১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

অগ্রগতির সিঁড়িতে ৮ মেগা প্রকল্প ॥ কাজ এগোচ্ছে দ্রুত

  • মূল পদ্মা সেতুর ১৩.৫ শতাংশ সমাপ্ত;###;মেট্রোরেলের বেসিক ডিজাইন প্রণয়ন সম্পন্ন;###;মাতারবাড়ি বিদ্যুত কেন্দ্রের ১৫০০ একর জমি অধিগ্রহণ

হামিদ-উজ-জামান মামুন ॥ বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মেগা আট প্রকল্প। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি যেমন বাড়বে, তেমনি বদলে যাবে দেশের চেহারাও। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে এগুলোর বাস্তবায়ন কার্যক্রম মনিটরিং করছে সরকার। প্রকল্পগুলোকে ফাস্টট্র্যাক হিসেবে গণ্য করে জোরেশোরে চলছে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। এগুলো হচ্ছে পদ্মা সেতু, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত প্রকল্প, রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, মেট্রোরেল প্রকল্প, মাতারবাড়ি কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর।

অন্যদিকে সরকারী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দ্রুত করতে গঠন করা হচ্ছে প্রজেক্ট প্রিপারেটরি ফান্ড এবং সংশোধন হচ্ছে ভূমি সংক্রান্ত আইনও। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব বিষয় জানা গেছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ফাস্টট্র্যাক প্রজেক্ট মনিটরিং টাস্কফোর্সের বৈঠকে প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের। ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ এখন অগ্রগতির সিঁড়িতে উঠেছে। কিন্তু এ সময় যতটা দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা ছিল তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাসহ নানা পিছুটানের কারণে। তবে এখন শিল্পের ক্ষেত্রে যে সুযোগ তৈরি হয়েছে তা কাজে লাগাতে অবকাঠামোর উন্নতি করতে হবে। এজন্য বিশেষ কিছু করার দরকার নেই। সরকার যেগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছে সেগুলো শেষ করতে পারলেই আপাতত হয়।

সূত্র জানায়, গত সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত টাস্কফোর্সের সভায় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে তুলে ধরা হয়েছে। এ সময় সেতু বিভাগের সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম জানান, পদ্মা বহুমুখী সেতুর মূল কাজ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। জাজিরা প্রান্তে এ্যাপ্রোচ রোডের কাজ ৪৮ দশািমক ৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে প্রপ্রোচ রোডের কাজ ৫০ শতাংশ এবং সার্ভিস এরিয়া (দুই) এর কাজ ৪৬ শতাংশ শেষ হয়েছে। এ সময় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন,পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার জানান, ইতোমধ্যেই পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প পরিদর্শন করা হয়েছে। প্রকল্পটির সার্বিক অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে সভায়। অন্যদিকে পদ্মা সেতুর নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যেই একটি সেনানিবাস স্থাপনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯৯ ব্রিগেড স্থাপন প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এজন্য ব্যয় হবে ৭৫০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা।

পদ্মা সেতু প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী আহম মুস্তফা কামাল বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন হয়ে থাকবে। এটি বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করলেও জনগণের বিশ্বাসকে সম্মান দিয়ে সবার সহযোগিতায় এই সেতু বাস্তবায়িত হচ্ছে। দ্রুততার সঙ্গে সেতুর কাজ এগিয়ে চলছে। আশা করছি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন হবে। তিনি আরও বলেন, পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেতু এলাকায় সকল সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন সেনাবাহিনীর ক্যান্টমেন্ট স্থাপন করা হচ্ছে।

রুপপুর পরমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের অগ্রগতি বিষয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব জানান, এ প্রকল্পের আওতায় চারটি চুক্তির মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় চুক্তির মাঠ পর্যায়ে শতভাগ কাজ সমাপ্ত হয়েছে। অন্যান্য চুক্তির কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পটির ভবিষ্যত কর্মপরিকল্পনার বিষয়ে কোন সমস্যা নেই। সভায় মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের স্পর্শকাতরতার বিষয়টি বিবেচনায় এনে কাজের গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন। এ প্রকল্প বিষয়ে সূত্র জানায়, বিদ্যুত কেন্দ্রের যথাযথ নিরাপত্তার জন্য গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্পের পানি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রকল্পের পরিচালক এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট অন্যদের সঙ্গে সর্বশেষ গত ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য প্রতিবছর প্রয়োজনীয় পানির পরিমাণ হবে ৮১ মিলিয়ন কিউবিক মিটার বলে গঙ্গা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সূত্র জনায়, দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব নেয়ার পর নতুন করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেয় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের সার্বিক দিকনির্দেশনা প্রদান ও বাস্তবায়ন কার্যাবলী মনিটরিংয়ের জন্য ২০১০ সালের ৯ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন বিষয়ক একটি জাতীয় কমিটি গঠন করা হয়।

রামপাল ১৩২০ মেগাওয়াট মৈত্রী সুপার থার্মাল পাওয়ার প্রজেক্ট বিষয়ে টাস্কফোর্স সভায় জানানো হয়, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৭০ শতাংশ ইসিএ ফাইনান্সিংয়ের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। ২০১৬ সালে কন্ট্রাক্ট এ্যাওয়ার্ড দেয়া হবে। এই প্রকল্পের সঙ্গে রেল ও সড়ক সংযোগের বিষয়ে কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া আরও জানানো হয়, এ বিদ্যুত প্রকল্পের জন্য বাংলাদেশ-ভারত যৌথ বিদ্যুত প্রকল্পের ইসিএ ফাইনান্সিংয়ের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ও পোর্ট অথরিটিকে অন্তর্ভুক্ত করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য রোড শো’র বিষয়টি আপাতত স্থগিত রয়েছে। পরবর্তীতে রোড শো হলে সেখানে সংশ্লিষ্ট প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ।

মাতারবাড়ি ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রজেক্টের অগ্রগতি বিষয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যেই দেড় হাজার একর জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়েছে এবং প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ করা হয়েছে। ইপিসি ঠিকাদার নিয়োগের জন্য প্রি-কোয়ালিশন (পিকিউ) আহ্বান করা হয়েছে। অন্যান্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়া মাতারবাড়ি বিদ্যুত কেন্দ্রের জন্য একটি সংযোগ সড়ক নির্মাণ সংক্রান্ত প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ব্যয় ৬০২ কোটি ৩২ লাখ টাকা। এ প্রকল্পটির পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য এনজিও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তবে এনএসআই-এর প্রতিবেদন দাখিলের পর এনজিও নিয়োগ চূড়ান্ত করা হবে। পুনর্বাসন কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। তিনি ৭ দিনের মধ্যে এনএসআই রিপোর্ট দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালককে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।

ঢাকা মাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (মেট্রোরেল) অগ্রগতি সম্পর্কে জানা গেছে, এ প্রকল্পের কাজগুলো ৮টি প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬টি প্যাকেজের টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং বাকি টেন্ডারগুলো পর্যায়ক্রমে আহ্বানের জন্য কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেই সঙ্গে বেসিক ডিজাইন প্রণয়নের কার্যক্রম শতভাগ শেষ হয়েছে। ডিটেইলডিজাইরনর কাজ ৪৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। টেপোগ্রাফিক এবং অন্যান্য জরিপ কাজ চলমান রয়েছে। ডিপো ল্যান্ড ডেভেলপমেন্টের টেন্ডার মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। ডিপোর জন্য সিভিল এবং বিল্ডিং কার্যক্রম পিকিউ আহ্বান করা হয়েছে। রোলিং স্টক এন্ড ডিপো ইক্যুইপমেন্ট ফর রোলিং স্টক এ্যাওটিং-এর জন্য জাইকার সম্মতির জন্য পাঠানো হয়েছে। তাছাড়া মতিঝিল এলাকায় সাব-স্টেশনের জন্য ৫০ শতক জমি প্রয়োজন, সেখানে রেলওয়ের জমি রয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। সূত্র জানায়, পরিবর্তিত রুট অনুযায়ী, মেট্রোরেল উত্তরা থেকে পল্লবী, খামারবাড়ি, ফার্মগেট, শাহবাগ, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, প্রেসক্লাব ও মতিঝিল (বাংলাদেশ ব্যাংক) পর্যন্ত যাবে। পথে স্টেশন থাকবে মোট ১৬টি। মেট্রোরেলে ঘণ্টায় গড়ে ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। তিনটি পর্যায়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ২০১৯ সালের মধ্যে পল্লবী থেকে সোনারগাঁও ১১ কিলোমিটার চালু করা হবে। এর পরের বছরে হোটেল সোনারগাঁও হতে মতিঝিল এবং ২০২১ সাল নাগাদ উত্তরা হতে পল্লবী অংশে ট্রেন চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

এলএনজি টার্মিনালের জন্য পেট্রোবাংলা এবং এক্সিলারেট এনার্জি লিমিটেডের মধ্যে টার্ম সিট এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়েছে। মেট্রোলজিক্যাল ওসান স্টাডি সম্পন্ন হয়েছে, যা পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাছাড়া সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে এফএসআরইউ স্থাপনের কার্যক্রম শেষ করা হবে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যেই। সরকারের অন্যতম এ প্রকল্পটি মহেশখালিতে নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিদিন ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আমদানির জন্য টার্মিনালটি নির্মাণ করা হচ্ছে। টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০১৬ এর জুলাই মাসে।

পায়রা সমুদ্রবন্দরের বিষয়ে জানা গেছে, এ প্রকল্পটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। পরিকল্পনা কমিশন জানিয়েছে ইতোমধ্যেই পায়রা সমুদ্রবন্দর প্রকল্পের বিষয়ে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি বর্তমানে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের বিষয়ে দ্রুত এগুতে চাচ্ছে না সরকার। এটি নির্মাণে ইতোমধ্যেই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে ডেনমার্ক। এখন পর্যন্ত ডেনমার্ক ছাড়া যেসব দেশ কক্সবাজারের সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে এগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, নেদারল্যান্ড ও জার্মানি। তবে কোন দেশের আর্থিক সহযোগিতায় এটি তৈরি করা হবে সে বষয়ে দ্রুত কোন সিদ্ধান্ত নিতে চাচ্ছে না সরকার।