১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বীরাঙ্গনা-মুক্তিযোদ্ধা

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিপুলসংখ্যক নারী মাতৃভূমির স্বাধীনতা অর্জনের পথে লাঞ্ছিত; নিপীড়িত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে গ্লানিময় অধ্যায় হলো নারীর সম্ভ্রমহানি। যুদ্ধের সময় সম্ভ্রম হারানো নির্যাতিত নারীদের অনেকে মারা গেছেন বা আত্মহত্যা করেছেন। কিন্তু এখনও যারা বেঁচে আছেন তাদের জীবন এখনও দুঃসহ ও অবমাননাকর। নারীর এই আত্মত্যাগ, সম্ভ্রমহানি খুবই বেদনাবহ। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হানাদারবাহিনীর হাতে নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত করেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘দেশের জন্য তারা ইজ্জত দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধার চেয়ে তাদের অবদান কম নয়, বরং কয়েক ধাপ ওপরে। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে, যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে।’ সে সময় উন্নত সামাজিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু সরকার এই সম্মাননা দেন এবং সংবর্ধনার মাধ্যমে বিশেষ সম্মানে তাদের ভূষিত করেন। তাদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণমূলক সংস্থাও গঠন করেন। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকা-ের পর বীরাঙ্গনারা এ দেশে নানাভাবে অবহেলিত এবং মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তবে আশার কথা দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে বীরাঙ্গনারা যে আশায় বুক বেঁধেছিলেন, সেই স্বপ্ন পূরণ করেছেন শেখ হাসিনার সরকার। অবশেষে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছেন সরকার। চলতি বছরের জুলাই থেকে মুক্তিযোদ্ধার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন তাঁরা।

একটি রিট আবেদনের জবাবে বীরাঙ্গনাদের সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করে গত বছরের জানুয়ারি মাসে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ১৩ অক্টোবর জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ২৫তম সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন সংজ্ঞার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। নতুন সংজ্ঞায় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নৃশংস নির্যাতনের শিকার নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এবার ৪১ জনের নামে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পর বীরাঙ্গনারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। গেজেটে বলা হয়েছে, মৃত বীরাঙ্গনার পরিবারও গেজেটে তাঁর নাম প্রকাশের জন্য আবেদনের সুযোগ পাবেন। আগামী বছরের ৩০ জুনের মধ্যে বীরাঙ্গনা নিজে বা তার দাবিদাররা মন্ত্রণালয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতির আবেদন করতে পারবেন।

এ কথা সত্য যে, একাত্তরে নির্যাতিত নারীদের তালিকা কোথাও সংরক্ষিত নেই। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংখ্যা আড়াই থেকে সাড়ে চার লাখ। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সামাজিক সম্মান না থাকায় অনেকে নির্যাতিত হওয়ার কথা প্রকাশও করেননি। অনেকেই আজ বেঁচেও নেই। এ অবস্থায় নির্যাতিতদের খুঁজে বের করে তালিকাভুক্ত করে গেজেট করা নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। এটি স্পর্শকাতর একটি বিষয়ও। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে বিতর্ক রয়েছে, নির্যাতিত নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হোক তা কাম্য নয়। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকতে হবে। যারা গেজেটভুক্ত হয়েছেন তারা যেন তাদের প্রাপ্য সম্মান, সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধাগুলো নির্বিঘেœ পান সেটা নিশ্চিত করা দরকার। প্রথম ধাপে মাত্র ৪১ জনের নাম গেজেটভুক্ত হয়েছে, পর্যায়ক্রমে বাকিদের নাম গেজেটভুক্ত করতে যেন কালবিলম্ব না হয় সেটা নিশ্চিত করা জরুরী।