২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

কুষ্টিয়ায় পাঁচ দিনব্যাপী লালন উৎসব শুরু আজ

কুষ্টিয়ায় পাঁচ  দিনব্যাপী  লালন উৎসব  শুরু আজ

এমএ রকিব, কুষ্টিয়া থেকে ॥ বাড়ীর পাশে আরশীনগর সেথা একঘর পড়শী বসত করে, আমি একদিনও না দেখিলাম তাঁরে....। মরমী গানের স্রষ্টা আধ্যাত্মিক সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র ১২৫তম তিরোধান দিবস আজ ১ কার্তিক। দিনটি পালন উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো এবারও লালন শাহের চারণভূমি কুষ্টিয়ায় আয়োজন করা হয়েছে টানা পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান তথা লালন উৎসব। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহযোগিতায় কুষ্টিয়া লালন একাডেমির আয়োজনে এসব অনুষ্ঠানে রয়েছে লালনের জীবনদর্শন ও স্মৃতিচারণ করে আলোচনা, লালন সঙ্গীতানুষ্ঠান। এছাড়াও বসছে জাকজমকপূর্ণ লালন মেলা। মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে ছেঁউড়িয়া হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর। ভক্ত, অনুসারী, দর্শক-শ্রোতা ও বাউল-বাউলানীর পদচারণার মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনের আঁখড়াবাড়ি। রাতভর চলবে মন মাতানো সব লালন সঙ্গীত। লালন একাডেমির সভাপতি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন জানান, ১ কার্তিক বাউল সম্রাট লালন শাহের বার্ষিকী বা তিরোধান দিবস উপলক্ষে পাঁচ দিনের অনুষ্ঠান আয়োজনের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। অনুষ্ঠান ঘিরে নেয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

এদিকে লালন মৃত্যুবাষিকী উপলক্ষে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে নারী-পুরুষ সমন্বয়ে দলে দলে ভক্ত-অনুসারীরা সাঁইজির টানে ইতোমধ্যেই ছেঁউড়িয়ায় এসে পৌঁছেছেন। অনুষ্ঠান শুরু হবে প্রতিদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে। চলবে রাতভর।

বিশিষ্ট লালন গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, ‘বাউলগান হলো লোকায়ত বাঙালীর ভাব-মানসের জাতীয় সঙ্গীত। আর বাউল-সাধক লালন সাঁই ছিলেন সেই ভাবজগতের গানের রাজা, ‘বাঙলার বাউলের শিরোমণি’। বাউলগানের বিপুল লোক-প্রিয়তার মূলে তাঁর অবদান সর্বাধিক ও সর্বশ্রেষ্ঠ। আজ প্রায় দুই শতাব্দীকাল তাঁর গান বাঙালীর মরমী-মানসের অধ্যাত্ম-ক্ষুধা ও রস-তৃষ্ণা মিটিয়ে আসছে।

বাউল সম্রাট লালন শাহের জীবনকাহিনী বড়ই রহস্যাবৃত। তাঁর জন্মস্থান ও ধর্মগত জাতি-পরিচয় নিয়ে প-িতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। লালন নিজেও তাঁর আত্মপরিচয় সম্পর্কে ছিলেন নীরব ও নিষ্পৃহ। লালন গবেষকদের মতে, লালন শাহ সংসারিক জীবনে ছিলেন নিঃসন্তান। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে না পারলেও তিনি ছিলেন স্বশিক্ষায় শিক্ষিত। তীর্থভ্রমণে বেরিয়ে একবার বসন্ত রোগে আক্রান্ত হন তিনি। তাঁর সঙ্গীরা এ সময় তাঁকে ত্যাগ করে চলে যায়। পরে এক মুসলমানের আশ্রয়ে জীবন ফিরে পাওয়ার পর লালন সাধক ফকির হন। গবেষক কারও কারও মতে, লালন শাহ ১৭৭৪ সালে বর্তমান কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়ারা গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত হিন্দু কায়েস্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মাধবকর ও মাতার নাম পদ্মাবতী। ভিন্নমতে, লালন ঝিনাইদহের হরিনাকু-ু থানার হরিশপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলমান পরিবারে ১৭৭৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম দরিবুল্লাহ দেওয়ান ও মাতার নাম আমিনা খাতুন। আর্থিক সঙ্কটের কারণে লালন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করতে পারেননি। শৈশবে পিতৃবিয়োগ হওয়ায় অল্প বয়সেই তাঁর ওপর সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে। ইতোমধ্যে তিনি বিয়ে করেন। সাংসারিক চিন্তা ও আত্মীয়স্বজনের বৈরিতা তাঁকে বিশেষভাবে পীড়িত করে। পরে তিনি মা ও স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়ারা গ্রামের দাসপাড়ায় বসবাস শুরু করেন। গবেষকদের মতে, লালন অন্যান্য সঙ্গীসহ ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে মতান্তরে নবদ্বীপে গঙ্গাস্নান বা তীর্থ ভ্রমণ শেষে নৌকাযোগে বাড়ি ফেরার পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যায়। এদিকে এক মুসলমান মহিলা পানি নিতে এসে নদী তীরে মুমূর্ষু অবস্থায় লালনকে পড়ে থাকতে দেখে তাঁকে উদ্ধার করে ঘরে নিয়ে আসেন। মহিলার আন্তরিক সেবাযতেœ লালন আরোগ্য লাভ করেন। লালন তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে তাঁর মতবাদ প্রচার করতেন। এ সময় তিনি মুখে মুখে গান রচনা করতেন আর তাঁর শিষ্যরা সেগুলো খাতায় লিখে রাখতেন। লিপিকারের কাজ করতেন দুই শিষ্য মানিক শাহ ওরফে মানিক প-িত ও মনিরুদ্দিন শাহ। লালন শাহ প্রায় এক হাজার অমর সঙ্গীত রচনা করে গেছেন। ফকির লালন শাহ ১৮২৩ সালে ছেঁউড়িয়ায় আঁখড়া স্থাপনের পর থেকে জীবনের অন্তিমকাল পর্যন্ত সেখানেই সার্বক্ষণিক থাকতেন। লালন শাহ ১২৯৭ সালের ১ কার্তিক (ইংরেজী ১৬ অক্টোবর ১৮৯০ সাল) শুক্রবার ভোর ৫টায় ১১৬ বছর বয়সে নিজ আঁখড়ায় দেহত্যাগ করেন। পরে তাঁর সাধন-ভজনের তীর্থস্থান ছেঁউড়িয়ার ঘরেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। লালন আজ নেই। কিন্তু রয়ে গেছে তাঁর অমর সৃষ্টি। যার মধ্য দিয়ে তিনি বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন বাঙালীর মরমী মানসপটে।