২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লন্ডনের দুই বাঙালী তরুণীকে নিয়ে এই গল্প ফাঁদার আসল কারণ কি?

  • আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বানর দই খেয়ে ছাগলের দাড়িতে হাত মুছে রেখেছিল এবং তাদের মালিক ঘুম থেকে জেগে উঠে ছাগলই দই খেয়েছে ভেবে তাকে পিটিয়েছিল, এই গল্পটি আমার পাঠকেরা সকলেই জানেন। এটি উপকথার গল্প হলেও বর্তমান বিশ্বের অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের ক্ষেত্রেও সত্য প্রমাণিত হয়েছে। জাতীয় চক্রান্তের সঙ্গে যখন আন্তর্জাতিক চক্রান্ত যুক্ত হয়, তখন এই চক্রান্তের আসল হোতারা নিজেদের গোপন রাখার জন্য স্কেপগোট খোঁজে। অন্যকে দোষী হিসেবে দেখিয়ে সাধারণ মানুষের সন্দেহ অন্যদিকে ঘোরাবার চেষ্টা করে।

এর অনেক উদাহরণ দিতে পারি। তবে দূরের বাদ্য না বাজিয়ে নিজেদের ঘরেরই উদাহরণ টানি। বঙ্গবন্ধু-হত্যাকা-ে জাতীয় চক্রান্তের সঙ্গে যে আন্তর্জাতিক চক্রান্ত যুক্ত হয়েছিল তা আজ প্রমাণিত সত্য। এই হত্যাকা-ের বিচার হয়েছে এবং কয়েকজন ভাড়াটে ঘাতকের দ-ও হয়েছে। কিন্তু এই চক্রান্তের মূল নায়কদের বিচার হতে পারেনি। খোন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমান আগেই মারা গেছেন এবং সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার এবং ঢাকায় নিযুক্ত তৎকালীন মার্কিন দূত বোস্টার আমাদের আইন আদালতের নাগালেন বাইরে রয়েছেন। বোস্টার কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।

বঙ্গবন্ধু ও আমাদের জাতীয় নেতাদের হত্যার এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত এবং তার আসল নায়কদের কথা যাতে মানুষ জানতে না পারে এবং এই হত্যাকা- ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা পরায়ণতা থেকে ঘটেছে বলে সকলকে বিশ্বাস করানোর জন্য বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে সঙ্গে একটি গল্প দেশী ও বিদেশী মিডিয়ায় ছড়ানো হয়েছিল। গল্পটি হলো, বঙ্গবন্ধুর এক ঘনিষ্ঠ অনুসারী গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ির এক বিবাহের জলসায় তার পরিবারের লোকদের দ্বারা সেনাবাহিনীর মেজর ডালিমের (বর্তমানে বঙ্গবন্ধু হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত এবং পলাতক) স্ত্রী অপমানিত হওয়ার অভিযোগে ডালিম সেনাবাহিনীর কয়েকজন সহকর্মীসহ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়েছিলেন। ফলে সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় তারা প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে। এর পেছনে কোন চক্রান্ত নেই।

এই গল্পটি বেশ কিছুদিন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায়-বিশেষ করে মার্কিন মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু সত্যকে আর ক’দিন চাপা রাখা যায়? সত্যের ঢাক আপনিই বাজে। ধীরে ধীরে জানা গেল, গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে একটি সামান্য অপ্রীতিকর ঘটনা যে ঘটেছিল তা সত্য। কিন্তু তা তখনই চুকে বুকে গেছে। তবে এই মেজর ডালিম এবং তার অন্যান্য সহকর্মীকে রিক্রুট করেছে ষড়যন্ত্রের আসল নায়কেরা এবং তাদের ষড়যন্ত্র ঢাকা দেয়ার জন্য গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ির ঘটনাটিকে হত্যাকা-ের উদ্দেশ্য হিসেবে সামনে নিয়ে এসেছে। কিন্তু এটা যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী পরাজিত শক্তির চক্রান্ত এবং তার পেছনে মদদ জুগিয়েছে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা চক্র ও মার্কিন সিআইএ এ কথা জানাজানি হতে তো বেশি দেরি হয়নি।

বাংলাদেশে এই দেশী-বিদেশী চক্রান্তের এখনও অবসান হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী চক্র এবং তাদের বিদেশী মদদদাতারা বর্তমান হাসিনা সরকারকে হয় তাদের কাছে নতজানু করা, নয়ত ক্ষমতা থেকে অপসারণের চেষ্টায় লিপ্ত। তার হালের প্রমাণ হচ্ছে, ঢাকায় ও রংপুরে দু’জন বিদেশীর হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে দেশে-বিদেশে একটা জোরালো প্রচার এবং হাসিনা সরকারের উপর উদ্দেশ্যমূলক চাপ সৃষ্টির তৎপরতা। এটা এখন স্পষ্ট, এই তৎপরতার অংশ হিসেবে একটি হত্যাকা- হতেই অস্ট্রেলিয়া তাদের ক্রিকেটটিম সন্ত্রাসের অজুহাতে ঢাকায় পাঠানো বাতিল করে। দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানও সহসা যেন বাংলাদেশকে ‘বয়কট’ করে। ব্রিটিশ মন্ত্রীর ঢাকা সফর স্থগিত হয়। মার্কিন ও পশ্চিমা কূটনীতিকরা বাংলাদেশে তাদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নেই বলে হৈ চৈ শুরু করেন। কিন্তু এই প্রচারণা দ্বারা বাংলাদেশের জনমতকে বিভ্রান্ত করা যায়নি। দেশ-বিদেশের সচেতন মানুষ ধরে ফেলে যে, যেসব পশ্চিমা দেশ একজন দু’জন বিদেশীর হত্যাকা-ে বাংলাদেশ সন্ত্রাসে ভরে গেল বলে রব তুলেছেন, তাদের দেশে এর চাইতেও বেশি হত্যাকা- চলছে এবং এসব দেশই বাংলাদেশের গত সাধারণ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াতের দাবিকে প্রকারান্তরে সমর্থন জানিয়ে অবিলম্বে আরেকটি নির্বাচনের জন্য সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। বর্তমান হাসিনা সরকারের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা যায় বলে আকারে ইঙ্গিতে ভয় দেখাচ্ছিল।

তাদের সেই চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়। হাসিনা সরকার দিন দিন ক্ষমতায় স্থিতিশীল হয়ে বসছে এবং তাদের জনসমর্থন বাড়ছে। দেশের অভ্যন্তরে বিএনপি-জামায়াত কর্তৃক সৃষ্ট রাজনৈতিক সন্ত্রাস দমনেও তারা সফল হয়েছে। সুতরাং উপায়ান্তর না দেখে এই পশ্চিমা দেশগুলো এখন বাংলাদেশে দু’জন বিদেশীর হত্যাকা-কে কেন্দ্র করে দেশটি সন্ত্রাসে ভরে গেছে এই রব তুলে আবার হাসিনা সরকারের উপর বিএনপি-জামায়াতের শর্ত মেনে অবিলম্বে নতুন নির্বাচন দেয়ার চাপটি সম্ভবত আরও জোরালোভাবে প্রয়োগ করতে চায়। যদিও তারা জানেন, এই বিদেশী নাগরিক হত্যা বিএনপি-জামায়াতেরই আগের রাজনৈতিক সন্ত্রাসের নতুন ধাপ। আগে দেশের মানুষ হত্যা করে বিদেশী শক্তির টনক নাড়াতে না পেরে এখন বিদেশী হত্যা করে পশ্চিমাদের টনক তারা নাড়াতে চায় এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোও এই সুযোগেরই অপেক্ষা করছিল। তাদের আসল অভিপ্রায় সন্ত্রাস দমনে সাহায্যের নামে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানো।

এখন কোন কোন পশ্চিমা মিডিয়াতেই বলা হচ্ছে, অস্ট্রেলিয়া যে বাংলাদেশে খেলতে যায়নি তাদের বৈশ্বিক ক্রিকেট-রাজনীতি তার কারণ। একজন বিদেশীর হত্যাকা-কে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য কয়েকটি দেশও এই পশ্চিমা অপচেষ্টার ফাঁদে পা দিয়েছে। এই পশ্চিমা তৎপরতার সঙ্গে যে দেশের চক্রান্তকারীদেরও যোগ আছে সে সম্পর্কেও অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন। প্রায় একই সময়ে চিকিৎসার নামে বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডনে আসা এবং লন্ডনে অবস্থান বিলম্বিত করার কারণ সম্পর্কে লন্ডনের বাংলা মিডিয়াগুলোতেও নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে।

লেখাটি শুরু করেছিলাম বানরের দই খেয়ে ছাগলের দাড়িতে হাত মোছার গল্প দিয়ে। সেই গল্পে ফিরে যাই। অতীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পেছনের দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ও চক্রান্তকারীদের আড়াল করার জন্য যেমন গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ির বিবাহ অনুষ্ঠানে এক অপ্রীতিকর ঘটনাকে সামনে খাড়া করা হয়েছিল। বর্তমানে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে যে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে, সেই ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রকারীদের আড়াল করার জন্য অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটটিম বাংলাদেশে না আসায় লন্ডনের দুই বাঙালী তরুণীকে দায়ী করে একটি গল্প ফাঁদা হয়েছে। লক্ষ্য সেই একই, আসল চক্রান্তকারীদের ওপর থেকে মানুষের সন্দেহ অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া।

ঢাকার কোন জাতীয় দৈনিকে নয়, একটি অনলাইন পত্রিকায় ৫ অক্টোবর একটি খবর প্রচার করা হয়েছে, যার শিরোনাম হলো ‘অস্ট্রেলিয়া দল না আসার পেছনে দুই তরুণী।’ খবরে বলা হয়েছে, ‘জঙ্গী হামলার আশঙ্কার ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেটটিমের বাংলাদেশে না আসার নেপথ্যে অনুঘটক হিসেবে লন্ডন প্রবাসী বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত দুই তরুণীকে শনাক্ত করেছে বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা। রুমানা হাশেম ও অজন্তা দেব রায় নামে ওই দু’তরুণী লন্ডনে বসে টুইটারে বাংলাদেশের ২১ জন মুক্তমনা ব্লগার একটিভিস্ট ও লেখকের নাম সন্ত্রাসীদের হিটলিস্টে রয়েছে বলে প্রকাশ করেন। এরই সূত্র ধরে বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম বাংলাদেশে জঙ্গী হামলার আশঙ্কার বিষয়ে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করে। ওই সংবাদগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় নিয়ে অস্ট্রেলিয়া সরকার নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশে ক্রিকেট টিম না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়।’

খবরে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশের একটি গোয়েন্দা সংস্থা এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে প্রাথমিকভাবে ওই গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, দুই লন্ডনী তরুণীর টুইট বার্তার কারণেই জঙ্গী হামলার আশঙ্কায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ পায়। এর ফলে অস্ট্রেলিয়া দল নিরাপত্তা ইস্যুতে পিছু হটে। এ সংক্রান্ত একটি গোপন প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও পাঠানো হয়েছে। গোয়েন্দারা রুমানা হাশেম ও অজন্তা দেব রায়ের গ্রামের বাড়িতেও তাদের খোঁজ খবর নিচ্ছে। এ ছাড়া গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের দল শীঘ্রই লন্ডনে যাবে। লন্ডনের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় দুই তরুণীর কাছে একুশ জনের হিটলিস্টের সূত্র সম্পর্কে জানতে চাইবেন গোয়েন্দারা।...তবে গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, অসাম্প্রদায়িক চেনতায় বিশ্বাসী ওই দুই তরুণী ব্লগসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুক্ত মনের লেখালেখি করেন। কোন বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

খবরটি পাঠ করে আমি বিস্মিত হয়েছি। তবে এটাকে হলুদ সাংবাদিকতা বলে উড়িয়ে দিতাম, যদি বাংলাদেশের পুলিশের একজন ডিআইজি ঢাকার টেলিভিশন টক শোতে অজন্তা দেব রায়ের নাম উল্লেখ করে একই অভিযোগ পুনরুল্লেখ না করতেন। পরে জানলাম কোন গোয়েন্দা তদন্তের ভিত্তিতে নয়, ওই অনলাইন পত্রিকার খবরের ভিত্তিতেই নাকি পুলিশ কর্মকর্তা মন্তব্যটি করেছেন। এ কথা যদি সত্য হয় তাহলে একজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেননি। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়টি এবং বিদেশে বসবাসকারী দুই বাংলাদেশী তরুণীর সামাজিক অবস্থান ও নিরাপত্তার বিষয়টি তার হাল্কাভাবে নেয়া উচিত হয়নি।

রুমানা হাশেমকে আমি ভালভাবে চিনি না। কিন্তু অজন্তা দেব রায়কে ভালভাবে চিনি এবং স্নেহ করি। সে আমার ছোট মেয়ের চাইতেও বয়সে ছোট এবং মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী একজন রাজনৈতিক একটিভিস্ট। সে গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী। কিন্তু আওয়ামী লীগবিরোধী নয়। বরং যুক্তরাজ্যের আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে সে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। সে বিশ্বাস করে, গণজাগরণ মঞ্চকে স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলো রক্ষায় অক্লান্তভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোন প্রকার সাংঘর্ষিক নীতি গ্রহণ করা গণজাগরণ মঞ্চের ঠিক হবে না। এই মুহূর্তে আওয়ামী লীগকে আঘাত করার অর্থ হবে স্বাধীনতার শত্রুপক্ষ এবং মৌলবাদী শক্তিকে সাহায্য জোগানো। তবে আওয়ামী লীগের ভুলভ্রান্তির সমালোচনা অবশ্যই করতে হবে।

আমি তরুণীর এই অভিমতের সঙ্গে সহমত পোষণ করি বিধায় তার নানাবিধ কাজকর্মে সমর্থন যোগাই। সে দুঃসাহসী এবং জামায়াত ও মৌলবাদবিরোধী এমন সব কর্মসূচীতে যুক্ত, যা তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে যাতে ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশে ফেরত পাঠায় তার দাবিতে সে স্বাক্ষর সংগ্রহ অভিযান শুরু করে এবং জামায়াতের হুমকির সম্মুখীন হয়। বিষয়টি লন্ডনের পুলিশ জানে।

পূর্ব লন্ডনে জামায়াত এবং জঙ্গীবাদের সমর্থকদের একটি শক্তিশালী ঘাঁটি আছে। এই জামায়াতীদের প্রতি সহানুভূতিশীল অসাম্প্রদায়িক পরিচয়ের কিছু লোক আছেন। প্রথমে তারা অজন্তাকে তার রাজনৈতিক কর্মকা- থেকে নিবৃত্ত করার জন্য তার ব্যক্তিগত চরিত্র হরণমূলক প্রচার চালায়। তারপর শুরু হয় তার রাজনৈতিক চরিত্র হননের চেষ্টা। আমার সন্দেহ, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট দলের বাংলাদেশে না আসার ব্যাপারে তাকে যুক্ত করার এই হাস্যকর চেষ্টা জামায়াত এবং জামায়াত সমর্থক মহলের একটি চক্রান্তের অংশ। উদ্দেশ্য, এই দেশপ্রেমিক তরুণীকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে তার দেশপ্রেমমূলক রাজনৈতিক তৎপরতা ব্যর্থ করে দেয়া। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধ্বংস করার জন্য যে দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র চলছে তার আসল হোতাদের দিক থেকে সন্দেহের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দেয়া।

রুমানা হাশেম এবং অজন্তা দেব রায় দু’জনেই পূর্ব লন্ডনের বাঙালী অধ্যুষিত এলাকায় বসবাসকারী দু’জন সাধারণ বাঙালী তরুণী। তারা শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল রাজনীতিতে একটিভিস্টÑ এইটুকু তাদের বৈশিষ্ট্য। তারা খ্যাত নয় এবং এমন প্রভাবশালী নয় যে, তারা ফেসবুকে কিছু লিখে বিদেশী মিডিয়া বা সরকারকে প্রভাবিত করতে পারে। আর তারা নিজেরাই উগ্র মৌলবাদীদের কাছ থেকে দীর্ঘদিন ধরে হুমকি পাচ্ছে। তারা কেন নিজেরা একুশ জনের হিটলিস্ট তৈরি করবে? তবে তারা এই হিটলিস্ট পেয়ে একে অন্যের কাছে পাঠিয়ে সতর্ক করেছে। যেমন অজন্তা এই হিটলিস্ট পাঠিয়েছে রুমানাকে। সে আমাকেও পাঠিয়ে সতর্ক করেছে।

এই হিটলিস্ট প্রকাশ পাওয়ার আগে বাংলাদেশে মুক্তমনা ব্লগারদের জীবননাশের হুমকি দিয়ে তাদের নাম ধরে বার্তা দেয়া হয়েছে। তাদের কেউ কেউ চাপাতির ঘায়ে নিহতও হয়েছে। এগুলো তাহলে কাদের কাজ? সম্প্রতি প্রকাশিত একুশ জনের নামের তালিকায় আমারও নাম আছে। এটা নতুন নয়। আমি নিউইয়র্কে ধর্ম সম্পর্কে যে কথা বলেছি তা বিকৃত করে প্রচারের পর থেকেই আমাকে হুমকি দেয়া হচ্ছে। টেলিফোনে রোজ হুমকি দেয়া হয়। এগুলো কি রুমানা-অজন্তার কাজ? আমি যতদূর জানি, অজন্তা তার নিজের জীবননাশের হুমকি সম্পর্কে ব্রিটিশ পুলিশকে জানিয়েছে। তাদের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছে। সে বহির্বিশ্বকে বাংলাদেশ সম্পর্কে এলার্ট করতে যায়নি। সেই প্রভাব, সেই ক্ষমতাও তার আছে কি? ঢাকার অনলাইন কাগজের খবরটিতে তাকে অসীম প্রভাবশালী বলে দেখানো হয়েছে। এটা উদ্দেশ্যমূলক প্রচার।

রুমানা হাশেম একুশ ব্যক্তির নমের তালিকার সূত্র সম্পর্কে ‘ইউনাইটেড নেশন অন ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অর বিলিভের’ সভাপতিকে কি জানিয়েছেন তা আমি জানি না। তবে এটুকু জানি, বাংলাদেশে একের পর এক ব্লগার হত্যা- বিশেষ করে মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণকারী বাংলাদেশী ব্লগার অভিজিত হত্যার পর গার্ডিয়ানসহ পশ্চিমা প্রভাবশালী মিডিয়াগুলোতে বাংলাদেশে চরমপন্থীদের শক্তিশালী হয়ে ওঠার কথা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হতে থাকে। বিশেষ করে গার্ডিয়ান এবং ইকোনমিস্ট কাগজে জামায়াতের দ্বারা প্রভাবিত দু’একজন সাংবাদিক আছেন। তারা সুযোগ পেলেই বাংলাদেশবিরোধী খবর ছাপেন। অতীতেও তারা এ কাজটি করেছেন এবং তাদের প্রতিবেদনের প্রতিবাদ করতে হয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাসকে। ঢাকা ও রংপুরে বিদেশী নাগরিক হত্যার খবরকে কেন্দ্র করে একশ্রেণীর পশ্চিমা মিডিয়া একই খেলা খেলছে। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করার জন্য যে চক্রান্ত চলছে, এদের প্রচারণা তাকেই সাহায্য যোগাচ্ছে।

এই বিদেশী প্রচারণার নেপথ্যে ভূমিকা গ্রহণের মতো সুযোগ ও প্রভাব দুই বাংলাদেশী তরুণীর কোথায়? তাদের অবস্থান পূর্ব লন্ডনের বাঙালী কম্যুনিটির মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং তাদের রাজনীতিও। পশ্চিমা মিডিয়া ও সরকারকে প্রভাবিত করার মতো ক্ষমতা ও প্রভাব থাকলে এই দুই অল্প বয়সী বাঙালী তরুণী চৌধুরী মইনুদ্দীনের মতো যুদ্ধাপরাধীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আন্দোলনে গার্ডিয়ান ইত্যাদি কাগজের এবং ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন সম্ভবত বহু আগে আদায় করতে পারত।

৫ অক্টোবরের ঢাকার একটি অনলাইন কাগজে ‘অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটটিমের বাংলাদেশে না আসার পেছনে দুই তরুণী’ শীর্ষক খবরটি পাঠ করে সাংবাদিকসুলভ অনুসন্ধিৎসা থেকে এ সম্পর্কে একটু খোঁজখবর নিয়েছি। খোঁজখবর নিয়ে মনে হয়েছে খবরটি ভিত্তিহীন এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র আটছেন, তাদেরই সমর্থক কোন গ্রুপ অথবা অজন্তাদের যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত আন্দোলন ব্যর্থ করতে সচেষ্ট লন্ডনের কোন গ্রুপ এই খবরটি তৈরি করে ঢাকার একটি অনলাইন কাগজের মাধ্যমে প্রচার করেছে।

ঢাকার নির্ভরযোগ্য মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমি দুই বাঙালী তরুণী সম্পর্কে গোয়েন্দা তদন্তের কোন খবর পাইনি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও এতদসংক্রান্ত কোন প্রতিবেদন যায়নি (হয়ত অনলাইন কাগজের খবরের কাটিং যেতে পারে)। এমনকি অজন্তা দেব রায়ের গ্রামের বাড়িতেও এখন পর্যন্ত কোন গোয়েন্দা পুলিশ হানা দেয়নি। সুদূর লন্ডনের উচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা দল পাঠানোর খবর তো আরও হাস্যকর। বাংলাদেশের গোয়েন্দা পুলিশ যেখানে দুই বিদেশী হত্যার সূত্র এখনও বের করতে পারেনি (হয়ত শীঘ্রই তারা পারবেন), সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটটিম বাংলাদেশে খেলতে না আসার ঘোষণা প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে তারা সূত্র আবিষ্কার করে ফেলে সুদূর লন্ডন পর্যন্ত অভিযান শুরু করেছে এ কথা সুস্থ মাথায় কারও বিশ্বাস করার কোন কারণ আছে কি?

আগেই বলেছি, বঙ্গবন্ধু-হত্যার আসল হোতাদের আড়াল করার জন্য যেমন গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ির বিবাহের জলসায় মেজর ডালিমের স্ত্রী সংক্রান্ত একটি ঘটনাকে সামনে তুলে আনা হয়েছিল, তেমনি বর্তমানে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর জন্য যে দেশী-বিদেশী চক্রান্ত চলছে, যার প্রকাশ ঘটেছে দুই বিদেশী হত্যাকে কেন্দ্র করে, তার আসল কারণ ও হোতাদের আড়াল করার জন্যই লন্ডনের এই দুই বাঙালী তরুণীকে টার্গেট করা হয়েছে বলে মনে হয়। লন্ডনেই বাংলাদেশবিরোধী চক্রান্তের সমর্থকরা এই খবর ম্যানুফেকচার করেছে এবং ঢাকায় পাঠিয়েছে। তাদের আরও একটি উদ্দেশ্য রুমানা-অজন্তার মতো প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী যে তরুণ বাঙালী নেতৃত্ব লন্ডনের বাংলাদেশী কম্যুনিটিতে গড়ে উঠছে তাকে অঙ্কুরেই ধ্বংস করা। বাংলাদেশের মানুষ- বিশেষ করে আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ যেন এই প্রচারণা দ্বারা প্রভাবিত ও প্রতারিত না হয়, এটাই আমার কামনা।

[লন্ডন, ১৪ অক্টোবর, বুধবার, ২০১৫]