধায়ক গো-হত্যা বন্ধে সোচ্চার আজ। কাশ্মীরে গরুর মাংস নিয়ে অধিবেশন চলাকালে এক সাংসদকে মারধরের ঘটনা উগ্রপন্থারই নজির। ভারতজুড়ে অসহিষ্ণুতার বাতাবরণ তৈরি হওয়া ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক বৃদ্ধির প্রতিবাদে ভারতে একডজন লেখক তাদের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার ফেরত দেয়ার ঘোষণা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছেন ‘মহান ভারতের’ অনুসারি মানুষও আছেন। প্রত্যাশা এটাই, ভারতে সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক রীতিনীতি বজায় থাকবে। সহিষ্ণুতা অক্ষুণœ রইবে মর্যাদার সঙ্গে।