২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

আপনাদের দুঃখের রজনী শেষ, যা যা দরকার সবই করা হবে

  • বিলুপ্ত ছিট দাসিয়ারছড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা;###;কুড়িগ্রামে জনসভায় মানুষের ঢল

রাজু মোস্তাফিজ, কুড়িগ্রাম থেকে ॥ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশে কোন ধরনের সন্ত্রাসী ও জঙ্গী কার্যক্রম সহ্য করা হবে না। এ দেশে কোন ধরনের সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের স্থান হবে না। বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া দেশে থাকতে দেড় শতাধিক মানুষকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছেন। এখন বিদেশে বসে দেশের বিরুদ্ধে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। বিদেশীদের হত্যা করছেন। বিদেশী নাগরিকরা এদেশে শান্তিতে থাকুক এটাও উনি (খালেদা জিয়া) চান না। কিন্তু যতই ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করুক, আওয়ামী লীগ ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলবেই। উত্তরাঞ্চলে এখন কোন মঙ্গা নেই, মানুষ মঙ্গা নামক শব্দটিই একদিন ভুলে যাবে। বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের নয়, বাংলাদেশ হবে উচ্চ আয়ের সমৃদ্ধ দেশ।

বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম সরকারী কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এর আগে ৬৮ বছরের অধিকারহীনতার পথ মাড়িয়ে নতুন বাংলাদেশের বাসিন্দা হওয়া ফুলবাড়ির বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়ায় গিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের ‘ফুলকুঁড়ি’ অভিহিত করে তাদের কল্যাণে ‘যা যা দরকার’ সব করার আশ্বাস দিয়েছেন।

সাবেক ছিটমহলবাসীর উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রস্ফুটিত ফুলের গোছা পেয়েছি ছিটবাসীর কাছ থেকে। আপনাদের আর কোন বঞ্চনা থাকবে না। আপনাদের দুঃখের রজনী শেষ হয়েছে, নতুন সূর্যালোকে আলোকিত হয়ে আলোর পথে যে যাত্রা আপনারা শুরু করেছেন সে যাত্রা অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ছিটমহলবাসী আর ছিট হিসেবে চিহ্নিত হবে না। তারা এখন জাতীয় পরিচয়ে পরিচিত হবে। ছিটমহলবাসীর এতদিন ছিল বঞ্চনার ইতিহাস। এখন আর বঞ্চনা থাকবে না। ছিটবাসীর জন্য পূর্বের সরকারগুলো কোন কাজ করেনি। দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে এ অঞ্চলের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করেছে। প্রধানমন্ত্রী ছিটমহলবাসীর সকল সমস্যা চিহ্নিত করে দ্রুত তা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন।

বিকেলে কুড়িগ্রামের সরকারী কলেজ মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ এদেশের স্বাধীনতা এনেছে। তাই দেশের উন্নয়নের জন্য আমাদের বলতে হবে না। কোন দাবি জানানোর দরকার নেই। কোন কিছু চাওয়ার আগেই আওয়ামী লীগ করে দেয়। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন নীতিমালা আছে। আমরা ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করব। এ সময় তিনি জেলার ১৬টি উন্নয়নমূলক কর্মকা-ের ফলক উন্মোচন ও ১৪টি নতুন কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

কুড়িগ্রাম জেলা সদরে আয়োজিত জনসভাকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই পুরো শহরে মানুষের ঢল নামে। বেলা আড়াইটার জনসভা মাঠ দুপুর ১২টার মধ্যেই কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষকে কলেজ মাঠের পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে, গাছে চড়ে এবং আশপাশের সব রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা শুনতে দেখা দেখা গেছে। মাঠে জায়গা না পেয়ে চারপাশে দুই থেকে তিন কিলোমিটার জায়গাজুড়ে ছিল মানুষের স্রোত। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম ম-ল মঞ্জুর সভাপতিত্বে বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটে বক্তৃতা দিতে উঠে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনসভাকে ‘জনসমুদ্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় আয়োজকদের পক্ষ থেকে মাঠে জায়গা নেই জানিয়ে বেলা সোয়া দুইটার দিকেই প্রবেশ গেটগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

জনসভায় বক্তব্য রাখেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌহিফ-ই-এলাহী চৌধুরী, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাঃ দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বিদ্যুত প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, খাদ্য প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাফর আলী, এসএম আব্রাহাম লিংকন প্রমুখ।

জনসভায় নৌকা মার্কায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। উন্নয়নের জন্য যা দরকার আওয়ামী লীগ সরকার তাই করবে। শুধু আপনাদের দোয়া চাই, নৌকা মার্কায় ভোট চাই। নৌকা মার্কায় দেশের উন্নয়ন হয়। নৌকা মার্কা দেশে স্বাধীনতা এনেছে। দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি আনবে। বাংলাদেশের মানুষের উন্নত ও সুখী সৃমদ্ধ জীবনই আমাদের একমাত্র চাওয়া।

বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন বর্জন করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে। শত শত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। এরা মানুষ নয়, মানুষরূপী পশু। বাসের ড্রাইভার, হেলপার, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, নবজাতক শিশুও খালেদা জিয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়নি। আন্দোলন-অবরোধের নামে খালেদা জিয়া ৯২ দিনে ১৫০ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছেন। বর্তমানে তিনি বিদেশে অবস্থান করে নতুনভাবে ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন, বিদেশীদের হত্যা করছেন।

দেশের প্রত্যেক ঘরে ঘরে বিদ্যুত পৌঁছে দেয়ার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন আওয়ামী লীগ করছে এবং করবে। দেশের ৭৫ ভাগ মানুষ এখন বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। আমরা প্রত্যেক ঘরে ঘরে আলো জ্বালাব। তিনি বলেন, আমরা দেশকে উন্নত করতে চাই। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের আগেই নিম্ন মধ্যম নয় বরং উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত দেশ হবে। দেশ হবে দারিদ্র্যমুক্ত, ক্ষুধামুক্ত, জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের বই কেনার দায়িত্ব নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। পৃথিবীর কোন দেশে কেউ এটি দেয় না। এ সময় তিনি বিএনপি-জামায়াতের জ্বালাও পোড়াও কর্মসূচীর মধ্যেও বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে প্রায় ৩৩ কোটি বই তুলে দেয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এক সময় কুড়িগ্রাম ছিল মঙ্গাকবলিত, দরিদ্র এলাকা। আমাদের করুণার পাত্র বানাত অন্যরা। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর আর কেউ এই অঞ্চলের উন্নয়ন করেনি। জিয়াউর রহমান, এরশাদ, খালেদা জিয়া সরকার এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের কথা চিন্তাও করেনি। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় এলেই এ অঞ্চলে আসে মঙ্গা, দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। ২১ বছর পরে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকর করার উদ্যোগ নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ছিটমহলের ৬৮ বছরের বঞ্চনার অবসান করেছে। আওয়ামী লীগ ছাড়া এই বঞ্চনা আর কেউ দূর করতে পারেনি। ছিটমহল বলে এখন আর কিছু নেই। ছিটমহলের মানুষগুলো এখন বাংলাদেশের নাগরিক। আশপাশে যারা আছেন আপনারা তাদের আপন করে নেবেন। তারা আমাদের আপনজন। এই অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নের জন্য সরকার ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, শিল্প কারখানার জন্য একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন করা হবে। জেলা প্রশাসককে জমি দেখতে নির্দেশ দিয়েছি। এর ফলে এই অঞ্চলে ব্যাপক কর্মসংস্থান হবে।

তিনি বলেন, আমরা চাই দেশের মানুষ আরও উন্নতি করুক। সবাই মিলে দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলুক। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। যেন তরুণরা ঘরে বসে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে আয় করতে পারে। তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাদক থেকে দূরে থাকতে হবে। কোন অবস্থাতেই মাদক সহ্য করা হবে না।

ফুলবাড়ির ছিটবাসীরা ‘ফুলকুঁড়ি’ ॥ প্রধানমন্ত্রী সকালে বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার অধিবাসীদের ‘ফুলকুঁড়ি’ অভিহিত করে বলেন, এসব ফুলকুঁড়ির কল্যাণে যা যা দরকার সবই করা হবে। দাসিয়ারছড়া এখন ছিটমহল নয়, এটি বাংলাদেশের অন্তর্গত ফুলবাড়ির এলাকা। আমি ফুলবাড়িতে এসেছি। ফুলবাড়ি এখন প্রস্ফুটিত ফুলের বাগান। এখানকার নাগরিকরা ভাল করেই জানেন। কোথায় যাব? কোন ঠিকানা আপনাদের ছিল না। আজ আপনাদের যে অসুবিধা আর নাই। আপনারা এখন বাংলাদেশের সন্তান, এদেশের নাগরিক, বাংলাদেশের আপনজন।

সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে জেলার ফুলবাড়িতে অবতরণ করেন শেখ হাসিনা। পরে উপজেলা সদর থেকে ১৯ কিলোমিটার সড়কপথে প্রধানমন্ত্রী অধুনাবিলুপ্ত ছিটমহলে যান। শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় পৌঁছে বিদ্যুত সংযোগ কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন। আর এ উদ্বোধনের মাধ্যমে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও পঞ্চগড় জেলার ৫টি উপজেলার (ফুলবাড়ি, দেবীগঞ্জ, বোদা, পঞ্চগড় ও ডিমলা) ২ হাজার ৫৬৯টি পরিবারের লোকজন দীর্ঘ ৬৮ বছর পর অন্ধকার থেকে আলোর ছোঁয়া পেল। এ সময় তিনি ৫টি পরিবারে সোলার হোপ সিস্টেম বিতরণ করেন।

পরে কালিরহাট গার্লস হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দাসিয়ারছড়ার মানুষের সার্বিক কল্যাণে যা যা করণীয়, আওয়ামী লীগ সরকার তা করবে। দুঃখের রজনী শেষ হয়েছে। নতুন সূর্যালোকে আলোকিত হয়ে আলোর পথের যে যাত্রা আপনারা শুরু করেছেন সে যাত্রা অব্যাহত থাক। তিনি বলেন, দাসিয়ারছড়া এখন ছিটমহল নয়, এটি বাংলাদেশের ফুলবাড়ি উপজেলার এলাকা। আমি ফুলবাড়িতে এসেছি। ফুলবাড়ি এখন নতুন প্রস্ফুটিত ফুলের এক বাগান। এখানকার নাগরিকরা এখন এক একজন ফুল। আপনারা আমাদের একগুচ্ছ ফুল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ আপনাদের মধ্যে আসতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত। আগেও আসার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু আসতে পারিনি। কেন সেটা আপনারা ভাল করেই জানেন। কোথায় যাব? কোন ঠিকানা আপনাদের ছিল না। আজ আপনাদের সে অসুবিধা আর নাই। আপনারা এখন বাংলাদেশের সন্তান। এদেশের নাগরিক। বাংলাদেশেরই আপনজন। শেখ হাসিনা বলেন, ইতোমধ্যে কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও পঞ্চগড়ে পাঁচটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুত সরবরাহের জন্য এ তিন জেলায় ৪১ দশমিক ৭১ কিলোমিটার বিদ্যুত লাইন স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ২৫ হাজার পরিবারকে পল্লীবিদ্যুতের মাধ্যমে বিদ্যুত সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে নতুনভাবে সেজেছিল ৬৮ বছর ধরে স্বাধীনতাবঞ্চিত এই দাসিয়ারছড়া এলাকা। বন্দী জীবনের মুক্তি, অবিশ্বাস্য উন্নয়ন আর প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পাওয়ার আনন্দে দলমত নির্বিশেষে ভাগ করেছেন দাষিয়ারছড়াবাসী। প্রধানমন্ত্রী যখন সাবেক ছিটমহলের স্বাধীন ভূখ-ে পা রাখেন তখন সেøাগানে সেøাগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। নিরাপত্তার চাদর দিয়ে পুরো এলাকা ঢাকা থাকলেও মানুষের সরল অনুভূতি আটকাতে পারেনি তাদের। মুক্তির যে কি বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস তা বৃহস্পতিবার দাসিয়ারছড়ায় এসে চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দীর্ঘজীবনের অবহেলা আর বঞ্চনার পর তাদের জীবনের পড়ন্ত বেলায় এত সুখ অনুভূত হবে তা সাবেক ছিটমহলবাসী কল্পনাও করতে পারেননি। যা নিজে এসে তা দিয়ে গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাই দাসিয়ারছড়ার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে নিজের মায়ের আসনে বসিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া ছিটমহলের নারী, পুরুষ, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কোন মানুষের প্রায় পনেরো দিন থেকে চোখে ঘুম ছিল না। তারা শুধু দেখছে অবহেলিত এই জনপদ কিভাবে এত দ্রুত উন্নয়নে বদলে যায়। শুধু জননেত্রী শেখ হাসিনার অদম্য ইচ্ছায় এটি সম্ভব হয়েছে বলে জানান কালীরহাট গ্রামের পঞ্চাশোর্ধ কৃষক মনির উদ্দিন ও তারাবানু। এখানকার গ্রামগুলো হচ্ছে উচাটারী, খরিয়াটারী, বালাটারী, পূর্বটারী, বানিয়াটারী, কালিরহাট, দোলাটারী, কামারপুর, ছোটকামাত, বড়কামাত, রাসমালা, কেরাটারী। এখানে এক হাজার ৯শ’ ৪৫ একর জমি রয়েছে। মোট পরিবার রয়েছে ৯শ’।

শুধু বিলুপ্ত দাসিয়ারছড়া নয়, পুরো ফুলবাড়ি উপজেলা, পার্শ্ববর্তী লালমনিরহাট জেলায় সাজ সাজ রব। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার জন্য হাজার হাজার যুবক, বৃদ্ধ, তরুণ, পুরুষ মহিলা খ- খ- আনন্দ মিছিল করে এসেছে এখানে। ৬৮ বছরের বন্দী জীবনের মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করছে তারা। চরম আনন্দের কী যে এক অনুভূতি। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দূর-দূরান্তের বিভিন্ন গ্রাম, পার্শ¦বর্তী জেলা এবং বিভিন্ন উপজেলার হাজার হাজার মানুষ ছিটের মানুষের সঙ্গে আনন্দে শরিক হতে এসেছেন।

সুধী-সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার সময় মুজিব-ইন্দিরা মৈত্রী চুক্তি ও স্থলসীমান্ত চুক্তি হয়। ১৯৭৪ সালেই স্থলসীমান্ত চুক্তি সংসদে পাস করেন বঙ্গবন্ধু। তবে ভারত তাদের পার্লামেন্টে এটা করতে পারেনি। তারপরে পাস করতে ৬৮ বছর লাগল। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর বাংলাদেশে যারা সরকার গঠন করেছিল তারা এই চুক্তি বাস্তবায়নে কোন কাজ করেনি। জেনারেল জিয়া, এরশাদ ও খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ছিলেন দীর্ঘদিন। কিন্তু কেউ এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সঙ্গে যে আলাপ-আলোচনা করতে হবে সেই উদ্যোগ গ্রহণ করে নাই বা করার মতো মনে হয় সাহসও পায়নি।

ছিটমহল বাসিন্দাদের ৬৮ বছরের ‘মানবেতর’ জীবনযাপনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন যে বঞ্চনা, যে কষ্ট; সেই কষ্ট আর আপনাদের থাকবে না। সেই কষ্ট আল্লাহর রহমতে নেই। জাতির পিতা শুরু করেছিলেন, তিনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে এই সমস্যা বহু আগেই সমাধান হয়ে যেত। বহু আগেই আপনারা আপনাদের ঠিকানা পেতেন, রাষ্ট্রের মর্যাদা পেতেন, সবকিছু পেতেন। এ সময় ছিটমহলবাসীর জন্য নেয়া নানা উন্নয়ন কর্মসূচীর কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ছিটমহলগুলোতে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও মসজিদ-মন্দিরভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র, রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে।

কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দাসিয়ারছড়ায় অনুষ্ঠিত সুধী সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক খান মোঃ নুরুল আমিন। এ সময় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বিরোধীদলীয় চীফ হুইপ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ, এলজিআরডি সচিব আবদুল মালেক, ফুলবাড়ি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী সরকার, দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা হৈমন্তী শুক্লা প্রমুখ।