২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এলো নবান্নের কাল-

এলো নবান্নের কাল-

মোরসালিন মিজান ॥ সবুজ পাতার খামের ভেতর/হলুদ গাঁদা চিঠি লেখে/কোন্ পাথারের ওপার থেকে/আনল ডেকে হেমন্তকে...। প্রকৃতির আন্তরিক আহ্বানে আবারও এসেছে হেমন্ত। আজ শুক্রবার ১ কার্তিক, ১৪২২ বঙ্গাব্দ। প্রিয় ঋতু শুরুর দিন। নতুন ঋতুর আগমনে এরই মাঝে রূপ বদলেছে প্রকৃতি। হেমন্তের রঙে সেজেছে। কবিগুরুর ভাষায়- হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা-/ হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধুমল রঙে আঁকা।/ সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে মলিন হেরি কুয়াশাতে,/ কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা।/ ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।/ দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তামার দানে...।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে কার্তিক-অগ্রহায়ণ দুই মাস হেমন্ত কাল। অগ্রহায়ণের শেষ দিনটি পর্যন্ত বহাল থাকবে এ ঋতুর আধিপত্য। প্রথম মাসটির এক রূপ। পরেরটির অন্য। অর্থাৎ বিপরীতধর্মী দুটি সময়কে জোড়া দেয়ার কাজ করে হেমন্ত। এখন যেমন সারাবছরের জন্য জমিয়ে রাখা চাল শেষ হওয়ার পথে। ধানের গোলা শূন্য প্রায়। এ জন্য কার্তিকের দুর্নাম করে বলা হয় ‘মরা কার্তিক’। অগ্রহায়ণে আবার উল্টো চিত্র। এই মাস সমৃদ্ধির। এ সময় মাঠের সোনালী ফসল কাটা শুরু হয়। দেখতে দেখতে গোলা ভরে ওঠে কৃষকের। হেমন্তের বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাকা ধানের মিষ্টি ঘ্রাণ। বাড়ির আঙিনা নতুন ধানে ভরে ওঠে। কৃষক বধূ ধান শুকোয়। প্রতি ঘর থেকে আসে ঢেঁকিতে ধান ভানার শব্দ।

অবশ্য যত দিন যাচ্ছে, ততই বদলাচ্ছে এসব ধরাবাধা নিয়ম। এখন আগের সে অভাব নেই। শস্যের বহুমুখীকরণের ফলে মোটামুটি সারাবছরই ব্যস্ত কৃষক। বিভিন্ন ফসল ফলান তারা। আয় রোজগারও বেশ। পাশাপাশি এখন কার্তিক মাসেই পুষ্ট হয়ে ওঠে আগাম আমন ধানের শীষ। পাকা ধান কাটা শুরু হয়ে যায়। ঠিক এ মুহূর্তে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলছে আগাম আমন ধান কাটার উৎসব। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে মহাধুমধামে চলছে ফসল কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ। বগুড়া, রংপুর, নীলফামারীসহ বিভিন্ন জেলার কৃষক যারপরনাই ব্যস্ত। কৃষকরা বাড়তি লোক নিয়ে ফসলের মাঠে যাচ্ছেন। দিনভর চলছে ধান কাটা। তারপর ফসল কাঁধে বাড়ি ফিরছেন। এত যে দেখা, তবু চোখ সরানো যায় না! অদ্ভুত ছন্দ তুলে সরু আইল মেঠোপথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফেরেন কৃষক। সেখানে আগে থেকে অপেক্ষমাণ কৃষাণী। ধান মাড়াই, শুকিয়ে ঘরে তোলার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় খুশি মনেই অংশ নিতে দেখা যায় তাদের।

আর তারপর অগ্রহায়ণ। এ মাসের পুরোটাজুড়ে সারা বাংলায় চলবে নবান্ন উৎসব। বাঙালীর প্রধান ও প্রাচীনতম উৎসবগুলোর অন্যতম নবান্ন। এ সময় আমন ধান কাটা শুরু হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফসল উৎপাদনের সময় এটি। প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টন আমন উৎপাদন হয় এ সময়। নতুন ধানে চলে নবান্ন উৎসব। আমন ধানের চালে প্রথম রান্না হয়। এ উপলক্ষে চলে আনন্দঘন উদ্যাপন। কোন কোন অঞ্চলে ফসল কাটার আগে বিজোড়সংখ্যক ধানের ছড়া কেটে ঘরের চালে বেঁধে রাখা হয়। বাকি অংশ চাল করে সে চালে চলে পায়েস রান্না। এভাবে নানা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে উদ্যাপিত হয় নবান্ন উৎসব। শুধু গ্রামে নয়, এখন শহরেরও থাকে নানা আয়োজন। গ্রামের মতো না হলেও প্রতিবছর ১ অগ্রহায়ণ রাজধানী ঢাকায় প্রতীকী উৎসবের আয়োজন করা হয়।

এছাড়া হেমন্তের প্রকৃতিও চমৎকার। এ সময় গরম কমে যায়। শীত আসি আসি করে। সব মিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য হেমন্ত।