২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন সাকা ও মুজাহিদ

  • ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে পলাতক ৬ জন;###;১১ জন কারাগারে দ- মাথায় নিয়ে

বিকাশ দত্ত ॥ ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় যাদের অঙ্গুলি হেলনে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ধর্মান্তরিতের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়েছে। এক সময়ে মন্ত্রীও ছিলেন, আজ তাদেরই অন্যতম দুই শীর্ষ নেতা বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। সাকা চৌধুরী কাশিমপুর কারাগারে আর মুজাহিদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন। এদিকে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী উভয়ই আশা করছেন, রিভিউর রায় তাদের পক্ষেই আসবে। এছাড়া আরও ১১ জন দ- মাথায় নিয়ে কারাগারে আটক রয়েছেন। ৬ জন ফাঁসির দ- নিয়ে পলাতক রয়েছেন। সাকা আর মুজাহিদের মামলাটি এখন শেষ ধাপে। রিভিউ আবেদন খারিজ হলে তাদের একমাত্র পথ থাকবে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রাণ ভিক্ষা।

এক সময়ে এই দুই শীর্ষ নেতা সাকা ও মুজাহিদ দম্ভ করেছিলেন মানবতাবিরোধী বিচার নিয়ে। যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর তা এক তুড়িতে উড়িয়ে দেয়ার হুমকিও দিয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সাকা চৌধুরী। অন্যদিকে মুজাহিদ বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে কোন স্বাধীনতাবিরোধী নেই, ছিলও না। কোন যুদ্ধাপরাধী নেই। এটা বানোয়াট ও কল্পনাপ্রসূত।’ অথচ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেই তাদের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। আপীল বিভগেও ঐ দ- বহাল রয়েছে। এখন রিভিউ করেছে আসামি পক্ষ।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর এ পর্যন্ত ২১টি মামলায় মোট ২৪ জনকে বিভিন্ন ধরনের দ- দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে ১৭ জনকে মৃত্যুদ-, একজনকে যাবজ্জীবন কারাদ-, একজনকে ৯০ বছরের কারাদ-, ও ৫ জনকে আমৃত্যু কারাদ- প্রদান করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ১০টি এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ১১টি রায় প্রদান করেছেন। এ দ-ের বিরুদ্ধে আপীল বিভাগে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫টি। নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে ৮টি। অপরদিকে ৫টি মামলায় ৬ জন পলাতক রয়েছেন।

শুধু সাকা ও মুজাহিদ নয় আরও ১১ জন কারাগারে রয়েছেন ট্রাইব্যুনালের দ- মাথায় নিয়ে। তাদের মামলা আপীলে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তারা হলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাশেম আলী, আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজাহারুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির নেতা (পলাতক) আব্দুল জব্বার (রাষ্ট্রপক্ষ) জামায়াতের নায়েবে আমির আব্দুস সুবহান ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের মাহিদুর রহমান আফসার হোসেন চুটু, বাগেরহাটের কসাই সিরাজ মাস্টার ও খান আকরাম। অন্যদিকে ফাঁসির দ- মাথায় নিয়ে পলাতক রয়েছেন ৬ জন। এরা হলেন বাচ্চু রাজাকার ওরফে আবুল কালাম, আশরাফুজ্জামান খান, চৌধুরী মঈনুদ্দিন, জাহিদ হোসেন খোকন, হাসান আলী, ফোরকান মল্লিক।

এখন সবার নজর সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের দিকে। সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী স্বঘোষিত ব্রিগেডিয়ার ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন। এরপর মন্ত্রী হয়েছেন। অন্যদিকে আলী আহাসান মুজাহিদ আলবদর কমান্ডার ছিলেন। তিনিই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় মন্ত্রী হয়েছিলেন। বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ওরফে সাকা চৌধুরী চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত রাজনৈতিক পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান। তিনি ১৩ মার্চ ১৯৪৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরী কর্তৃক পাকিস্তান দখলদার হানাদার বাহিনীর সহযোগী বাহিনী হিসেবে গঠিত আলশামস, মূল নেতৃত্বদানকারী ছিল তারই জ্যেষ্ঠপুত্র স্বঘোষিত ব্রিগেডিয়ার আসামি সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী। ১৯৭৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া আসনের মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে সংসদ নির্বাচিত হন। ১৯৮৪ সালের পর থেকে এরশাদ সরকারের জাতীয় পার্টিতে যোগদান করে সেই সরকারের ত্রাণ, পুনর্বাসন, গৃহায়ন ও গণপূর্ত এবং পরবর্তীতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টি থেকে পদত্যাগ করে এককভাবে রাজনৈতিক দল এনডিপি (ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি) গঠন করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এনডিপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পূর্বে এনডিপি বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগদান করেন। ২০০১ সালে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে পুনরায় একই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে নির্বাচনে রাঙ্গুনিয়া আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ড. হাসান মাহমুদের কাছে পরাজিত হলেও ফটিকছড়ি আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বচিত হন।

অপরদিকে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের জন্ম ২ জানুয়ারি ১৯৪৮। গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালী থানাধীন পশ্চিম খাবাসপুর। ঢাকার ঠিকানা-রোড নং-১০, বাসা নং-০৫, ফ্ল্যাট-২/এ, সেক্টর-১১, থানাÑউত্তরা, ঢাকা।

আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৬৪ সালে এসএসসি পাস করেন। পরে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যয়নকালে এইচএসসি পরীক্ষা শেষের দিকে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের কর্মী হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৮-১৯৭০ সাল পর্যন্ত ফরিদপুর জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। ১৯৭০ সালে ডিসেম্বরের দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৭১ জানুয়ারি/ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মনোনীত হন। ঐ বছরের আগস্ট/সেপ্টেম্বরে তিনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। অক্টোবর মাসে নির্বাচিত হন এ সংগঠনের প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে এবং ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল ছিলেন। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলেও কোন নির্বাচনে তিনি জয়ী হতে পারেননি। ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদের বিএনপি-জামায়াত জোট নেতৃত্বাধীন চারদলীয় সরকারের তিনি সমাজকল্যাণমন্ত্রী ছিলেন।