২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিএনপি দলীয়ভাবেই নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে

  • পৌর ও ইউপি নির্বাচন

শরীফুল ইসলাম ॥ পৌর ও ইউপি নির্বাচনকে সামনে রেখে আগেভাগেই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিএনপি। দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশে নিজ নিজ এলাকায় প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম তদারকি করতে সারাদেশের ৭৫ সাংগঠনিক জেলার নেতারা তৎপর হয়েছেন। এ নির্বাচনে বেশিরভাগ এলাকায় বিজয়ী হয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দলের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায় বিএনপি।

সূত্রমতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে যে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তা এখন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন। আর এ জন্যই পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ে ২০ দলীয় জোটকে শক্তিশালী করার কৌশল নিয়েছে দলটি। এরই অংশ হিসেবে আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভাল প্রার্থী বাছাই করার কাজ আগেই শুরু করেছে বিএনপি। সারাদেশে বর্তমানে তৃণমূল পর্যায়ে দলের কমিটি পুনর্গঠনকালেই নিজ নিজ এলাকায় পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে কাদের প্রার্থী করা হবে সে বিষয়টিও জেলা নেতারা মাথায় রাখছেন। এ জন্যই কমিটি পুনর্গঠনকালে প্রতিটি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলাকায় গণসংযোগ জোরদার করতে বলা হচ্ছে।

এদিকে যেসব এলাকায় বিএনপির ভাল প্রার্থী খুঁজে পাওয়া না যাবে সেখানে ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলো থেকে প্রার্থী করা হবে। ইতোমধ্যেই সরকার আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে জামায়াত যেহেতু দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবে না, তাই বিএনপি কোন এলাকায় জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীকে সমর্থন দিলে ওই প্রার্থী বিএনপির প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ পাবে। এ জন্য ইতোমধ্যেই তৃণমূল পর্যায়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। জোটের স্থানীয় নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে যে এলাকায় বিএনপি ছাড়া ২০ দলীয় জোটের অন্য শরিক দলের প্রার্থীর জনপ্রিয়তা বেশি তাদের মনোনয়ন দিতে বলা হয়েছে। তবে নির্বাচন পরিচালনায় নেতৃত্বে থাকবে বিএনপি।

জানা যায়, এ বছর ডিসেম্বর মাসে সারাদেশের ৩২৪টি পৌরসভার মধ্যে ২৪৫টি পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর আগামী বছর মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ৪ হাজার ৫৫৫টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন। তাই স্থানীয় সরকারের এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি জোরদার করছে। কেন্দ্র থেকেও এ নির্বাচনের ব্যাপারে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের তৎপর রাখার কৌশল নেয়া হয়েছে।

আগস্ট মাসে খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে তার গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এবার পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করতে নির্দেশ দেন খালেদা জিয়া। এরপর খালেদা জিয়ার এ নির্দেশনা সারাদেশের ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা নেতাদের কাছেও পৌঁছে দেয়া হয়। এ নির্দেশনার প্রেক্ষিতে সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির বিভিন্ন ইউনিট কমিটি পুনর্গঠনকালেই পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়া চলছে। তবে এ নিয়ে কোন এলাকায় জটিলতা সৃষ্টি হলে কেন্দ্রের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।

জানা যায়, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারাও এখন নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। এ ব্যাপারে বিএনপির নির্বাহী কমিটির এক সদস্য জনকণ্ঠকে বলেন, ইতোমধ্যেই নিজ নিজ এলাকার পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী ঠিক করতে কেন্দ্র থেকে জেলা নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সে মোতাবেক কাজ চলছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও বিএনপি সে নির্বাচনে অংশ নেবে।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সারাদেশের ৪৮৭টি উপজেলার নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। উপজেলা নির্বাচনে কিছু কিছু এলাকায় দলের ভাল প্রার্থী না থাকায় ২০ দলীয় জোটের শরিক দল থেকে প্রার্থী করা হয়। দল নাজুক অবস্থায় থাকার পরও ওই নির্বাচনে অনেক উপজেলায় বিজয়ী হয় বিএনপি দলীয় প্রার্থীরা। আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একেবারে তৃণমূল পর্যায়ের হওয়ায় এবার আরও ভাল ফল আশা করছেন দলের নেতাকর্মীরা।

আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে যাতে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হতে না পারেন সে বিষয়টি জেলা নেতাদের মাধ্যমে আগেই তৃণমূল নেতাদের সতর্ক করা হয়েছে বলে জানা গেছে। গতবছরের উপজেলা নির্বাচনে যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে প্রার্থী হয়েছিলেন তাদের মধ্যে বেশ ক’জনের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়। অবশ্য পরে আবার কারও কারও বিরুদ্ধে দেয়া শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হয়।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে রাজনৈতিকভাবে চরম বেকায়দায় পড়ে বিএনপি। এ বছরের শুরুতে সারাদেশে টানা ৯২ দিনব্যাপী অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে আরও বেশি বেকায়দায় পড়ে দলটি। আপাতত সরকারবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা করার কোন সম্ভাবনা না থাকায় এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের কোন সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায় সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। এ পরিস্থিতিতে সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের হতাশা কাটিয়ে তাদের আবার দলীয় কর্মকা-ে সক্রিয় করে তুলতেই পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি জোরদার করার কৌশল নিয়েছে বিএনপি।

এর আগে ২০১৩ সালে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণে পাঁচ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশ নিয়ে সবটিতে বিজয়ী হয় বিএনপি। তবে একটি বড় আন্দোলনে ব্যর্থ হওয়ার পর দলের অনেক নেতাকর্মী মামলায় জড়িয়ে যাওয়ায় এ বছর ২৮ এপ্রিল ঢাকার ২টি ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে পরাজিত হয় বিএনপি। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই এবার পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি জোরদার করছে বিএনপি।

সূত্রমতে, দলীয় প্রতীকে সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচন করার ব্যাপারে সরকারী সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র নেতারা উপরে উপরে বিরোধিতা করে বক্তব্য-বিবৃতি দিলেও ভেতরে ভেতরে দলীয়ভাবেই নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, মামলাসহ বিভিন্ন কারণে বিএনপি নেতারা এখন চরম দুরবস্থায় থাকায় আসন্ন পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রচার চালানো কিছুটা কষ্টসাধ্য হবে। তাই প্রার্থীরা দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিলে প্রচার কিছুটা কম হলেও বিএনপির নেতা, কর্মী ও সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নীরবে দলীয় প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবেন। আর কোন প্রার্থীর সঙ্গে দেখা না হলেও ভোটাররা প্রতীক দেখেই দলীয় প্রার্থী চিহ্নিত করতে পারবেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জেনারেল (অব) মাহবুবুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে আমরা অবশ্যই প্রতিটি এলাকা থেকে দলীয় প্রার্থী ঠিক করে দেব। যাদের মনোনয়ন দিলে দলের জন্য ভাল ফল বয়ে আনতে পারবে তাদেরই প্রার্থী করা হবে। এ ব্যাপারে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়া হবে।

মেহেরপুর জেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ আমজাদ হোসেন জনকণ্ঠকে জানান, আমরা ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শেষ করেছি। সেই সঙ্গে ইউনিয়ন ও পৌরসভা নির্বাচনে কারা প্রার্থী হবেন তাও চিন্তাভাবনা করে রেখেছি। নির্বাচনের সময় হলে দলীয় হাইকমান্ডের নির্দেশনা মেনে আমরা প্রার্থী চূড়ান্ত করব।

বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি মোঃ মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ বলেন, আমরা এখন ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিটি পুনর্গঠন কাজ করছি। এরপর অন্যান্য কমিটি পুনর্গঠন শেষে জেলা কমিটি করা হবে। আর কমিটি পুনর্গঠনের পাশাপাশি পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতিও রয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ব্যাপারেও আমরা খোঁজখবর রাখছি। দলের কেন্দ্র থেকে নির্বাচনের ব্যাপারে পরবর্তীতে যে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে আমরা সেভাবেই কাজ করব।