২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ভাতের অভাব নেই, অভাব সুষম খাদ্যের

  • ড. আর এম দেবনাথ

মাটির চুলায় মিষ্টি আলু পুড়িয়ে খাওয়ার মধ্যে একটা আলাদা স্বাদ আছে। এটা ছোটবেলায় আমি খুব পছন্দ করতাম। কিন্তু খাওয়ার কোন উপায় ছিল না। এটা নাকি গরিবরা খায়, এই ছিল গ্রামীণ সচ্ছল পরিবারের বিশ্বাস! শুধু পোড়া বা সেদ্ধ মিষ্টি আলু নয়, অনেক খাবারের উপরই ছিল এমন ‘টাবু’। যেমন কাঁঠাল বিচি ও সিম বিচি ভেজে খাওয়া। এটাও ছিল গরিবদের খাবার। আরও মজার ব্যাপার পুঁটি মাছ, ছোট ছোট টেঙরা (বজরি) মাছ, কাচকি মাছ, মৌরলা মাছ ইত্যাদিও সচ্ছল পরিবারের লোকেরা আমাদের অঞ্চলে খেতে চাইত না। শত হোক গরিবের খাবার মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল পরিবার খায় কী করে? আজকের দিনে? আজকের দিনে এসবই ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার খাবার। বরং অনেক জিনিস পাওয়া যায় না। মিষ্টি আলু, সিম বিচি ইত্যাদি কী অবাধে সব বাজারে পাওয়া যায়? আবার এখন বরং ছোট মাছের কদর বেশি, দামও বেশি। যা ছিল গরিবের খাবার, তা এখন ধনীদের খাবার। যেমন ইলিশ মাছ, এই মাছটি ছিল সস্তা, সবাই খেতে পারত। কিন্তু ইলিশ এখন সোনার দামে বিক্রি হয়। বাদ দিলাম ইলিশ, অনেক জিনিসের দাম এখন যুক্তিযুক্ত পর্যায়ে আছে। আগের মতো বিশ্বাসের কোন ‘টাবু’ও নেই। ধনী-দরিদ্র ভেদে বিশ্বাসেরও কোন হেরফের নেই। তবু দেখা যায় মানুষ খেতে চায় না। যেমন গোল আলু। এক সময় পাওয়া যেত লাল গোল আলু। খুবই ছোট ছোট। খেতে ভীষণ স্বাদ। আস্তে আস্তে হয় বড় গোল আলু। কোল্ড স্টোরেজে রাখার ব্যবস্থাও হয়। কিন্তু মানুষ তা খেতে চায় না। সদ্য স্বাধীন দেশ ১৯৭২ বা ১৯৭৩ সাল। গ্রাম থেকে ঢাকায় লোক আসছে। বড় বড় গোল আলু কেউ খেতে চায় না। এর জন্য ‘স্বাধীনতা চেয়েছি’? গমও খেতে চায় না মানুষ। ভীষণ অভিযোগ স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। অবাঙালী খেদিয়ে দেশ স্বাধীন, আর এখন খেতে হবে লাল ‘বিরুইর’ পরিবর্তে আটার রুটি। বলে কীনা খেতে হবে মোটা মোটা গোল আলু, তাও হিমাগারের? এই যে দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাধীনতার আজ ৪৩-৪৪ বছর, তার কী কোন পরিবর্তন হয়েছে? হয়ত কিছুটা হয়েছেÑ গরজ বড় বালাই। কিন্তু যতটুকু দরকার ততটুকু হয়নি। স্বাস্থ্যের জন্য দরকার, পুষ্টির জন্য দরকার, সমন্বিত খাদ্যের জন্য দরকার এমনকি খরচের দৃষ্টিতে দেখলেও দরকার তবু বাঙালী তার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনে বড় ধীরগতি। অন্তত তথ্য-উপাত্ত দেখলে এটাই মনে হয়। একটা উদাহরণ দিই।

গোল আলুর কথাই ধরা যাক। দেশে প্রচুর গোল আলু উৎপাদিত হয়। সর্বশেষ উৎপাদনের পরিমাণ দেখা যাচ্ছে ৮৫ লাখ টন। আমাদের বার্ষিক চাহিদা কত? মাত্র ৭০-৭২ লাখ টন। কৃষক দাম পায় না। প্রতিবছর কত গোল আলু যে কৃষকের খেতে, গোলায় নষ্ট হয় তার কোন হিসাব নেই। অনেক সময় কৃষক বাজারে নিয়ে বিক্রি না হওয়ায় তা রাস্তায় ফেলে দিয়ে আসে। অর্থাৎ প্রচুর উৎপাদন, সরবরাহের কোন অভাব নেই, দোকানে-দোকানে, রাস্তা-ঘাটে, ভ্যানগাড়িতে, মুদির দোকানে সর্বত্র গোল আলু উপস্থিত। আশ্চর্য শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়, সুষম সমন্বিত খাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয়, আবার দামে সস্তার সস্তা, তবু বাঙালী তাকে আদর করে ধরে না। বিরিয়ানীতে আলু থাকলে তা আলাদা করে খাওয়াতেই দেখা যায় আমরা অধিক আগ্রহী। এমন না হলে কী মানুষ এত কম আলু খায়। ‘বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস)’-এর মতে, সুষম খাদ্যের জন্য একজনের প্রতিদিনের ১০০ গ্রাম গোল আলু খাওয়ার কথা। তাদের হিসাব মতে, বাংলাদেশে মাথাপিছু দৈনিক গোল আলু গ্রহণের মাত্রা ৭০ দশমিক ৫ গ্রাম। এর কি কোন ব্যাখ্যা আছে? গোল আলুর প্রাপ্যতা ও সরবরাহ সম্পর্কে কোন প্রশ্ন নেই। এর দাম সবসময়ই চালের দামের চেয়ে কম। তবে কি মানুষ জানে না যে প্রতিদিন ১০০ গ্রাম গোল আলু খাওয়া দরকার? আমি জানি না। তবে কি সংস্কার-কুসংস্কার-টাবু কাজ করছে এর পেছনে? এসবও আমার জানা নেই। তবে যেটা জানা যাচ্ছে, বোঝা যাচ্ছে গোল আলু না খাওয়ার চাপ বা বোঝাটা পড়ছে চালে। বিবিএস-এর তথ্য মোতাবেক একজনের প্রতিদিন চাল গ্রহণের পরিমাণ হওয়া উচিত ৩৫০ গ্রাম। খবরের কাগজে প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী সেই স্থলে আমরা ৪১৬ গ্রাম চাল গ্রহণ করি। ভারি মজার তথ্য নয় কী? হিসাবে কিন্তু বাংলাদেশ চালে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় শুধু উদ্বৃত্ত। উদ্বৃত্ত যদি হিসাব মতো আমরা চাল, গম, শাক-সবজি, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ ও ডিম খাই বা গ্রহণ করি। দেখা যাচ্ছে, আমরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল ভোগ করছি। কম খাচ্ছি গম। এর ফল কী? ফল বোধগম্য। এত চাল উৎপাদনের পরও চাল আমদানি করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদিত হয়েছে ৩৮১ লাখ টন। এর মধ্যে আউস, আমন ও বোরোর পরিমাণ হচ্ছে যথাক্রমে ২৩ দশমিক ২৬ লাখ টন, ১৩০ দশমিক ২৩ লাখ টন ও ১৯০ দশমিক ০৭ লাখ টন। গম ও ভুট্টার পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১৩ দমমিক ০২ লাখ টন ও ২৫ দশমিক ১৬ লাখ টন। দেখা যাচ্ছে, মাথাপিছু অতিরিক্ত চাল গ্রহণের ফলে প্রায় ৪ লাখ টন চাল আমদানি করতে হয়েছে। এদিকে গম আমদানি করতে হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ টন। উল্লেখ্য, এত গম আমদানি করতে হয়েছে আবার মাথাপিছু গম গ্রহণ কম হওয়া সত্ত্বেও। গম ও অন্যান্য সবজি মাথাপিছু গ্রহণের কথা ৫০ গ্রাম। সেই স্থলে দৈনিক মাথাপিছু গম ও অন্যান্য শস্য গ্রহণের পরিমাণ মাত্র ২৬ দশমিক ১ গ্রাম। হিসাবে দেখা যাচ্ছে এক চালই আমরা গ্রহণ করছি মাত্রার বেশি। আর অন্যান্য সব ক্ষেত্রে মাত্রার চেয়ে কম। ডাল ও সবজির পরিমিত মাত্রা দৈনিক যথাক্রমে ৫০ ও ৩০০ গ্রাম। সেই স্থলে ভোগের পরিমাণ ১৪ দশমিক ৩০ ও ১৬৬ দশমিক ১ গ্রাম। মাংস ও ডিমের দৈনিক পরিমিত মাত্রা হচ্ছে ৪০ ও ৩০ গ্রাম। সেই স্থলে গ্রহণের মাত্রা হচ্ছে ১৯ দশমিক ৭ গ্রাম ও ৭ দশমিক ২৫ গ্রাম। মাছ ও দুধের পরিমিত মাত্রা ৬০ ও ১৩০ গ্রাম। গ্রহণের পরিমাণ ৪৯ দশমিক ৪ গ্রাম ও ৩৩ দমমিক ৭ গ্রাম। ফলের পরিমিত মাত্রা ১০০ গ্রাম, কিন্তু গ্রহণের পরিমাণ ৪৪ দশমিক ৮ গ্রাম। এই তথ্য থেকে পরিষ্কার যে, চাল বাদে প্রতিটি ক্ষেত্রে গ্রহণের পরিমাণ কম। চালেই মাত্রার বেশি হচ্ছে গ্রহণের পরিমাণ। আলু গ্রহণ বেশি হলে চাল গ্রহণের পরিমাণ কম হতে পারত। এটা হচ্ছে না। আবার গম গ্রহণের পরিমাণ বেশি হলে চাল গ্রহণের পরিমাণ কম হতে পারত। কিন্তু গম আসবে কোত্থেকে? বাংলাদেশে গম উৎপাদন খুব বেশি নয়। উত্তরবঙ্গের কোথাও কোথাও গম উৎপাদন হয়। কিন্তু এর উৎপাদন বাড়ানো শক্ত কাজ। অথচ মানুষ এখন গম খায়। স্বাধীনতার পর পর আটার রুটি কেউ খেতে না চাইলেও এখন ধনী-দরিদ্র সমভাবে আটার রুটি খায়, পাউরুটি খায়। সকালের নাস্তায় আটার রুটি, পাউরুটি এখন বহুল ব্যবহৃত। বন্ড রুটি দ্বারা অনেকে দুপুরে নাস্তাও সারে। তাহলে পরিমিত মাত্রা বাড়ানোর জন্য, সুষম খাদ্যের জন্য অধিকতর গম-ভুট্টা আমদানি করতে হয়। এতে চালের ওপর চাপ কমলে আরও বেশি চাল রফতানি করতে পারি। অবশ্য ইতিমধ্যেই আমরা শ্রীলঙ্কায় টোকেন পাঁচ হাজার টন চাল রফতানি করেছি। গম, আলু ও চালের সমস্যা থেকে ডাল, সবজি, মাংস, ডিম, মাছ, দুধ ও ফলের সমস্যা ভিন্ন। একমাত্র মাছে দেখা যাচ্ছে আমাদের যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। দেশের ভেতরে মাছের চাষ ভালভাবেই হচ্ছে। কিছু মাছ অবশ্য ভারত ও মিয়ানমার থেকে আমদানি হয়ে আসে। উৎপাদন ও আমদানি সূত্রে দেখা যাচ্ছে, পরিমিত মাত্রার কাছাকাছি হচ্ছে মাছের ভোক্তা। ৬০ গ্রামের বিপরীতে মাছ ভোগের পরিমাণ মাথাপিছু ৪৯ দশমিক ৪ গ্রাম। মৎস্য চাষকে আরেকটু উৎসাহ দিলে এই খাতে বড় সাফল্য আসতে পারে। কিন্তু যে প্রশ্নটি বড় তা হচ্ছে সুষম খাদ্যের জন্য চালের ওপর নির্ভরশীলতা কমালে ডাল, সবজি, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম ও কলার কী ব্যবস্থা হবে? অনেকেই বলছেন সবজিতে বাংলাদেশ ভাল করছে। সবজি কিছু নষ্টও হয়, এ কথাও সত্যি। কিন্তু পরিমিত পরিমাণ সবজি যদি মানুষ গ্রহণ করতে চায়, তাহলে কি এই সবজিতে হবে? দ্বিতীয় প্রশ্ন সবজির দাম বাজারে তো চালের দামের চেয়ে বেশি। চালের দাম, আলুর দাম কিন্তু অন্যান্য খাদ্যশস্য, মাছ ও মাংস-ডিমের দামের চেয়ে কম। মানুষ শুধু খাদ্যাভ্যাসের কারণেই চালের ওপর নির্ভরশীল নয়, ক্রয়ক্ষমতাও একটা বিষয়। দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে আমাদের যে জমি আছে, বলছি যে আবাদযোগ্য জমি আছে তা দিয়ে কি আমরা চাল, ডাল, শাক-সবজি, মাছ, মাংস, দুধ-ডিম ও ফলমূলের চাহিদা মেটাতে পারব। যে চালের উৎপাদন বেশ উৎসাহজনক তার উৎপাদন, জমির উৎপাদন ক্ষমতা কিন্তু ক্রমেই সংকোচনশীল। আবাদী জমির পরিমাণ প্রতিবছর এক-দুই শতাংশ হারে হ্রাস পাচ্ছে। লোকসংখ্যা প্রতিবছর দেড় শতাংশ হারে ২৪ লাখ করে বাড়ছে। যদি অধিকতর উৎপাদনশীল বীজ আবিষ্কৃত না হয় অথবা আবাদী জমির পরিমাণ ঠিক না থাকে, তাহলে চালের উৎপাদন তো ঠিক রাখা যাবে না। তখন তো অতিরিক্ত চাল গ্রহণ করে বাঁচাও যাবে না।

তথ্যে দেখা যাচ্ছে, ফল আমরা প্রয়োজনের অর্ধেকেরও কম গ্রহণ করছি। দুধ গ্রহণ করছি প্রয়োজনের এক-চতুর্থাংশ। ডিম গ্রহণও এক-চতুর্থাংশ। মাংস অর্ধেক। সবজি প্রয়োজনের অর্ধেক। ডালে এক-তৃতীয়াংশ- এই যে ঘাটতি তা পূরণ করতে না পারলে সুষম খাদ্যের আশা দুরাশা মাত্র। সুষম খাদ্যের অভাবে শিশুরা অপুষ্টিতে ভুগছে, সাধারণ-মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। এতে দেখা যাচ্ছে, চালে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করার পর এখন পড়েছি আরেক সমস্যায়, সুষম খাদ্যের। এখন হিসাব করে দেখা উচিত বর্তমান আবাদী জমি দিয়ে পরিমিত খাদ্যের ব্যবস্থা করা যাবে কী না। এর বিকল্প ব্যবস্থার কথাও ভাবতে হবে। কারণ সুষম খাদ্যের কোন বিকল্প নেই।

লেখক : ম্যানেজমেন্ট ইকোনমিস্ট ও

সাবেক শিক্ষক ঢাবি

নির্বাচিত সংবাদ