১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

নারীর প্রতিপক্ষ নারী!

  • রহিমা আক্তার মৌ

‘তুমি আমার ছেলেকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দাও। আমি আমার ছেলেকে আবার বিয়ে করাবো। তোমাকে নিয়ে আমার সন্তান সংসার করতে পারবে না। তোমার কোলের এই সন্তানও আমার সন্তানের ঔরসজাত নয়।’ (পুত্রবধূকে তার শাশুড়ি ফরিদা বেওয়া কথাগুলো বলছেন)।

‘এই নতুন জামাগুলো এখন পরার দরকার নেই। আমি যখন বলব তখন পরবি। কাল যখন সবাই উত্তরা বেড়াতে যাবে, তখন বাসায় কেউ থাকবে না। সে সময় নতুন জামা পরবি। আর এত সাজগোজ কিসের। কাজ করতে আসছিস কাজ করবি। তুই কি মেমসাহেব হবি নাকি?’ (গৃহকর্মীর উদ্দেশে গৃহকর্এীর বয়ান)।

‘আপনি তাড়তাড়ি তৈরি হয়ে নিন। আশ্রম থেকে ওরা ঘণ্টাখানেকের মাঝে চলে আসবে। ওরা আবার দেরি করবে না।’ ‘না, বৌমা খোকা এলে আমি যাব।’ ‘তা হবে না। আপনাকে এখনই যেতে হবে। আপনার জন্যই আজ আমার অফিস ছুটি নিতে হয়েছে, অন্যদিন ছুটি নিতে পারব না। আপনার খোকাকে বলব ওখানে গিয়ে দেখা করতে। এসব ন্যাকামি ও ঝামেলা আর ভাল লাগে না।’ (শাশুড়িকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো নিয়ে ছেলের বৌ কথাগুলো বলছে)।

ওপরের তিনটি ছিল নারীদেরই বাক্য। কেউ শাশুড়ি, কেউ ছেলের বৌ আবার কেউ গৃহকর্ত্রী। সম্পর্কের দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও একটা দিক দিয়ে বিরাট এক মিল। ওরা সবাই নারী। বয়সের হয়ত ব্যবধান আছে। আজ যে কন্যাশিশু কাল সে নারী। তবে কেন নারী হয়ে নারীর বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান। শুধু এমন ক্ষেত্রগুলোতেই নয়। সেলিমা রহমানের বিয়ে হয়েছে ৭ বছর। এখনও কোন সন্তান জন্ম দিতে পারেননি। সন্তান না হওয়ার জন্য স্বামীর দিকে আঙ্গুল না উঠলেও উঠছে স্ত্রীর দিকে। তাও আবার পরিবারের নারীর আঙ্গুল। সেলিমার শাশুড়ি মমতাজ বেগম। মমতাজ উঠতে-বসতে বৌকে কথা শোনায়Ñ ‘আমার ছেলের বংশরক্ষা করবে কে? আমি ছেলেকে আবার বিয়ে করাব।’ কিন্তু একবারও মমতাজ বেগম ভাবেন না যে, ওনার ছেলের বাবা হওয়ার ক্ষমতা আছে তো? তা না ভাবলেও এটা বার বার ভাবেন যে, ছেলেকে বিয়ে করালেই ঘরে সন্তান আসবে, বংশরক্ষা হবে। এক পর্যায়ে যখন সেলিমার কোন দোষ ধরা পড়েনি, তখন সে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে। বিধির বিধান। রহমান সাহেব নিজের পরীক্ষা করাতে চান না। কিন্তু বাধ্য হয়ে করানো হলো। রিপোর্ট বলছে রহমান সাহেবের চিকিৎসা প্রয়োজন। এখানেও একজন নারীর শত্রু একজন নারী। সেলিমা স্বামীর পরীক্ষা করানোর কথা না বললে হয়ত এই ঘরে আসত আরও একটি নারী, যে কিনা হতো রহমান সাহেবের স্ত্রী। তারপর এক সময় তাকেও দোষারোপ করা হতো। নারীর বিরুদ্ধে দাঁড়াত নারী।

এই তো সেদিনের কথা, সুফিয়া বেগম ঢাকায় থাকেন। গ্রাম থেকে কল এসেছে। ভাতিজা ফোন করে বলে, ‘ফুফু আপনার বৌমার কন্যাসন্তান হয়েছে, দোয়া করবেন। সুফিয়া বেগম উত্তরে বলেন, ‘মেয়ে হয়েছে বলে কি তোর মন খারাপ? মন খারাপ করবি না। মেয়ে ভাল। দেখবি পরেরবার বৌমার ছেলে হবে।’ সামান্য এই বাক্য দুটিতে বা আলাপে কী প্রকাশ পায়? সুফিয়া বেগমের ভাতিজার মন খারাপ না হলেও একজন নারী হিসেবে একটা কন্যাসন্তানের জন্মের বিষয়ে একটু অন্য রকম কথা বলছেন। আর ভাতিজার মন খারাপ বলে তাকে সান্ত¡নার ভাষা তো এটা হতে পারে না যে, ‘মেয়ে ভাল বা পরে দেখবি বৌমার ছেলে হবে।’ সত্যিই যদি পরেরবার ছেলে না হয়ে মেয়ে হয়, তাহলে সুফিয়া তার ভাতিজাকে কী বলে সান্ত¡না দেবেন? অথচ এই সুফিয়াও একদিন একটি কন্যাসন্তান হয়ে জন্ম নিয়েছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের কোলে!

দেশে নারী নির্যাতন একটি কালো অধ্যায়। পুরুষ দ্বারা নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে। প্রতি বছর নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন সরকারী, বেসরকারীভাবে এর হিসেব করা হয় কোন্ বছর কতজন নারী নির্যাতিত হয়েছে। কোন্ মাসে কয়টি এমনকি কোন্ সরকারের আমলে বেশি বা কম হয়েছে। একদল অন্য দলের প্রতি রাগ-ক্ষোভ প্রকাশ করার জন্য সংসদ কিংবা সমাবেশস্থলে হিসেবগুলো তুলে ধরে, অন্যদের নাজেহাল করার জন্য তীক্ষè উক্তি ছুড়ে মারে। গণমাধ্যমে তা আবার লাল-কালো অক্ষরে ছাপা হয়। আমরা ধিক্কার জানাই সমাজকে, সমাজের মানুষগুলোকে আর নির্যাতনের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের। কিন্তু একদিককে ঘায়েল করতে গিয়ে অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রশ্ন অগোচরে থেকে যায়। ২০১০ সালে ঢাকা শহরে রিতা নামে এক মা তার দুই সন্তানকে নিয়ে আত্মহত্যা করে। রিতার শশুর ছিলেন গণমাধ্যমের একজন কর্মকর্তা। দেশে যখন বিষয়টা নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয় তখন রিতার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদকে গ্রেফতার করা হয়। রিতার ওপর নির্যাতন চলছিল দীর্ঘদিন। নির্যাতনের প্রধান ব্যক্তি তার স্বামী। কিন্তু নির্মম পরিহাস, ওর শাশুড়ি বৌমার পক্ষে কথা না বলে ছেলের সব অপকর্মের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা প্ররোক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। একজন নারী হয়ে নারীর বিরুদ্ধে নয়, নারী হয়ে সততার বিরুদ্ধে বা সত্যের বিরুদ্ধে ছিলেন তিনি। গণমাধ্যমে আসার কারণ হয়ত রিতার শাশুড়িকে আমরা দোষারোপ করছি। অবশ্য আদালত থেকে উনি মুক্তি পান।

কেন এমন হচ্ছে? কেন নারীর বিরুদ্ধে নারীর অবস্থান? কেন নারীর শত্রু নারী? এ বিষয়ে সাধারণ জনগণের দাবি, এখনও আমাদের পরিবার ও সমাজ পুরুষকেন্দ্রিক। বেশিরভাগ পুুরুষই পরিবারের আর্থিক জোগানের সঙ্গে জড়িত। তাদের বেশিরভাগ ব্যস্ত থাকতে হয় টাকা রোজগারের ধান্ধায়। নারীরা বাসায় থাকে। সংসারের কাজের ফাঁকে অফিসিয়াল ফাইলপত্র নিয়ে ভাবতে হয় না। এতে করে নারীরাই নারীকে নিয়ে সমালোচনা করে। আবার যেহেতু পুরুষের আয়ে ঘর-সংসার চলে, সেহেতু ঘরে স্বামী বা ছেলের পক্ষে কথা বললে হয়ত তার কাছে গুরুত্বটা বেশি পাবে। যে নারী অন্যায়ের পক্ষ নেবে বা কথা বলবে তাকে বিভিন্ন সিদ্ধান্তে গুরুত্ব দেবে এমন ধারণার কারণেই তারা নারী হয়ে নারীর বিপক্ষ অবস্থানে থাকে। কেন নারীর বিরুদ্ধে নারী- এমন প্রশ্ন নিয়ে কথা হয় বিভিন্ন পেশাদার ব্যক্তির সঙ্গে। তাদের মতে উঠে আসে বিভিন্ন দিকÑ

দিলরুবা আলম পেশায় একজন স্কুলশিক্ষিকা। তিনি বলেন, ‘আসলে নারী নির্যাতনের জন্য আমরা প্রত্যক্ষভাবে পুরুষকে দোষারোপ করি, এটা মিথ্যা নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে এসব নির্যাতনের সঙ্গে নারীরাও জড়িত। এর কারণ দু-এক কথায় বলা মুশকিল। এখনও আমাদের দেশ-সমাজ পুরুষতান্ত্রিকভাবে চলছে। নারীদের অনেক উন্নতি হলেও পরিবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করার মতো পরিবেশ হয়নি। অন্যদিকে অনেক নারী আছে যারা নিজের যোগ্যতায় পরিবারের দায়িত্ব নিলেও পরে তাদের আবার বৈষম্যতার মাঝে পড়তে হয়। নারী হওয়ার বৈষম্য। আবার নিজের কর্মক্ষেত্রে নারী হিসেবে তাকে অন্য চোখে দেখছে। প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছামতো নারীকর্মীদের চলতে বলে, না করলে চাকরি হারাতে বসে। নারীর উন্নয়ন হলেও নারীর চলার পথ এখনও সুগম হয়নি। বাধ্যতামূলক পোশাক এবং চলন-বলনের জন্য নারীকে পরিবারের কথা শুনতে হয়। এতে করে নারী নিজেও বাধাপ্রাপ্ত হয়, অন্য নারীদেরও সেই বাধার মাঝে জড়িয়ে নেয়।’

নারী হয়ে নারীর ক্ষতি সম্পর্কে অনেকটাই ভিন্ন ধরনের মতামত দেন লেখক মুহিব খান। ‘নারী হয়ে নারীর ক্ষতি করবেন না’ শিরোনামে মুহিব খানের একটা লেখায় তিনি লেখেন, নারীকে উত্তপ্ত কড়াই থেকে মুক্তির ভুল পথে চালিত করে জ্বলন্ত চুলায় নিয়ে ফেলার পেছনে হাত আছে কিছু দুষ্ট নারীরও, যারা নারী নেত্রী সেজে বসে সরল খেটে খাওয়া অসহায় নারীদের নিয়েই স্বার্থসিদ্ধির ব্যবসায় মেতে আছেন।’ তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশের এক শ্রেণীর নারী নেত্রীদের জন্যই নারীর ওপর নির্যাতন বেড়ে যাচ্ছে। তার সঙ্গে একমত পোষণ করি। নারী আন্দোলন হচ্ছে ঠিকই, নারীদের স্বার্থে নয়। বরং সমাজের এক শ্রেণীর নারীদের স্বার্থে আন্দোলন হচ্ছে। আন্দোলনে থাকছে সাধারণ নারীরা আর ফায়দা ওঠাচ্ছে বিশেষ নারীরা। লেখার প্রথমেই যেসব নারী চরিত্রগুলোর কথা উঠে আসে, তারা নিজেদের স্বার্থে অন্য নারীকে নির্যাতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এগুলো চার দেয়ালের ভেতরের কথা। কিন্তু প্রতিটি পর্যায়ের অনেক অংশেই এমন অবস্থা রয়েছে। নারীরাই নারীর প্রতিপক্ষ হচ্ছে, কখনও নিজের স্বার্থে কখনও গোপন উদ্দেশ্যকে আদায় করতে। এসব বন্ধ হওয়া দরকার। সত্য ও সত্যের পক্ষে থাকা দরকার নারীদের।