২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মুজাহিদ-সাকার রিভিউ দাখিল

স্টাফ রিপোর্টার ॥ একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে সুপ্রীমকোর্টের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন দাখিল করেছেন দুই কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী। রিভিউ আবেদন করার জন্য নির্ধারিত ১৫ দিন শেষ হওয়ার একদিন আগে বুধবার এই দুই যুদ্ধাপরাধীর পক্ষে তাদের আইনজীবীরা রিভিউ আবেদন করেন।

সকালে মুজাহিদের পক্ষে তার আইনজীবী শিশির মনির সুপ্রীমকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় রিভিউ আবেদন জমা দেন। ৩৮ পৃষ্ঠার মূল রিভিউ আবেদনে রায় পুনর্বিবেচনার পক্ষে ৩২ যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি। এরপর দুপুরে সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনটি জমা দেন তার আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান আলফেসানী। তিনি জানান, ১০৮ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে মূল দশটি যুক্তি তুলে ধরে ফাঁসির রায় পর্যালোচনা করে খালাস দেয়ার আর্জি জানানো হয়েছে।

এদিকে এ দুই যুদ্ধাপরাধীর রিভিউ আবেদন দাখিলের পর এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আশা প্রকাশ করেছেন, এই দুইজনের রিভিউ আবেদনের শুনানিতে ফাঁসির আদেশ বহাল থাকবে। ফৌজদারি মামলায় রিভিউ আবেদন গ্রহণের সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ উল্লেখ করে মাহবুবে আলম বলেন, আশা করি, রিভিউয়েও এ দু’জনের ফাঁসির দ- বহাল থাকবে।

অন্যদিকে দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর প্রধান আইনজীবী বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেন মনে করেন, রিভিউ শুনানিতে যদি সাক্ষ্য-প্রমাণের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে মুজাহিদের মৃত্যুদ- হয়ত টিকবে না। সাকা চৌধুরীর বিষয়ে খন্দকার মাহবুব বলেন, তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় দেশে ছিলেন না। ওই সময় তিনি পাকিস্তানের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া-লেখা করতেন। রিভিউ আবেদনে এটাই যুক্তি সহকারে তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে তিনিও খালাস পাবেন বলে আশা করছি।

বুধবার মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর রিভিউ আবেদনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পৃথকভাবে এসব মন্তব্য করেন তারা। এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে এবং সুপ্রীমকোর্টের শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনের সংবাদ সম্মেলনে খন্দকার মাহবুব সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম অন্য যুদ্ধাপরাধ মামলাগুলোর মতোই এই রিভিউ আবেদন দুটির শুনানিতেও রাষ্ট্রপক্ষে নেতৃত্ব দেবেন। অন্যদিকে দু’জনেরই প্রধান আইনজীবী হিসেবে আসামিপক্ষে নেতৃত্ব দেবেন খন্দকার মাহবুব হোসেন।

নিয়মানুযায়ী, রিভিউ নিষ্পত্তির আগে তাদের দ- কার্যকর করা যাবে না। আর রিভিউ খারিজ হয়ে গেলে সেই রায়ের অনুলিপি কারাগারে যাবে এবং কারা কর্তৃপক্ষ সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আসামিদের ফাঁসি কার্যকর করবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ইতোমধ্যে বলেছেন, আইন অনুযায়ী যেভাবে অগ্রসর হওয়ার কথা, তারা সেভাবেই অগ্রসর হবেন।

সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ গত ৩০ সেপ্টেম্বর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাকা চৌধুরীর যুদ্ধাপরাধ মামলার চূড়ান্ত রায় প্রকাশ করলে পরদিন ১ অক্টোবর দুই আসামির বিরুদ্ধে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ওই দিনই কারা কর্তৃপক্ষ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মুজাহিদ এবং গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে সাকা চৌধুরীকে মৃত্যু পরোয়ানা পড়ে শোনায়, এর পর শুরু হয় রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদনের দিন গণনা।

মুজাহিদ ॥ কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রেখে গত ১৬ জুন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ রায় দেন। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপীল বেঞ্চ এ রায় দেন। সর্বসম্মতিক্রমে আপীল বিভাগ এ রায় দেন। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে সুপ্রীমকোর্ট।

প্রসিকিউশনের আনা সাতটি অভিযোগের মধ্যে প্রথম অভিযোগে সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে অপহরণের পর হত্যা এবং ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবীসহ গণহত্যার ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ওই দ- কার্যকর করার আদেশ দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই রায় এসেছিল সপ্তম অভিযোগে, ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর হামলা চালিয়ে হত্যা-নির্যাতনের ঘটনায়। আপীল বিভাগের রায়ে আপীল আংশিক মঞ্জুর করে প্রথম অভিযোগে আসামিকে খালাস দেয়া হয়েছে। সপ্তম অভিযোগে তার সাজা কমিয়ে দেয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদ-। আর ষষ্ঠ অভিযোগে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ট্রাইব্যুনালের রায় বহাল রেখে মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদ, গেরিলা যোদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল ওরফে বিচ্ছু জালাল, শহীদজননী জাহানারা ইমামের ছেলে শাফি ইমাম রুমি, বদিউজ্জামান, আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল ও মাগফার আহমেদ চৌধুরী আজাদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটকে রেখে নির্যাতন এবং জালাল ছাড়া বাকিদের হত্যার ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার জন্য ট্রাইব্যুনালে মুজাহিদকে দেয়া হয়েছিল যাবজ্জীবন কারাদ-। আপীল বিভাগের রায়ে সেই সাজাই বহাল রাখা হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তৃতীয় অভিযোগে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুরের রণজিৎ নাথকে অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় পাঁচ বছরের কারাদ- দেয়া হয় মুজাহিদকে। ওই সাজা তার প্রাপ্য বলে আপীল বিভাগও মনে করেছে।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সাংবাদিক, শিক্ষকসহ বুদ্ধিজীবী হত্যা এবং সাম্প্রদায়িক হত্যা-নির্যাতনের দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুজাহিদকে মৃত্যুদ- দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এক বছর পর আপীলে সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সাব্যস্ত হয় সুপ্রীমকোর্টে। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধের বহু প্রতীক্ষিত বিচার শুরুর পর ট্রাইব্যুনালে দ-িতদের মধ্যে মুজাহিদ হলেন চতুর্থ ব্যক্তি, আপীল বিভাগে যার মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে।

সাকা চৌধুরী ॥ মানবতাবিরোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক হত্যা ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ-াদেশ পাওয়া বিএনপির শীর্ষ নেতা সালাউদ্দিন কাদের বাহিনীর (নিজস্ব বাহিনী) প্রধান স্বঘোষিত ব্রিগেডিয়ার সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদ- বহাল রেখেছেন সুপ্রীমকোর্টের আপীল বিভাগ। চলতি বছরের ২৯ জুলাই প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এসকে) সিনহার নেতৃত্বে চার সদস্যের আপীল বিভাগের বেঞ্চ ঐতিহাসিক এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। পরে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করে সুপ্রীমকোর্ট। ৭ নম্বর অভিযোগ থেকে আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে খালাস দেয়া হয়। ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৮, ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে সাজা বহাল রাখা হয়েছে সুপ্রীমকোর্টের রায়ে।

২০১৩ সালের ১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের আনা ২৩ অভিযোগের মধ্যে নয়টি প্রমাণিত হয়। ৩, ৫, ৬ ও ৮ নম্বর অভিযোগে সাকাকে মৃত্যুদ-াদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। আপীল বিভাগ তা বহাল রাখেন। ৭ নম্বর অভিযোগে সাকা চৌধুরীকে ২০ বছর কারাদ- দেন ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগ থেকে আসামিকে খালাস দিয়েছেন আপীল বিভাগ। ২ ও ৪নং অভিযোগে সাকাকে ট্রাইব্যুনাল ২০ বছরের কারাদ- প্রদান করেন। সেটা আপীল বিভাগও বহাল রেখেছেন। অন্যদিকে ১৭ ও ১৮ নম্বর অভিযোগে সাকাকে ৫ বছর করে কারাদ- প্রদান করা হয়। এই দ- বহাল থাকে আপীল বিভাগেও।