২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

মাছে অপার সম্ভাবনা

মাছে অপার সম্ভাবনা
  • ’২১ সালের মধ্যে মাছ উৎপাদনে শীর্ষে উঠতে পারে বাংলাদেশ ;###;শুধু চিংড়ি রফতানিতেই আয় পাঁচ শ’ কোটি ডলারে ওঠার সম্ভাবনা ;###;জাতিসংঘের সর্বশেষ রিপোর্টে ভবিষ্যদ্বাণী

জসিম উদ্দিন ॥ দেশে মাছ উৎপাদনের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। মিঠাপানির মাছ চাষে পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বাংলাদেশ। এখানে রয়েছে বিস্তীর্ণ উন্মুক্ত জলাশয় আর লাখ লাখ পুকুর। যেসব জায়গায় মাছ চাষের রয়েছে বিশাল সুযোগ। যা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী আর বছরে আয় হতে পারে কয়েক বিলিয়ন ডলার। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এমন সম্ভাবনার ভবিষ্যদ্বাণী করেছে তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে। যেখানে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ রয়েছে চতুর্থস্থানে। তার বিপরীতে গত অর্থবছরে রফতানি হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টন। এই খাতের রফতানি আয় ছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। তবে, মিঠা পানির মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য ছিল এর মাত্র ৮ শতাংশ। চিংড়ি রফতানি থেকেই এসেছে এর প্রায় ৯২ ভাগ। মাছ রফতানির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সরকারের নীতি সহায়তা। তাহলে ২০২১ সালের মধ্যে শুধু চিংড়ি রফতানি খাত থেকেই কয়েক শ’ কোটি মার্কিন ডলার আয় সম্ভব হবে বলে মনে করেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরা।

জাতিসংেঘর খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ এ্যান্ড এ্যাকুয়াকালচার’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ।

এ প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রথমস্থানে রয়েছে চীন। এর পরই রয়েছে ভারত ও মিয়ানমার। এরপরই বাংলাদেশের অবস্থান।

গত এক যুগ ধরেই মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল।

২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও এফএও পূর্বাভাস দিয়েছে। এরপর থাকবে থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন।

এফএওর তথ্যমতে, সমুদ্রে মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। তবে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হক বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মৎস্যের অবদান ৩০ শতাংশ। আগামী দিনগুলোতে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ থেকে মিঠা পানির মাছ রফতানিতে এর অবদান আরও বেড়ে যাবে।’

তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে মিঠা পানির মাছের রফতানির পরিমাণ প্রতিদিনই বাড়ছে। ইউরোপীয় কমিশনের ফুড এ্যান্ড ভেটেরিনারি বিভাগের অডিটের ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মাছ আমদানি করে থাকে। চলতি বছর ২০ থেকে ৩০ এপ্রিল তাদের তিন সদস্যের একটি দল বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করে। তিনি বলেন, ওই প্রতিনিধি দল মিঠা পানির মাছের রফতানি গুণ পরীক্ষা করে। তাদের ফলের ভিত্তিতে আমাদের দেশের মাছের মান ঠিক আছে।

বেসরকারী গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জনকণ্ঠকে বলেন, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ চতুর্থ অবস্থানে উন্নীত হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে যাওয়া। মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় আমিষের চাহিদা বাড়ে। এই অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ করতে গিয়েই বেসরকারী খাতের উৎপাদন বেড়েছে। তবে, এটা যথেষ্ট নয়। তাই এখনও প্রতিবছর বিদেশ থেকে মাছ আমদানি করতে হচ্ছে।

তার মতে, বেসরকারী খাতের কল্যাণে মাছের উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি বেড়েছে। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে বেসরকারী খাতের জন্য নীতি সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে।

ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, মিঠা পানির মাছ চাষের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। এর উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে। অনেক পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে; এগুলো রক্ষা করা দরকার। সেগুলোকে চাষের আওতায় আনলে উৎপাদন আরও বাড়বে। দেশের চাহিদা পূরণ করে মিঠা পানির মাছ রফতানির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসী ‘এথনিক কনজ্যুমারদের’ মধ্যে রয়েছে এর বিশেষ চাহিদা।

খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, মাছ চাষে এই অর্জনের পেছনে রয়েছে বেসরকারী খাতের উদ্যোক্তাদের শ্রম আর নিষ্ঠা। মাছচাষীদের এই সাফল্য এসেছে অনেক বাধাবিপত্তি পেরিয়ে। সরকারের কৃষিঋণ পেতে মাছচাষীদের এখনও অবহেলাই করা হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মাছচাষীরা সরকারের বিতরণ করা ১৪ হাজার কোটি টাকার কৃষিঋণের মাত্র ১০ শতাংশ পান। তার পরও এফএও বলছে, এই খাতে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সম্ভাবনাময় দেশ।

মিঠাপানির মাছ চাষের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানকার উন্মুক্ত জলাশয় আর গ্রামীণ উদ্যোগে গড়ে ওঠা লাখ লাখ পুকুরে মাছ চাষের যে সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগালে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ মাছ উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হতে পারে বলে মনে করেন এই খাতের সংশ্লিষ্টরা ।

এফএওর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৫৩ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের উন্নত জাতের মাছের উদ্ভাবন আর তা সম্প্রসারণের ফলে মাছের উৎপাদন বেড়েছে বলে মনে করছেন এ খাতের সংশ্লিষ্টরা। অঞ্চল হিসেবে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও বগুড়া জেলা পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটিয়েছে। বিশেষ করে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, চট্টগ্রামের চকরিয়া, কক্সবাজার ও বরিশাল বিভাগে ঘেরে মাছ চাষ এসব এলাকার অর্থনীতির চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। জাতীয় অর্থনীতিতে রেখেছে বড় অবদান। এসব এলাকায় উৎপাদিত চিংড়ি মাছ এখন দেশের দ্বিতীয় প্রধান রফতানি পণ্য। যদিও সম্প্রতি এ খাতের রফতানিতে নেমেছে বড় ধস।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে দেশে ৩৪ লাখ ৫৫ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে চাষের মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ লাখ টন। একই সময়ে ইলিশের উৎপাদন ৫২ হাজার টন বেড়ে মোট পরিমাণ হয়েছে সাড়ে তিন লাখ টন। প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ২০২১ সালে সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫ দশমিক ৫২ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন সম্ভব বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১৯৯০ সালে যেখানে দেশে মোট চাষের মাছ উৎপাদিত হয়েছিল এক লাখ ৯৩ হাজার টন। ২০০০ সালে তা বেড়ে ছয় লাখ ৫৭ হাজার এবং ২০১৪ সালে এসে তা ১০ লাখ টন ছুঁইছুঁই করছে।

মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া আর মাছের দাম সামর্থ্যরে মধ্যে থাকায় গত ১০ বছরে দেশে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ শতভাগ বেড়েছে।

বিশ্বে মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ বছরে ২২ দশমিক ৪ কেজি। বাংলাদেশের মাথাপিছু মাছ খাওয়ার পরিমাণ প্রায় ১২ কেজি। এফএওর তথ্য মতে, বাংলাদেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৫৭ শতাংশ শুধু মাছ থেকেই মেটানো হয়। এর ৭৬ শতাংশই আসে পুকুর ও উন্মুক্ত জলাশয় থেকে।

মাত্র ১০ বছরে মাছ রফতানির পরিমাণ বেড়েছে ১৩৫ গুণ। ২০০৩-০৪ সালে প্রায় ৫৪ হাজার মেট্রিক টন মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করে আয় হয় প্রায় ২ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাছ রফতানির পরিমাণ ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ১৪৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কমেছে উন্মুক্ত জলাশয় ॥ মৎস্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী ১৯৮৩-৮৪ সালে এ খাতে উন্মুক্ত জলাশয়ের অবদান ৬৩ শতাংশ থাকলেও ২০১২-১৩ সালে এ খাতের অংশ দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উন্মুক্ত জলাশয়ে পোনা অবমুক্তকরণের ফলে বিগত ২০০৯-১০ থেকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে মোট ৭১৫ বিল নার্সারি স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে বিদায়ী অর্থবছরেই স্থাপন করা হয়েছে ২০৬। এর মাধ্যমে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত মাছ উৎপাদন হচ্ছে এবং এসবে অনেক বিপন্ন প্রজাতির মাছের আবির্ভাব ঘটেছে।

রফতানি চাহিদা বাড়ছে ॥ বিশ্বব্যাপী মাছের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। এ দেশের মাছ ও মাছ জাতীয় পণ্য রফতানির বড় বাজার হলো ইউরোপ। সেখানে রফতানি হয় প্রায় ৭৫ শতাংশ। যার মধ্যে ৮০ শতাংশই চিংড়ি। আর রাশিয়ায় রফতানি হয় প্রায় ১০ শতাংশ। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য মতে, গত ১৫ বছরে রফতানির পরিমাণে প্রবৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪২ শতাংশ। এ খাতের রফতানি আয় বেড়েছে ২০৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সূত্র জানায়, ২০০০-২০০১ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাছ রফতানির পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৭৬২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন। যার তৎকালীন বাজার মূল্য ছিল ৩৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশী টাকায় ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাছ রফতানির পরিমাণ ছিল ৫৫ হাজার ৭২ মেট্রিক টন। যার রফতানি মূল্য হলো ৬৩৮ দশমিক ১৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর পরের বছর ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে রফতানি হয় প্রায় ১১ শতাংশ কম। এর পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৩০৪ দশমিক ৫৫ মেট্রিক টন। যার রফতানি মূল্য হলো ৫৬৮ দশমিক শূন্য ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশের মাছ রফতানি ধাক্কা খায় ২০০৭-০৮ অর্থবছরের বিশ্বমন্দায়। এ সময় আমদানিকারক দেশগুলোতে চিংড়িকে বিলাসী খাদ্য হিসেবে ধরা হয়। তবে, সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠে এরপরও রফতানি চলছে। মার্কিন ডলারের বিপরীতে রুবল ও ইউরো দুর্বল হয়ে পড়লে সব শেষ ধাক্কা খায়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডলারের বিপরীতে প্রায় ৫৫ শতাংশ দরপতন হয় রুবলের। আর ডলারের বিপরীতে ইউরোর দরপতন হয় প্রায় ২২ শতাংশ। এসব কারণে মাছ ও মৎস্য জাতীয় পণ্য রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪’র অক্টোবর থেকে হিমায়িত চিংড়ির রফতানি কমেছে ৩০ ভাগ। ২০১৫ সালের জুলাইতে চিংড়ি রফতানি কমেছে শতকরা ২৪ ভাগ। এই মাসে শুধু মিঠা পানির মাছ রফতানি কমেছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে শতকরা ৮৪ ভাগ। যা এ যাবতকালের সর্বনিম্ন। ইউরো ও রুবলের দরপতন ছাড়াও মাছ রফতানিতে নগদ সহায়তা প্রদানে বৈষম্য কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট রফতানি কারকরা।

সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বিদেশীদের মাঝে লোনা পানির মাছের বিশাল বাজার রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ‘ব্ল্যাক টাইগার’ চিংড়ির। সেখানেও যে রফতানি কাঠামো গড়ে উঠেছে। তা যথেষ্ট নয়। চিংড়ির ক্ষেত্রে আমদানিকারকদের যেমন বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তেমনি চিংড়িতেও অপদ্রব্য ‘পুশ’ করার অভিযোগ আছে। এছাড়া আমদানিকারকরা এখন কম্পøায়েন্স ইস্যুতে সচেতন। তাই পুরো কম্পøায়েন্স নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ ব্যাপারে রফতানিকারকদের আরও সতর্কতা দরকার। সরকারের উচিত তাদের আরও প্রযুক্তিগত সহায়তা। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে উৎপাদন ব্যয় কমানোর উপায়ও বের করা দরকার।

তিনি বলেন, ইউরোপ ও রাশিয়া বাংলাদেশের চিংড়ির বড় বাজার। ডলারের বিপরীতে ইউরো ও রুবেলের দরপতনের সেখানে চাহিদা কমে গেছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পণ্য রফতানি না করতে পারাটা এখন উদ্যোক্তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। সরকার তাদের ব্যাপারে নমনীয় হতে পারে। তাদের রিপেমেন্টের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক রফতানি সহায়ক নির্দেশনা দিতে পারে।

উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকার সহায়তা দিতে পারে। উন্নত প্রযুক্তি প্রয়োজন হলে তাও দিতে পারে। এছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে নজর দিতে হবে কিভাবে উৎপাদন ব্যয় কমানো যায়।

নগদ সহায়তায় বৈষম্য ॥ মাছ শতভাগ কৃষি পণ্য হলেও এর রফতানিতে নগদ সহায়তায় রয়েছে বেশ বৈষম্য। চিংড়ি রফতানির বিপরীতে নগদ সহায়তায় দেয়া ১০ শতাংশ আর মিঠা পানির মাছ বা মৎস্য জাতীয় পণ্যের (শুঁটকি, কাঁকড়া, কুঁচে ইত্যাদি) ক্ষেত্রে ১ দশমিক ১ শতাংশ। এক্ষেত্রে এই নগদ সহায়তার জন্য চিংড়ির সিলিং রেট নির্ধারণ করা হয় প্রতি পাউন্ড ৩ দশমিক ৭৯ ডলার। তাও ২০০২-০৩ অর্থবছরে। যখন এক পাউন্ড চিংড়ির আন্তর্জাতিক মূল্য ছিল ৪-৫ ডলার। গত ১৩ বছরে চিংড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়। এক বছর আগে ছিল ১০-১১ ডলার। বর্তমান হ্রাসকৃত মূল্যেও ৫ ডলারের বেশি। তবু সমন্বয় হয়নি এ সিলিং। অন্যদিকে মিঠাপানির মাছ বা অন্যান্য মাছের সিলিং রেট হলো প্রতি পাউন্ড ১ দশমিক ১ ডলার। যার প্রতি পাউন্ড রফতানি মূল্য ৫-৭ ডলার। এর মধ্যে যদি ভ্যালু এ্যাড হয় তা ১০ ডলারেরও বেশি বিক্রি হচ্ছে। তবে তাদের নগদ সহায়তার পরিমাণ মাত্র ৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র সহ-সভাপতি গোলাম মোস্তফা জনকণ্ঠকে বলেন, সব ধরনের মাছ রফতানিতে অভিন্ন হারে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তা দেয়ার দাবি আমরা সরকারের কাছে করে আসছি। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সিলিং রেট পুনর্নির্ধারণের দাবিও আমরা সরকারকে জানিয়েছি। না হয় এই বৈষম্য ছোট ও মাঝারি মানের কারখানাগুলোকে রুগ্ণ করে তুলবে।

কাঁচামাল সংকট ॥ দেশের মৎস্য রফতানি খাতের সঙ্গে জড়িত প্রক্রিয়াজাত কারখানার সংখ্যা মোট ১৪৫। যাদের মধ্যে বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সদস্য মাত্র ৯৮। এদের মধ্যে হালনাগাদ সনদ রয়েছে মাত্র ৭৮ কারখানার। সরকারী হিসাব মতে, ৫৫ কারখানা চালু রয়েছে।

বিএফএফইএ তথ্য মতে, সব কারখানার বার্ষিক কাঁচামালের চাহিদা প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মেট্রিক টন। যার মধ্যে গত অর্থবছরের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫০ হাজার মেট্রিক টন, যা মোট চাহিদার মাত্র এক সপ্তমাংশ। এর মধ্যে চিংড়ি ছাড়াও রয়েছে মৎস্য জাতীয় পণ্য শুঁটকি, কাঁকড়া ও কুঁচে ইত্যাদি।

প্রায় প্রতিটি কারখানাই শুরু থেকেই তার চাহিদার কম কাঁচামাল পেত। তবে তা ৬০ শতাংশের কম ছিল না। সম্প্রতি কোন কোন কারখানা মাত্র ২০ শতাংশ বা তার চেয়ে কম কাঁচামাল পাচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চট্টগ্রামের ২৬ কারখানার মধ্যে দশটি সচল আছে। কক্সবাজারের সাতটির মধ্যে মাত্র তিনটি সচল রয়েছে। কক্সবাজারের কুলিয়ারচর সী ফুডের মহাব্যবস্থাপক মোঃ আনিসুর রহমান জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিদিন তাদের কারখানার চাহিদা প্রায় ৪ হাজার কেজি। পাচ্ছেন এর ২০ শতাংশের মতো। তা দিয়ে চলছে কারখানা। তবে রফতানির জন্য প্রক্রিয়াজাত করে রাখা পণ্য আছে ৭ লাখ কেজি। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দরপতন হওয়ায় শিপমেন্ট হচ্ছে না বলে জানান তিনি। এরপরও প্রতিদিন তাদের বিদ্যুত বিল, কর্মচারী বেতন আর ব্যাংক লোনের সুদের হার বাড়ছে বলে জানান তিনি। যা মালিকের জন্য বড় ধরনের চাপ বলে মনে করেন আনিসুর রহমান। তিনি বলেন, ইউরোপ আমাদের বড় বাজার। তবে এখন সময় এসেছে নতুন বাজার খুঁজে বের করার।

পাশের অন্য একটি কারখানা সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে। ওই কারখানার সদ্য চাকরি হারানো মহাব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠোফোনে জনকণ্ঠকে বলেন, ‘কারখানায় কাজ নেই। তাই মালিক আমাকে বোঝা মনে করছে। বিদায় করে দিলো, তাই গ্রামের বাড়িতে চলে এলাম।’ তিনি বলেন, কারখানায় নিয়মিত প্রায় ২শ লোক কাজ করত। ভরা মৌসুমে ৩শ-সাড়ে লোক কাজ করত।

মূলধন আটকে গেছে ॥ আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির মূল্য হ্রাসের কারণে বাংলাদেশ হিমায়িত খাদ্য রফতানিকারক সমিতি হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এজন্য তারা চলতি মূলধন ঋণের ন্যূনতম ৪০ শতাংশ ব্লক এ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে ব্যাংক রেট সুদে ১০ বছরের ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধের সুবিধা চেয়েছেন। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে গত ১১ জুন ডিও লেটার দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ।

এরপর অর্থমন্ত্রী ১৫ জুন মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মতামতের জন্য পাঠান। ওই ডিও লেটারের ওপর লিখে দেন ‘মৎস্য মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে প্রতিবেদন চাই, শুধু বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব যথেষ্ট নয়।’

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতি মতামতে বলা হয়, প্রতি বছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে মৎস্য ও মৎস্য পণ্য উৎপাদন বাড়লেও রফতানিতে নানাবিধ ‘আওতাবহির্ভূত সমস্যার কারণে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই খাত কাক্সিক্ষত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। তাই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এ খাতের বিদ্যমান সমস্যা নিরসনে তিনটি সুপারিশ করা হয়। তা হলোÑ ১. বিশ্ববাজারে হিমায়িত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছের মূল্য পতনের ফলে সৃষ্ট তারল্য সঙ্কট নিরসনে মৎস্য ও মৎস্য সম্পদ রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলতি মূলধন ঋণের ন্যূনতম ৪০ শতাংশ ব্যাংক এ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করে ব্যাংক রেট সুদে ১০ বছর মেয়াদে ত্রৈমাসিক কিস্তিতে পরিশোধ করার সুবিধা দেয়া। ২. গত অর্থবছরে হিমায়িত খাদ্য রফতানিতে চিংড়ির প্রায় ৯০ শতাংশ এবং অন্যান্য মাছের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। সরকার চিংড়ি রফতানিতে ১০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দিলেও অন্যান্য মাছ রফতানিতে ৫ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দিচ্ছে। এই বৈষম্য দূর করতে উভয় পণ্যে ১০ শতাংশ অভিন্ন হারে নগদ সহায়তা দেয়া। ৩. ২০০২-০৩ অর্থবছরে সরকার এই খাতে নগদ সহায়তা দিতে চিংড়িতে পাউন্ড প্রতি ৩ দশমিক ৭৯ মার্কিন ডলার আর অন্যান্য মাছে পাউন্ড প্রতি ১ দশমিক ১০ মার্কিন ডলার সিলিং নির্ধারণ করে। প্রায় ১২ বছর আগের সিলিংকে বর্তমান প্রকৃত রফতানি মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত ॥ সনাতন পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি হয়। সেমি ইনটেনসিভ বা আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করে ৪৫০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন এখন প্রমাণিত। বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস্ এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন কক্সবাজারের খুরুসকুল এলাকায় নেয়া পাইলট প্রকল্পে এ ফল পাওয়া যায়। সম্প্রতি বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর প্রতিনিধিরা ওই প্রকল্প দেখে এসেছেন।

বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুড এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএফইএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি গোলাম মোস্তফা জনকণ্ঠকে বলেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রতি হেক্টরে চিংড়ি উৎপাদন হচ্ছে ৭০০ থেকে ১ হাজার কেজি। থাইল্যান্ডে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার এবং ভিয়েতনামে ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার কেজি। সেখানে আমাদের দেশে হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি। আমাদের দেশে চিংড়ি উৎপাদন এত কম হওয়ার কারণ হলো, অনেক চাষী সনাতন পদ্ধতিতে চাষ করছে। ব্যাংক ঋণ না পাওয়া এবং ঋণ পেলেও সময়মতো না পাওয়ায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী চিংড়ি চাষ হচ্ছে না। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও চিংড়ি চাষ হ্রাস পাচ্ছে।

তিনি বলেন, উন্নত পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষে উদ্বুদ্ধ করতেই তারা এমন প্রকল্প হাতে নেন, যা বাংলাদেশের চিংড়ি চাষে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে তাদের সহযোগিতা দিয়েছে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ।

গোলাম মোস্তফা জনকণ্ঠকে বলেন, এই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বছরের শুরুতে সময়মতো পোনা অবমুক্তকরণ করা গেলে বছরে দুদফা চিংড়ি চাষ সম্ভব। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও আমাদের চিংড়ি রফতানির পরিমাণ সামান্য। দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য চিংড়ি উৎপাদনের এই সাফল্য সারাদেশের চিংড়ি চাষীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে তারা কাজ করছেন। তাই চাষীদের সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

বিএফএফইএর সূত্র জানায়, চাষীদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রদান, মাটি ও পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে জমি তৈরি, ভাইরাসমুক্ত সুস্থ চিংড়ি পোনা এবং পরিমিত সুষম খাদ্য দিয়ে আধা নিবিড় চিংড়ি চাষ পদ্ধতির পাশাপাশি উন্নত চিংড়ি চাষের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ চিংড়ি উৎপাদন সম্ভব হয়েছে। সরেজমিন দেখা গেছে, কক্সবাজারের অনেক চাষী এখন আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষ করছেন।

রফতানি বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলো বিশেষ করে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ভারত, চীন ও ইন্দোনেশিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে হেক্টর প্রতি গড়ে ৩০০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন হয়ে থাকে। এদেশে চিংড়ি রফতানিতে অনেক পুরনো হলেও চিংড়ি উৎপাদনে ওসব দেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।

বিএফএফইএর সিনিয়র সহ-সভাপতি বলেন, দেশের প্রায় দুই লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হয়। যা পুরোটাই সনাতন পদ্ধতিতে চাষ হচ্ছে। এর মাত্র ২০ শতাংশ জমিতেও যদি আধা নিবিড় পদ্ধতিতে চাষ করা যায় উৎপাদন হবে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন। তাহলে ২০২১ সালে শুধু চিংড়ি রফতানি আয় হবে প্রায় পাঁচশ কোটি মার্কিন ডলার।