২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

আমার কৈশোর

(১৪ অক্টোবরের পর)

৪৩-এর শেষ লগ্নে ২০ ডিসেম্বর একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটে কলকাতায়। সেদিন জাপানী বিমানবাহিনী কলকাতার খিদিরপুর এলাকায় বোমাবর্ষণ করে। ফলে কলকাতা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রামের দিকে পাড়ি দেয়। আমার ফুপু কলকাতায় থাকতেন এবং তাদের এলাকায়ও বোমাবর্ষণ করা হয়। তারা তখন সিলেটে পাড়ি দেন এবং তাদের মুখে আমরা কলকাতায় বোমাবর্ষণের নানা কাহিনী শুনি। বোমাবর্ষণের ফলে যেসব স্পিøন্টার্স ছড়িয়ে পড়ে তারও কিছু নমুনা আমার ফুপুর পরিবার দেখাবার জন্য নিয়ে আসেন। আমার ফুপাতো বোন, যিনি বর্তমানে আমার স্ত্রী, তার বয়স তখন মাত্র তিন। সেও কুড়িয়ে কুড়িয়ে অনেক স্পিøন্টার আমাদের দেখানোর জন্য নিয়ে আসে।

১৯৪৩ সালের শেষদিকে মিত্রবাহিনী তাদের সাফল্য সম্বন্ধে প্রায় নিঃসন্দেহ হয়ে যায় এবং তখন থেকে যুদ্ধ শেষে কি ব্যবস্থা নেয়া হবে সে সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা করতে থাকে। যুদ্ধ শেষে কি ধরনের শান্তিচুক্তি হওয়া উচিত তা নিয়েও মিত্রশক্তির নেতৃবর্গ আলাপ-আলোচনা চালাতে থাকেন। বিভিন্ন দলিল-দস্তাবেজ দেখলে বোঝা যায় যে, মিত্রশক্তি বুঝতে পারে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের প্রধান কারণ ছিল ভার্সাই শান্তিচুক্তিতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরাজিত শক্তির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। জার্মানিকে পরাভূত জাতি বিবেচনা করে তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়। সেই কারণেই হিটলার ক্ষুব্ধ হয়ে এর প্রতিশোধ নিতে জার্মান জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেন।

তাই প্রথমেই তারা ঠিক করে যে, আগামীতে যে শান্তিচুক্তি হবে সেখানে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া ঠিক হবে না। বরং এমন একটি ব্যবস্থা করতে হবে যাতে সেখানে পরাজিত শক্তি উন্নয়নের সুযোগ পায় এবং সশস্ত্র যুদ্ধ যে সকলের জন্য মারাত্মক সেই উপলব্ধি যেন সৃষ্টি হতে পারে। তারা সেখানে ঠিক করেন যে, পরাভূত শক্তিসহ সব জাতির জন্য এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যেখানে আলোচনার মাধ্যমে অভিযোগ বা বিরোধের সমাধান হতে পারে, বিশ্ববাণিজ্য প্রসারিত হতে পারে এবং সেখানে পরাজিত জাতিসহ সকলেই সমান সুবিধা গ্রহণ করতে পারে। এই বোধোদয় কিন্তু ১৯৪২ সালের ১২ আগস্টের আটলান্টিক সনদেই মিত্রপক্ষীয় দুই নেতা প্রেসিডেন্ট ফ্রেডরিক রুজভেল্ট এবং উইনস্টন চার্চিল অনুধাবন করেন। ১৯৪৩ সালের ২৫ নবেম্বরে তেহরান সম্মেলনে মিত্রশক্তির অন্যতম নেতা রাশিয়ার জোসেফ স্ট্যালিনও সেই মনোভাব ব্যক্ত করেন।

যুদ্ধকালে আমাদের স্কুলে সেনাদের জন্য একটি হাসপাতাল স্থাপনের ব্যবস্থা হয়। সে কারণে প্রায় দেড়-দুই বছরের জন্য অন্যত্র ক্লাস করতে হয়। তখন ঠিক হলো যে, আলীয়া মাদ্রাসায় সকাল বেলা আমাদের ক্লাস করব। সম্ভবত আমাদের স্কুলের সময় ছিল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত। এতে আমাদের তেমন কোন বিশেষ অনুভূতি ছিল না। আলীয়া মাদ্রাসায় ক্লাসরুমগুলো বেশ প্রশস্ত এবং সম্ভবত মাদ্রাসা এলাকাটি অনেক বড় ছিল।

সম্ভবত আমরা যখন পঞ্চম অথবা ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি তখন আমাদের একজন শিক্ষক হুকুম দিলেন যে, মুসলমান ছাত্রদের টুপি পরে স্কুলে আসতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, হাফপ্যান্ট হলেও টুপিটি মাথায় দিতে হবে। এই হুকুমটি আমাদের মনঃপূত হলো না। তাই এই বিষয়ে আব্বার কাছে নালিশ করলাম এবং বললাম যে, এই অন্যায় আদেশটি আমরা মানতে চাই না। ধর্ম সংশ্লিষ্ট লোকজনের কাছে আব্বা একজন নেতৃস্থানীয় ধার্মিক লোক ছিলেন এবং তাদের অনেকেই আব্বার কাছে পরামর্শ করতে আসতেন। তার মূল কারণ ছিল যে, তিনি ভাল আরবী জানতেন এবং ব্যক্তিগত জীবনে খুব পরহেজগার লোক ছিলেন। আব্বা শিক্ষকের এই আদেশটিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই প্রধান শিক্ষকের কাছে একটি পত্র লেখেন। সেই পত্রটিতে তিনি বললেন যে, টুপি পরানো এমন জারিজুরি ঠিক নয় এবং তার সন্তানদের এমন নির্দেশ মানা উচিত নয়। এই চিঠি প্রধান শিক্ষকের কাছে যাওয়ার প্রায় পরপরই নির্দেশটি বাতিল করা হয়।

যুদ্ধের সময় বোধ হয় দুই বছর আমাদের বার্ষিক খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবছর বার্ষিক খেলাধুলা হতো সুরমা ভ্যালির সব স্কুল নিয়ে এবং এই সময়টি ছিল উৎসবমুখর। এসব খেলাধুলায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যাও খুব বেশি ছিল এবং এতে স্কুলের সব শিক্ষক-ছাত্রই সংশ্লিষ্ট থাকতেন। আমি প্রায়ই বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশ নিতে সচেষ্ট থাকতাম। তবে স্কুলজীবনে খেলাধুলায় কোন পুরস্কার কোনদিনই পাইনি। ফুটবল, ক্রিকেট এবং হকির ভাল খেলোয়াড়রা খুব জনপ্রিয় ছিল এবং তাদের সবাই শ্রদ্ধা করত। শহরের অনেক মাঠে এসব খেলা হতো। নাইওরপুলে ফুটবল, ধোপাপাড়ায় ক্রিকেট এবং আমাদের বাসার পেছনে ফুটবল ও ভলিবল খেলা হতো।

ব্যক্তিগতভাবে কারও সঙ্গে ঝগড়া হলে আমরা বেশ গালাগালি করতাম। তবে গালাগালি ছিল অসম্ভব নির্দোষ। ‘তুই পচা’, ‘তুই গাধা’, ‘তুই বেকুব’, ‘তুই ঝগড়াটে’ এসব গালি ছিল বেশ শক্ত গালি। তার পরেও ঝগড়া বহাল থাকলে নতুন নতুন গালি উদ্ভাবন করা হতো। একবার এক ঝগড়ায় আমি ভুগোলের শব্দটব্দ নিয়ে গালি দিতে শুরু করলাম। যেমন- আমার উল্টো পক্ষকে বললাম যে, ‘তুই মাদ্রাজ’, ‘তুই বিহার’ ইত্যাদি ইত্যাদি। গালিগালাজ অনেকক্ষণ স্থায়ী হয় এবং একটি গালি আমি বার বার দিতে থাকি। সেই গালিটি ছিল ‘ঊড়িষ্যা’। তার পরে আমার বন্ধুবর্গ আমাকে ‘ঊড়িষ্যা’ বলে চটাতো।

১৯৪০-৪১ সালে সিলেটে জেলা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। আমার মনে আছে এই সময় বেশ কিছুদিন প্রতি সন্ধ্যায় আমাদের বাসায় ছাত্রনেতারা আসর জমাতেন। সেখানে যারা উপস্থিত থাকতেন তাদের কথা এখনও মনে আছে। তারা ছিলেন এম. আব্দুল হক। পরবর্তীকালে পূর্ব বাংলা এবং বাংলাদেশ পুলিশের বড় কর্তা, ঢাকার পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে সুপ্রসিদ্ধ ছিলেন। আরও ছিলেন কাজী মুহিবুর রহমান, যিনি এই ছাত্র সংগঠনে অত্যন্ত মূল্যবান ভূমিকা পালন করেন এবং একই সঙ্গে নানা কোন্দলের জন্মদাতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। জনাব তসাদ্দুক আহমেদ যাকে পাকিস্তান আমলে কমিউনিস্টের অপবাদ নিয়ে দেশ ছাড়তে হয় ১৯৬০ সালে। লন্ডনে বসবাসরত বাঙালীদের সংগঠন স্থাপনে তিনি দিশারির ভূমিকা পালন করেন এবং ব্রিটিশ সরকার তাকে এমবিই খেতাব দেয়। প্রায় একই সময়ে বা কিছু পরে এই আসরে উল্লেখযোগ্য আর এক সদস্য ছিলেন আব্দুল হক। তিনি কৃষি কর কমিশনার হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে অবসর নেন। এসব ছাত্র তাদের সংগঠন প্রতিষ্ঠায় আমার আব্বার পরামর্শকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতেন এবং সেজন্য তাদের সভা-সমিতি ১৯৪১ থেকে প্রায় ৪৭ সাল পর্যন্ত সব সময়ই আমাদের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হতো। তাদের বিভিন্ন সম্মেলনে জনাব আব্বাসউদ্দিন আহমেদ, কলকাতার ডেপুটি মেয়র সৈয়দ বদরুদ্দোজা এবং অনেক সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ নেতা যেমন চৌধুরী খালিকুজ্জামান, নবাব মোহাম্মদ ইসমাইল, এরা আসতেন। চলবে...