২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সঙ্কট গণপরিবহনে

রাজন ভট্টাচার্য ॥ নানা সঙ্কটের মুখে থমকে আছে রাজধানীতে গণপরিবহন নামানোর উদ্যোগ। প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য ঢাকার রাস্তায় চলছে ১৭ হাজারের কম গণপরিবহন! যা আন্তর্জাতিক মানদ-ের মধ্যেই পড়ে না। সঙ্কট সমাধানে সরকারের উদ্যোগ আছে কিন্তু গতি নেই। ঢাকার রাস্তায় বাস চলছে মাত্র চার হাজার। অটোরিক্সা ৫-৬ হাজার ও ২৭টি নতুন ট্যাক্সিক্যাব। নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, জনসংখ্যার অনুপাতে রাজধানীতে কমপক্ষে ২০ হাজার বাস প্রয়োজন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত ট্যাক্সি ও অটোরিক্সার বিকল্প নেই। যানজট, অব্যাহত লোকসান, যন্ত্রপাতিতে মাত্রাতিরিক্ত শুল্কসহ নানা কারণে বাস নামাতে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। তারা বলছেন, নুতন করে বাস নামানো একেবারেই অনিশ্চিত। বন্ধ হয়ে গেছে এসি বাস সার্ভিসগুলো। তিন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রায় আট হাজার অটোরিক্সা নামানোর প্রক্রিয়া আটকে আছে দীর্ঘদিন। ভাড়া বেশি, যানজটসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় নতুন করে প্রায় এক হাজার অটোরিক্সা নামানো হচ্ছে না। লোকসানের কারণে যাও নেমেছিল সেগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। সিদ্ধান্তহীনতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রায় ৪০০ বিআরটিসি বাস কেনার প্রক্রিয়াও এগোচ্ছে না।

এই প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পরামর্শ পরিবহন মালিক, নগর পরিকল্পনাবিদসহ সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, যানজট নিরসনে সবার আগে সরকারী উদ্যোগগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। যে কোন মূল্যে প্রাইভেটকার চলাচলে ও রেজিস্ট্রেশন দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে মেয়াদোত্তীর্ণ ও রেজিস্ট্রেশনবিহীন পরিবহন। রাস্তা ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করার বিকল্প নেই। বাস ও যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরী। অটোরিক্সা ও ট্যাক্সি নামানোর ক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর করার এখন সময়ের দাবি। বাস কাউন্টার স্থাপন ও পার্কিং বে নির্মাণ সুবিধা, ব্যাংক লোনের ব্যবস্থাও করতে হবে। অন্যথায় দিন দিন সঙ্কট আরও বাড়বে। বন্ধ হবে গণপরিবহনগুলো আর সংকট সমাধান হলে, নতুন করে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তারা। ঢাকার রাস্তায় চলবে বিলাসবহুল গাড়ি। কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন যাত্রীরা।

নতুন বাস নামানোও অনিশ্চিত ॥ ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা শহরে মানুষের সংখ্যা এক কোটি ৬০ লাখ। আশপাশ মিলিয়ে প্রতিদিন প্রাই দুই কোটি মানুষের নগরীতে রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহন সমস্যা নিরসনে সরকারের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ না থাকায় প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বছর দশেক আগে ঢাকার সড়কে বেসরকারী উদ্যোগে প্রথম শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস সার্ভিস নিয়ে এসেছিল ট্রান্স সিলভা লিমিটেড। এখন এসি সার্ভিসগুলো বন্ধ রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম নিজের পরিবহন ব্যবসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন ১৯৯৪ সালে ভারতের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টাটা থেকে ৯৭টি ডেডিকেটেড সিএনজি বাস আমদানি করে যাত্রা শুরু করে ট্রান্স সিলভা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির বাসের সংখ্যা ২৫টি।

সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী রাজধানীতে গণপরিবহন সঙ্কট সমাধানে করণীয় প্রসঙ্গে বলেন, ১০০টি এসি বাস ও ২০০টি দোতলা বাস নামানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি কোম্পানিকে বাস নামানোর অনুমতি দেয়ার কথা জানান তিনি। অপর এক প্রশ্নে তিনি বলেন, বিআরটিসির আরও ১০০ জোড়া বাস ও ২০০ দোতলা বাস আনতে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমতি পেয়েছি। এসব পরিবহন রাস্তায় নামলে গণপরিবহন সঙ্কট অনেকটাই কমে আসবে। মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে রাজধানীতে চলাফেরা করতে পারবেন বলে জানান তিনি। এসব বিষয়ে সড়ক সচিব এমএএন সিদ্দিক গণমাধ্যমকে বলেন, সরকারীভাবে ৯৮০টি গাড়ি কেনা হয়েছে। আরও ৫০০টির প্রকিউরমেন্ট দেয়া আছে। আর বেসরকারী উদ্যোক্তারা যত ইচ্ছা গাড়ি নামাতে পারেন, এ অনুমতি তাদের দেয়া আছে। এছাড়া গণপরিবহন সমস্যা নিরসনে আমরা মেট্রোরেল করছি।

ঢাকা সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব আবুল কালাম জনকণ্ঠকে বলেন, রাজধানীতে নতুন নতুন বাস নামাতে সরকারীভাবে কোন বাধা নেই। মূল সমস্যা হলো যানজট। যানজটের কারণে অব্যাহত লোকসানের মুখে পরিবহন ব্যবসায়ীরা। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেউ নামেমাত্র টিকে আছেন। আগে যেসব পরিবহন ৬টি ট্রিপ দিতে পারত এখন দুটির বেশি সম্ভব নয়। এ কারণে ব্যবসায়ীরা বাস নামানোর ক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তিনি বলেন, বিগত ৩-৪ বছরে অন্তত ৫০টি পরিবহন কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। পুরনো কেউ কেউ কিছু বাস নিয়ে আবারও নামার চেষ্টা করলেও শুরুতেই হোঁচট খাচ্ছেন। প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা ও ফুটপাথ দখলমুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে এই পরিবহন নেতা বলেন, নগরীর বেশিরভাগ রাস্তা এখন প্রাইভেটকারের দখলে। সঙ্গত কারণে যানজট লেগেই থাকে। বর্তমান অবস্থায় প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ ও রাস্তা দখলমুক্ত করা না গেলে দিন দিন রাজধানীতে চলা বাসগুলো আরও বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষকে আরও সঙ্কটের মুখে পড়তে হবে।

যানজট মুক্ত, প্রাইভেটকার নিয়ন্ত্রণ ও শুল্কমুক্ত সুবিধা চান মালিকরা ॥ রাজধানীতে মাত্রাতিরিক্ত যানজট, রাস্তা ও ফুটপাথ দখল, গাড়ি-যন্ত্রাংশ আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক ও প্রাইভেটকারের কারণেই নতুন নতুন বাস নামাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন বেসরকারী খাতের পরিবহন মালিকরা। তারা বলছেন, উন্নত দেশগুলোতে নগর সুরক্ষা ও জনস্বার্থে কঠিন কঠিন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক বিবেচনায় উদ্যোগ নেয়া হয়। তারা বলেন, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে যে এলাকায় বসবাস করেন সে এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের পড়াশোনা করানো বাধ্যতামূলক। ঢাকায় সব ব্যতিক্রম। নামী-দামী স্কুলগুলোতে চলে ভর্তির প্রতিযোগিতা। প্রতিটি বিত্তবান শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে একটি প্রাইভেটকার। এক ভিকারুননিসা স্কুলের তিন ক্যাম্পাসে ১৬ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন রাজধানীতে নামছে অন্তত ১০ হাজার ব্যক্তিগত গাড়ি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ জনকণ্ঠ’কে বলেন, যানজটের কারণে বাস মালিকরা এখন আর গাড়ি চালাতে পারছেন না। নগরীতে প্রায় ২০ হাজার বাসের প্রয়োজন থাকলেও আছে মাত্র চার হাজার অথচ বিআরটিএ থেকে অনুমোদন নেয়া আছে সাত হাজারের। তবে গেল দুই বছরে অনুমোদিত প্রায় ৮০০ নতুন বাস রাস্তায় নেমেছে। বাস নামানোর ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, কাউন্টারের জন্য কোন অনুমোদন নেই, পার্কিং সুবিধা নেই, যানজট, পুরনো গাড়ির রুট পারমিট দেয়া বন্ধ, মাত্রাতিরক্ত শুল্ক ধরা হয়েছে। তাই অব্যাহত লোকসানের মুখে গাড়ি ব্যবসা এখন আর ভাল যাচ্ছে না। জনস্বার্থে গণপরিবহন বাড়াতে হলে, পার্কিং বে করার পাশাপাশি প্রাইভেটকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে প্রাইভেটকারে সিএনজি সরবরাহ একেবারে বন্ধের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ট্যাক্সি নামানোর সময় মালিকদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়া হয়েছে। নতুন বাস নামানো ও পার্টস আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা না গেলে দিন দিন রাজধানীতে চলা বাসের সংখ্যা আরও কমবে। বাড়বে সঙ্কট।

নগর পরিকল্পনাবিদরা যা বলছেন ॥ রাজধানীতে গণপরিবহন সঙ্কটের জন্য সরকারের ‘উদাসীনতাকে’ দায়ী করেছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা। পরিবহন মালিকদের কণ্ঠেও সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। তারা বলছেন, কর্তৃপক্ষের ‘উদাসীনতার কারণেই’ নগর পরিবহন খাত ধ্বংস হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের। সরকারের পরিকল্পনার অভাব, পর্যাপ্ত বাসস্ট্যান্ড না থাকা, যানজট আর যন্ত্রপাতির দাম বাড়ায় অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। বছরদশেক আগে ঢাকার সড়কে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বাস চলাচল করত বলে বাস মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়। এই সময়ে ঢাকায় মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হলেও কমেছে বাসের সংখ্যা।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ- বিআরটিএ’র ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর ১৬৮টি রুটে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা ৫ হাজার ৪০৭টি। এর মধ্যে- মিনিবাস ৩ হাজার ১২৬টি, আর বাস আছে ২ হাজার ২৮১টি। বিআরটিএ এ হিসাব দিলেও পরিবহন মালিকদের হিসেবে, রাজধানীতে চলাচলকারী বাসের সংখ্যা চার হাজারেরও কম।

গণপরিবহন সঙ্কট নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক সারোয়ার জাহান বলেন, দেড় কোটির বেশি জনসংখ্যার এ শহরে বাস প্রয়োজন অন্তত ১২ থেকে ১৩ হাজার। এ সংখ্যা বর্তমানে তিন হাজারের মতো। এর প্রধান কারণ সরকার গণপরিবহন নিয়ে মাথা ঘামায় না। ঢাকায় যানজটের কারণে বাস মালিকরাও কাক্সিক্ষত সংখ্যায় ট্রিপ পান না। আর এ কারণে তারাও এ সেবা নিয়ে খুব বেশি উৎসাহী নন। সড়কে গণপরিবহন হিসেবে বাসের সংখ্যা কমায় ক্রমশ ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বাড়ছে বলেও মনে করেন এ নগর পরিকল্পনাবিদ। এটা খুবই স্বাভাবিক। মানুষ চলাচল করবে কিভাবে? গণপরিবহন না থাকলে প্রাইভেট গাড়ি তো বাড়বেই, এতে রাস্তায় যানজট বাড়বে বলেন তিনি।

ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের তথ্যানুসারে, এক হাজার ৫২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ঢাকায় সড়ক রয়েছে দুই হাজার ৫৫০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক ৮৮ কিলোমিটার, যার বেশিরভাগই দখল করে নেয় ব্যক্তিগত যানবাহন। দুই বছর আগের এক হিসাবে দেখা যায়, মোট যানবাহনের মধ্যে ঢাকায় চলাচলকারী মানুষের মাত্র ছয় শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার করেন অথচ এই গাড়িগুলোই সড়কের ৮০ শতাংশ জায়গা জুড়ে থাকে।

নতুন ট্যাক্সি নামানো হচ্ছে না ॥ ২০১৪ সালের ২৩ এপ্রিল উদ্বোধন করা হয় নতুন ৪৬টি ট্যাক্সিক্যাব। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১৯টি ও ঢাকায় ২৭টি। ট্রাস্ট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসেস প্রাথমিকভাবে টয়োটা ব্র্যান্ডের জাপানে নির্মিত ১৫০০ সিসির ২৭টি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করছে। অপর বেসরকারী সংস্থা তমা গ্রুপ একই ব্র্যান্ডের ১৯টি ট্যাক্সিক্যাব পরিচালনা করবে। পর্যায়ক্রমে ঢাকা ও চট্টগ্রামে সর্বমোট ৬শ’ গাড়ি পরিচালনা করার কথা ছিল দুই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের চট্টগ্রামে এসে ঘোষণা দিয়েছিলেন যাত্রীদের চাহিদা ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে আগামী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে ৬৫০টি ট্যাক্সিক্যাব নামানো হবে। তবে এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ এক হাজার ট্যাক্সি নামানোর।

নতুন আরও ট্যাক্সি নামানো প্রসঙ্গে তমা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক জনকণ্ঠ’কে বলেন, অব্যাহত লোকসানের মুখে নতুন ট্যাক্সিক্যাবগুলো বন্ধ হওয়ার পথে। চুক্তি থাকলেও নতুন করে ট্যাক্সিক্যাব নামানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে ট্যাক্সি নামানোর প্রক্রিয়া বন্ধ। এর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোন দেশে এয়ারপোর্টে ট্যাক্সি ঢুকতে দেয়া হয় না এমন নজির নেই। গণপরিবহন বলতে ট্যাক্সির গুরুত্ব অপরিসীম। নিম্ন ও মধ্য আয়ের লোকজন প্রাইভেটকার হিসেবে এই বাহনটি ব্যবহার করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে এর ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে। আমরা নতুন ট্যাক্সি নামানোর পর থেকেই এয়ারপোর্টে ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া বেশি দামে বিলালবহুল গাড়ি কেনায় কম ভাড়ায় তা চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। সঙ্গত কারণেই বিমানবন্দরের বাইরে ভাড়া কম পাওয়া যায়। ভাড়ার রেট বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষ নতুন ট্যাক্সিতে উঠতে চান না। তিনি জানান, বিমানবন্দরে ট্যাক্সি প্রবেশে সুযোগ দেয়া, নগরীর কয়েকটি স্থানে ট্যাক্সিস্ট্যান্ড করে দেয়ার জন্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে মন্ত্রী পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক চিঠি দেয়া হয়েছে। এসব চিঠি সিটি কর্পোরেশনের কাছে ফরোয়ার্ড করে দিয়ে দায় সাড়া হয়েছে। সঙ্কটের সমাধান হয়নি এখনও।

২০০২ সালে প্রথমে ৮ বছর এবং পরবর্তীতে ২ বছর বাড়িয়ে দশ বছর মেয়াদী কালো এবং হলুদ ট্যাক্সিক্যাব মিলিয়ে রাজধানীতে দশ হাজার এবং রাজধানীর বাইরে ২ হাজার ট্যাক্সিক্যাবের রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়। উভয় ধরনের ট্যাক্সিক্যাবের মেয়াদ গত ২০১২ সালের ডিসেম্বরে শেষ হয়। চালকদের প্রবল আন্দোলনের মুখে পুরনো ট্যাক্সি তুলে দেয় সরকার। নতুন ট্যাক্সি নামানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এই প্রেক্ষাপটে রাজধানী এবং বন্দর নগরী চট্টগ্রামে নতুন এক হাজার ট্যাক্সিক্যাব নামানোর সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে অর্ধেক নামানো হবে সেনাবাহিনীর সহায়তায় এবং বাকি অর্ধেক ‘তমা’ নামের একটি পরিবহন কোম্পানিকে দায়িত্ব দেয়া হয়।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে অটোরিক্সা নামানোর প্রক্রিয়া ॥ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে আছে রাজধানীতে পাঁচ হাজার অটোরিক্সা নামানোর প্রক্রিয়া। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে নতুন ৯ হাজার সিএনজি অটোরিকশা নামানোর কথা ছিল। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ৫ হাজার এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪ হাজার। অপরদিকে, হাইকোর্টে দায়ের করা রিট পিটিশন প্রত্যাহার হওয়ায় ২৬শ’ মিশুক চালককে সিএনজি প্রতিস্থাপনের লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সে প্রক্রিয়ায় থমকে আছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, হাইকোর্টের দায়েরকৃত রিট পিটিশন প্রত্যাহার হওয়ায় ঢাকায় সিএনজি প্রতিস্থাপনে আর কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তাই নতুন করে ঢাকা মহানগরীতে ৫ হাজার এবং চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৪ হাজার অতিরিক্ত ফোর স্ট্রোক থ্রি হুইলার সিএনজি সংযুক্ত করা হবে।

বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০০৭ সালের ৬ নভেম্বর চালকদের গণপরিবহন হিসেবে পাঁচ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সে সময় যাচাই-বাছাই করে লাইসেন্স আছে এমন ৩ হাজার ১৯৬ জনকে অটোরিকশার নিবন্ধন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কিন্তু গণপরিবহন হিসেবে নিবন্ধন নেয়া সিএনজি অটোরিকশা ব্যবসায়ী মালিক সমিতি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন। বিআরটিএ ওই মামলা পরিচালনা না করায় বাধ্য হয়ে ঢাকা অটোরিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন সরকারের পক্ষ হয়ে মামলা পরিচালনা করে। ২০১০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট মামলাটি খারিজ করে দেয়। এই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করে সিএনজি অটোরিক্সা ব্যবসায়ী মালিক সমিতি। আপীল নিষ্পত্তি হলেও সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আইনী জটিলতা শেষে অটোরিক্সা নামানোর জন্য আবেদন আহ্বান করে বিআরটিএ। এতে তিন হাজার ১৯৩টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। এক হাজার ৮০০’র বেশি আবেদন জমা না পড়ায় প্রাথমিকভাবে বিষয়টি ঝুলে যায়। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ফের সিএনজি নামানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে। কিন্তু ‘অটোরিক্সাচালক সমবায় ফেডারেশন লিমিটেড’-এর কাছে ১৯৯১-৯৪ সালের মেয়াদে ৩২ কোটি টাকা ব্যাংক লোন নেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি টাকা না দেয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি স্থগিত করে অর্থ মন্ত্রণালয়। সঙ্কট সমাধানে অটোরিক্সা মালিক শ্রমিকদের পক্ষ থেকে লোন খেলাপীদের বাদ দিয়ে বাকি অটোরিক্সা রেজিস্ট্রেশনের জন্য সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন পাঠানো হয়। সেখান থেকে পাঠানো হয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সর্বশেষ অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি ঝুলে থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি থমকে আছে।

জানতে চাইলে ঢাকা জেলা অটোরিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন জনকণ্ঠ’কে বলেন, নতুন করে অটোরিক্সা নামানো হলে রাজধানীতে পরিবহন সঙ্কট কমে আসত। মালিকরা ইচ্ছেমতো চালকদের কাছ থেকে জমা আদায় করতে পারত না। যাত্রীরাই মিটার ব্যবহার করে বিভিন্ন গন্তব্যে চলার সুযোগ পেতেন। অর্থাৎ কম পরিবহনের কারণে একচেটিয়া প্রতিযোগিতা কমে যেত বলে মনে করেন তিনি।

ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিক্সা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সভাপতি বরকতউল্ল্যাহ বুলু জনকণ্ঠ’কে বলেন, ২০০৮ সালে চালকদের অটোরিক্সা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং অটোরিক্সা মালিক সমিতির মামলার কারণে তা পিছিয়ে যায়। পরবর্তীতে ২৬৯৬টি মিশুকের পরিবর্তে অটোরিক্সা দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। ইতোমধ্যে ৪০০ নতুন অটোরিক্সা রাস্তায় নেমেছে। এ নিয়েও নানা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সব একসঙ্গে নামতে পারছে না। তিনি বলেন, বর্তমানে রাজধানীতে চলা অটোরিক্সার মেয়াদ শেষ হওয়ায় মালিক শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে সব গাড়ি পর্যায়ক্রমে বুয়েটে পরীক্ষার মধ্য দিয়ে আরও চার বছরের লাইফ টাইম বাড়াচ্ছে সরকার। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিক্সা ব্যবসায়ী মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফরিদুল আলম খসরু জনকণ্ঠকে বলেন, চালকদের অটোরিক্সা দেয়ার বিষয়টি সরকারের সদিচ্ছার অভাবে আটকে আছে। মন্ত্রণালয় বিআরটিএকে নির্দেশ দিলেই নতুন অটোরিক্সা রাস্তায় নামতে পারে বলে জানান তিনি।

সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীতে ৩ হাজার মিশুক, ১২ হাজার ট্যাক্সিক্যাব এবং ১৩ হাজার সিএনজি অটোরিক্সার রেজিস্ট্রেশন দেয়া হয়েছিল। ২০০২ সালে রাজধানীতে পরিবেশ দূষণের দায়ে টু স্ট্রোক থ্রিহুইলার বেবিট্যাক্সি উঠিয়ে দিয়ে ৯ বছর মেয়াদী ১২ হাজার ৭শ’ ১৫টি পরিবেশবান্ধব থ্রিহুইলার সিএনজি অটোরিক্সার রোড পারমিট দেয়া হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক আমলের সময় চালকদের প্রবল আন্দোলনের মুখে সরকার ২ বছর বাড়িয়ে ১১ বছর করেছিল। যা গত বছরের ডিসেম্বরে শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে রাস্তায় একের পর এক সিএনজি অটোরিক্সা আটক করতে থাকে রাজধানীর ট্রাফিক পুলিশ। শুরু হয় আন্দোলন। একপর্যায়ে পরিবেশের ক্ষতির বিষয়টি নিরূপণের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটকে।