১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নোবেলে নারীর জয়জয়কার

  • আবু সুফিয়ান কবির

সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ-বেলারুশের এই নারী মূলত একজন সাংবাদিক। তিনি ২০১৫ সালে সাহিত্যিক হিসেবে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পান সাধারণত গল্পকার-ঔপন্যাসিক-নাট্যকার কিংবা কবিরা। নন-ফিকশন ঘরানায় লিখে নোবেল পাওয়ার নজির খুব কম। সেই ১৯৫৩ সালে দুটি বিশ^যুদ্ধের ইতিহাসের জন্য নোবেল পেয়েছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল। সাংবাদিকদের নোবেল পাওয়ার ঘটনাটি আরও বিরল। ১৯৫৪ সালের নোবেলজয়ী মার্কিন ঔপন্যাসিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে প্রথম জীবনে সাংবাদিকতা করেছেন।

উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, কবিতা, প্রবন্ধ সব কিছুই সাহিত্যের অংশ। সাহিত্যের সঙ্গে আছে সৃজন ও কল্পনার গভীর সংযোগ। এর সঙ্গে থাকে ভাষার মাধুর্য, জীবনবোধের সম্পর্ক। যুগ যুগ ধরে সাহিত্য মানুষের জীবনকে বিকশিত করেছে, করেছে উজ্জীবিত। সাহিত্যের আবেদন বিশ্বকণ্ঠকে জাগ্রত করেছে। ফলে মানুষ মুক্তমনা হয়েছে। এই কারণে সাহিত্যের কোন সীমারেখা নেই। কিন্তু সাংবাদিকতাকে নিছক ছোট বা বড় একটি ঘটনার বর্ণনা দিতে হয়। যা বস্তুনিষ্ঠ, সত্য ও বাস্তবধর্মী। সেভেতলানা আলেক্সিয়েভচ -এর লেখাকে এই সময়ের মানবজীবনের ‘ক্লেশ আর সাহসিকতার যুগলবন্দী’ অভিহিত করেছে সুইডিশ এ্যাকাডেমি।

বেলারুশের ৬৭ বছর বয়সী সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ গত বছরও এ পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন। রয়্যাল সুইডিশ এ্যাকাডেমি গত ৮ অক্টোবর সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ১১২তম লেখক হিসেবে তার নাম ঘোষণা করে। তিনি হলেন-চতুর্দশ নারী, যিনি সাহিত্যের নোবেল পেলেন। সবচেয়ে মজার বিষয়, এই ১৪ জনের মধ্যে ২১ শতাব্দীর বিগত ১৫ বছরে ৫ নারী এই পুরস্কার পেয়েছেন। আর গত (২০০৭ থেকে ২০১৫) ৯ বছরে ৪ জন নারী সাহিত্যে নেবেল পুরস্কার লাভ করেন। পরিসংখ্যান বলে, ২১ শতাব্দীতে নারী সাহিত্যিকদের একটা জয়জয়কার চলছে। ২০০৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন অস্ট্রিয়ার নারী এলফ্রিডে ইয়েলিনেক। তিনি মূলত নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। ২০০৭ পেয়েছেন ব্রিটিশ নারী ডোরিস লেসিং। তিনি মূলত ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, কবি, জীবনীলেখক ও ছোটগল্পকার। ২০০৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন রোমানিয়ান বংশদ্ভূত জার্মান ঔপন্যাসিক, কবি ও প্রবন্ধকার র্হেটা মুয়েলার। ২০১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন কানাডার বিশিষ্ট ছোটগল্পকার এ্যালিস মানরো। সর্বশেষ ২০১৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন বেলারুশের সাংবাদিক সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ।

১৯৪৮ সালে ইউক্রেনের স্ট্যানিস্লাভ শহরে জন্ম সেভেতলানা অলেক্সিয়েভিচের। বাবা বেলারুশের লোক, মা উইক্রেনের মেয়ে। বেলারুশের মিনস্ক শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। সেভেতলানা ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অব মিনস্কে সাংবাদিকতায় পড়ালেখা করেন। কয়েকটা খবরের কাগজে সাংবাদিকতা করার পর চাকরি পান নামজাদা ‘নোমান’ পত্রিকায়। সেই পত্রিকাতেই এক ধারাবাহিক লেখার জন্য শুরু করেন স্বামী হারানো নারী, সন্তান হারানো পিতামাতা ও পিতা হারানো ছোট শিশুদের সাক্ষাতকার নেয়া। তাদের মুখে যা শুনেছেন তা লিখে ফেলেছেন চটপট। কোন কাটছাঁট না করেই। প্রথমেই জুটল পত্রিকার সম্পাদকের দাঁত খিঁচুনি- কী সব ছাইপাশ লেখেন! বানিয়ে বানিয়ে, সব আষাঢ়ের গল্পো!’ তার পর এসে পড়ল খোদ সরকারের কোপ। প্রাক- পেরেস্ত্রইকা সোভিয়েত রাশিয়ায় এমন কিছু বিষয় নিয়ে মুখ খোলা সম্ভব নয়, যা মাদার রাশিয়ার মহান ভাবমূর্তি কোনভাবে ক্ষুণœ করতে পারে। রুশ মেয়েরা তো দয়ালু মা, ¯েœহশীলা স্ত্রী, কোমল স্বভাবের বোন। তারা কী করে রাইফেল তুলে নেয়? বেয়নেট ঢুকিয়ে দেয় শত্রুর পেটে? ফলে যা হওয়ার, হলো। প্রাণ বাঁচাতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হেলেন সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ। উদ্বাস্তু লেখক-শিল্পীদের পাশে দাঁড়ায় এমন এক সংস্থার সাহায্যে মাতৃভূমি ছাড়েন তিনি। নিজ জন্মভূমি ছেড়ে পরের এগারো বছর কিছুদিন প্যারিস, তো কিছুদিন বার্লিন। আরও থাকতে হয়েছে ইতালি, ফ্রান্স ও সুইডেনে। ততদিনে অবশ্য রাশিয়ায় পটপরিবর্তন হয়েছে। ক্রেমলিনে গ্লাসনন্তের খোলা হাওয়া রয়েছে। যুদ্ধের বিধবাদের নিয়ে সেভেতলানার যে বইয়ের পান্ডুলিপি ফিরিয়ে দিত একের পর এক প্রকাশক, ১৯৮৫ সালে সেই বই ছাপা হয়ে যাওয়ার পর ২০ লাখ কপি বিক্রি হয়ে গিয়েছিল শুধু রুশ ভাষাতেই। ‘ওয়ারস আওয়াম্যনলি ফেসেস’ বা ‘যুদ্ধের অমেয়েলি মুখ’ নামের সেই বইটি সন্বন্ধে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘যন্ত্রণা আর লড়াইয়ে আশ্চর্য এক আখ্যান’।

পরের বইও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের ‘বেঁচে থাকাদের নিয়ে’- ‘দ্য লাস্ট উইটনেসেস’। এবার শিশুদের কথা তাদেরই মুখে। পরের বইও শিশুদের নিয়ে। নাম ‘জিনকি বয়েজ’। সেটা কি জিঙ্ক, অর্থাৎ দস্তা। এই দক্ষতার কফিনে করেই আফগানিস্তান থেকে রুশ সেনাদের দেহ ফেরত আসত। যে সব সেনার অধিকাংশ নেহায়েতই কিশোর। ছেলেহারা রুশ মা-বাবাদের সঙ্গে কথা বলেই এই বই লিখেছেন শে^তলানা।

সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ একজন ইংরেজী অনুবাদক হিসেবে সমধিক পরিচিত। চেরনোবিলের ভয়াবহ পারমাণবিক দুর্ঘটনার ওপর লেখা ‘ভয়েস ফরম চেরনোবিল’ এবং সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের প্রাথমিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে লেখা ‘বয়েজ ইন জিংক’ ইংরেজীতে অনুবাদ করেন তিনি।

১৯৮৭ সালে কবি প্রাবন্ধিক জোসেফ রোদস্কির পর আরেক রুশভাষী লেখক সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ প্রায় ২৮ বছরের ব্যবধানে এবারে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হলেন। কয়েক বছর যাবতই তার নামটি সংক্ষিপ্ত তালিকায় আন্তর্ভুক্ত ছিল। আন্তুর্জাতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন রাশিয়ার আবির্ভাব লক্ষণীয়ভাবে প্রবল ও আশাব্যঞ্জক হয়ে উঠছে, ঠিক তখনই রুশভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য সেভেতলানা নিয়ে এলেন এই গৌরবের পুরস্কার।

এর আগে সেভেতলানা সুইডেনের ‘পেন প্রাইজ’ পুরস্কার লাভ করেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে তাঁর হাতে পুরস্কার বাবদ ৮০ লাখ ক্রোনারস (প্রায় ৮ কোটি টাকা) তুলে দেয়া হবে।

সেভেতলানা তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন, ‘নভেল-কারাস’। বহুস্বরের উপন্যাস। রক্ত-মাংসের মানুষের সঙ্গে কথা বলে তাঁর লেখা সাজান। অতীতের ইতিহাস জানতে হলে বুঝতে হলে অবশ্যই প্রত্যক্ষদশীদের মুখের কথাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পুঁথি-নির্ভর ইতিহাসের পাশেই তাই স্বমহিমায় জায়গা করে নিয়েছে, ‘ওয়াল হিস্ট্রি’। সেভেতলানা পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে নোবেল কমিটি প্রমাণ করল, মৌখিক ইতিহাস যখন কোন বিশেষ অবস্থা, ঘটনা বা সময়ের বর্ণনা দেয় সেটাও হয়ে যেতে পারে জীবনস্পর্শী কাব্য। এখন কি লিখছেন ৬৭ বছর বয়সী সেভেতলানা, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘এতদিন যুদ্ধ নিয়ে লিখেছি। এবার লিখছি প্রেমের গল্প। আমার, আপনার মতো সাধারণ মানুষের ভালবাসার কাহিনী’। আমরাও চাই সেভেতলানার ভালবাসার শব্দমালা ছড়িয়ে পড়ুক সারা পৃথিবীজুড়ে।