১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এবারের বিষয় ॥ ফ্ল্যাটবাড়ি কালচার

  • মো. হাবিব উল্লাহ

এ রাজধানীতে একদিন একটি চারতলা ভবন খুঁজে বের করা কঠিন ছিল। আজ কি আর তা আছে? বেশিদিনের কথাও তো নয়। ১৯৫৮ সাল থেকে ঢাকায় বসবাস। তখন বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরী ছাড়া তোপখানা রোডে ইউএসআইএস লাইব্রেরীতে পড়তে যেতাম। একটি একতলা ভবনে এই লাইব্রেরী ছিল। ভবনটি ছিল তখন ঢাকার অন্যতম ‘কুলীন’ ভবন। পূর্বদিকে অগ্রসর হলে ডিআইটি ভবন, একটু দূর থেকে দৃশ্যমান ছিল। আর এটাই ছিল ঢাকার সবচেয়ে উচ্চ ভবন। ব্যতিক্রম ছিল আহসান মঞ্জিল, কার্জন হল- এসব অট্টালিকা। নাজ, গুলিস্তান ছাড়া ঢাকার তখন কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সিনেমা হল ছিল না। আমরা রমনা পার্ক আর বলধা গার্ডেনে বেড়াতে যেতাম। নানা বাহারী ফুলের সমারোহ দেখতাম। বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভ্রমণে আমাদের প্রাণ জুড়াত।

২০১৫ সালের শেষের দিকে এসে আমরা ঢাকা মহানগরীতে কি দেখছি? এখন রাজধানীতে অনেক ‘হাইরাইজ’ বিল্ডিং হয়েছে, হয়েছে অনেক ফ্ল্যাটবাড়ি। আকাশছোঁয়া এ ভবনগুলোর কালচার ভিন্নতর। পল্লী গানের সম্রাট আব্বাস উদ্দিন এখন আর মাগরিবের নামাজ পড়ে হারমোনিয়াম নিয়ে নিজের মেয়েকে গান শেখাতে বসেন না তার পুরানা পল্টনের বাড়িতে। সুউচ্চ অট্টালিকার ফ্ল্যাটবাড়িতে এখন ভিন্নতর কালচার স্থান করে নিয়েছে।

পল্লীকবি জসীম উদ্দীন এখন আর গ্রামীণ পরিবেশে তাঁর কমলাপুরের বাড়িতে কবিতা আর পল্লী গানের আসরে বসেন না। পল্লীগীতির গায়ক গোলাম মোস্তফা আর তাঁর সঙ্গীরা পল্লীকবির গানের চর্চা করেন না। এখন ফ্ল্যাটবাড়িতে যারা বসবাস করেন তারা একে অন্যকে ভালভাবে চেনেন না, একে অন্যকে জানেন না।

বড় ভাল লেগেছে যখন একটি ছেলে একটি মেয়েকে বলেছে ‘আকাশ পছন্দ করেন না?’ উত্তরে মেয়েটি বলেছে অবশ্যই সে আকাশ পছন্দ করে। এ ধরনের ছিটেফোঁটা দু’একটা উদাহরণ ছাড়া উদাহরণ খুঁজে পাওয়া মুসকিল।

আর একটি ভবনে অনেক ফ্ল্যাট। এসব ফ্ল্যাটের বাসিন্দা একে অপরকে ভালভাবে চেনেন না। চেনার চেষ্টাও করেন না। গড়ে ওঠেনি অন্যের সঙ্গে তেমন সৌহার্দ আর সম্প্রীতি। মানুষ এখন যন্ত্রের মতো চলাফেরা করছে। এটাই তো আজ নগরবাসীর নিয়তি।

সদালাপ মানুষের মনে আনন্দধারা প্রবাহিত করে, কিন্তু আজকের নগরজীবনে তার একান্ত অভাব। তাই তো মানুষ আজ মানসিক ব্যাধিতে ভুগছে, প্রাণ খুলে কথা বলতে পারছে না, হাসতে পারছে না।

এমন দিন কি আর আসবে যখন মানুষ আগের মতো নির্মল পরিবেশে বসবাস করে প্রাণ খুলে কথা বলতে পারবে, হাসতে পারবে?

মঙ্গলগ্রহে পানির সন্ধান পাওয়া গেছে। একদিন হয়ত মানুষ মঙ্গল গ্রহে গিয়েও বসবাস করবে। চাঁদেও মানুষের পদচারণা হয়েছে। মানুষ সেসব স্থানে বসবাস করতে পারলে এখানকার ফ্ল্যাটবাড়ির চেয়েও ভিন্নতর জীবনযাপন করবে। আমরা চাই মানুষ একে অন্যের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করুক। মানুষে মানুষে সদ্ভাব বজায় থাকুক। ধরণীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক। আমরা চাই মানুষ যেখানেই বসবাস করুক সেখানে শান্তিতে বসবাস করুক।

কলাবাগান, ঢাকা থেকে