২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বিভাজনের গভীর খাদে তুরস্ক

  • রক্তক্ষয়ী আঙ্কারা হামলায়ও জাতীয় ঐক্য গড়ে ওঠেনি

তুরস্কের আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পোপ, প্রেসিডেন্ট ওবামা, রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ ও অন্যরা শোকাচ্ছন্ন দেশটির উদ্দেশে সান্ত¡নার বার্তা পাঠান। দেশের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান সচরাচল জনসমক্ষে এলে এবার কেবল এক সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন এবং কোন ভাষণ দেননি। এর মাত্র কয়েকদিন আগে তুরস্কের আনন্দ উল্লাস প্রকাশের এক ঘটনা ঘটে। তুর্কি আমেরিকান বিজ্ঞানী আজিজ সানকার রসায়নশাস্ত্রে নোবেল পুরস্কার পান।

বিজয় উৎসবের বদলে তিনি আসলেই তুর্কি কিনা তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এক বিতর্ক দেখা দেয়। কারণ তিনি কুর্দি দল থেকে নির্বাচিত এক পার্লামেন্ট সদস্যের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয় এবং তিনি কুর্দি অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে ড. সানকার বলেন, আমি কুর্দি ভাষায় কথা বলি না। আমি তুর্কি। এটিই সত্য। এখন কোন কিছুই তুর্কিদের এক করতে পারছে বলে মনে হয় না, এমনকি তারা সবাই এক মুহূর্তের জন্যও একযোগে শোক বা আনন্দ বোধ করতে পারছে না। আর সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়ায় এ গভীর অনুভূতিই প্রতিফলিত হচ্ছে যে, দেশটিতে বিপজ্জনক মাত্রায় মেরুকরণ ঘটেছে। লন্ডন প্রবাসী তুর্কি শিক্ষাবিদ জিয়া মেরাল বলেন, তুরস্কের ইতিহাসে এটি দেশের ওপর পরিচালিত সবচেয়ে মারাত্মক সন্ত্রাসী হামলা এবং আমরা যে এ মুহূর্ত একটি দেশ হিসেবে এক হয়ে আমাদের নাগরিকদের মৃত্যুতে শোক ব্যক্ত করতে পারিনি, তা গভীরভাবেই দুঃখজনক। শনিবার রাজধানী আঙ্কারার ট্রেন স্টেশনের বাইরে দুটি আত্মঘাতী হামলায় প্রায় ১০০ ব্যক্তি নিহত হয়। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজনৈতিক নেতারা শোকাহত লোকজনকে সান্ত¡না জানানোর চেয়ে বরং পরস্পরের সঙ্গে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়। আর বিক্ষুব্ধ নাগরিকরা সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। কুর্দি ও বামপন্থী দলগুলোর আয়োজিত এক শান্তি সমাবেশে ঐ হামলার পর কুর্দি রাজনৈতিক নেতা সেলাহাত্তিন দেমিরতাস ঐ সহিংসতার জন্য সরাসরি সরকারকে দায়ী করেন। পরে সরকারকে অপছন্দের চোখে দেখে থাকেন এবং ব্যক্তিরাও দেমিরতাসের মন্তব্যের সমালোচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলু জাতির উদ্দেশে টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান, কিন্তু তিনি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের কড়া সমালোচনা করেন এবং ঐ ঘটনায় সামান্য সহানুভূতি দেখানোর দায়ে তারও সমালোচনা করা হয়।

এরূপ কোন দুঃখজনক ঘটনার মুখেও তুরস্কে ঐক্যের অভাব থাকার জন্য বিশ্লেষকরা এরদোগান ও তার ইসলামপন্থী জাস্টিস এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির (একেপি) ক্রমবর্ধমান বিভাজনমূলক নেতৃত্বকে দায়ী করেন। দলটি ১৩ বছর ধরে দেশ শাসন করছে। তুরস্ক কয়েকটি ইস্যুতেই দীর্ঘদিন ধরে বিভক্ত হয়ে রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ ও ধর্মীয়, ধনী ও দরিদ্র, তুর্কি ও কুর্দি। এক সময়ে মনে হয়েছিল, এরদোগান ঐসব উত্তেজনা প্রশমিত করতে সমর্থ হবেন। তিনি কুর্দিদের সঙ্গে শান্তি স্থাপন উদ্যোগী হন, ইতোপূর্বে নির্যাতিত ধার্মিক মানুষকে ক্ষমতাদান করেন এবং কিছু সময়ের জন্য দেশে এক শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে নেতৃত্ব দেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঐসব কিছুই পাল্টে গেছে, কারণ এরদোগান তার সাবেক সমর্থকদের অনেককেই দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তার সরকার সাংবাদিকদের কারারুদ্ধ করেছে, রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির দায়ে তদন্তের সূচনা করেছে এবং শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদীদের দমন করেছে। বিশিষ্ট তুর্কি ঔপন্যাসিক এলিপ শাফাক বলেন, সরকারপন্থী ও সরকারবিরোধী পক্ষের মধ্যে এখন বিভেদ এতই গভীর যে, সেই বিভেদ এমনকি আনন্দ ও শোকের সময়ও আর দূর করা যাবে না। Ñইন্টারন্যাশনাল নিউইয়র্ক টাইমস