২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল রহস্যের হাতছানি

  • মাহবুব রেজা

এই পৃথিবীতে রয়েছে নানা রহস্যজনক স্থান। এসব স্থানের রহস্য কখনও কখনও মানুষের কাছে অজানাই থেকে যায়। মানুষও কৌতূহল ভরে এসব রহস্যের উদ্ঘাটন করতে চায়। কোন কোন ক্ষেত্রে সফল হয় আবার কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যর্থ। এমনই এক রহস্যের নাম বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। এই নামটার ভেতরই লুকিয়ে আছে রাজ্যির যত রহস্য। দিনের পর দিন এই রহস্য আরও ঘন হচ্ছে। বারমুডার এই রহস্য থেকে জন্ম নিয়েছে কত গল্প। কত সিনেমা। কত উপকথা। নতুন নতুন রূপকথা। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্যের নেপথ্যে রয়েছে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। রয়েছে মানুষের বিশ্বাস।

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অঞ্চলের নাম বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। জাহাজ এবং বিমান চলাচলের একটি রুট এটি। কিন্তু অবাক করা কাণ্ড হলো বিমান কিংবা জাহাজ প্রমোদতরী বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলাচলের সময় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যায়। এই নিখোঁজ হওয়ার পেছনে রয়েছে রহস্য।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিমান, বিশাল বিশাল জাহাজের কোন সন্ধান আর পাওয়া যায় না। এমনকি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিমান, জাহাজ উদ্ধারের জন্য যারা গিয়েছে তারাও বারমুডার অতল গভীরে তলিয়ে গেছে সবাইকে অবাক করে দিয়ে। কিন্তু কী কারণে, কেন এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়া? বছরের পর বছর ধরে গবেষক বিজ্ঞানীরা এর অনুসন্ধান করছেন।

ডেভিলস ট্রায়াঙ্গল হলো বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের অপর নাম। ডেভিল ট্রায়াঙ্গলের বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায় শয়তানের ত্রিকোণ। বিশ্বের মানচিত্রে এর অবস্থানটি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এর উত্তর কোণে বারমুডা, দক্ষিণ কোণে পুয়ের্তো রিকোর সান জুয়ান এবং পশ্চিম কোণে ফ্লোরিডার মিয়ামি। এ তিনটি স্থানের মধ্যবর্তী অংশকে বলা হয় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। আর এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গলেই বেশ কিছু ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। সংঘটিত হয়েছে আরও অস্বাভাবিক রহস্যময় ঘটনা।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের কয়েকটি ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। ৪ মার্চ, ১৯১৮। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার জি. ডব্লিউ. ওউরলের নেতৃত্বে ৩০৯ জন নাবিকসহ ইউএসএস সাইক্লোপস নামক যুদ্ধজাহাজ বারবাডোজ দ্বীপ থেকে যাত্রা করে। কিন্তু বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে প্রবেশের পর ঘটল এক মারাত্মক ঘটনা। জাহাজ আর নাবিকদের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাইক্লোপসের মতো আরও দুটি মার্কিন জাহাজ নিখোঁজ হয় ।

১৯১৯ সালে ক্যারোল এ. ডিএরিং নামের পাঁচ মাস্তুলের পালের জাহাজটি একটি বালুচরে আটকে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। এই জাহাজের একজনকেও কিন্তু পাওয়া যায়নি। ১৯৪৫ সালের পাঁচ ডিসেম্বর ফ্লাইট-১৯ নামক একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিখোঁজ হয় এ অঞ্চলে। হারিয়ে যাওয়া বিমানটির খোঁজে বের হয় অন্য আরও একটি বিমান কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই বিমানটিও আর ফিরে আসেনি।

১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি আজোর থেকে বারমুডা যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় ব্রিটিশ সাউথ এয়ারওয়েজের যাত্রীবাহী বিমান জি-এএইচএন পি স্টার টাইগার। পরের বছর একই মাসে বারমুডা থেকে কিংস্টোন যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয় একই কোম্পানির আরেকটি যাত্রীবাহী বিমান স্টার এরিয়েল। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে পুয়ের্তো রিকো থেকে মিয়ামি যাওয়ার পথে ৩২ জন যাত্রীসহ নিখোঁজ হয় ডগলাস ডিসি-৩ নামক বিমান।

এসব বিমান, জাহাজ বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার পর গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিল। তারা একটু নড়েচড়ে বসলেন। নেমে পড়লেন রহস্যোদ্ঘাটনে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে ঘিরে গবেষক আর বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম চলতে থাকল। গবেষণা করতে গিয়ে তারা জানতে পারলেন এ মহাসাগরের তলদেশে আরেকটি মহাদেশ ডুবে আছে। গবেষকরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে, ডুবে যাওয়া মহাদেশেরই কোন বিশেষ শক্তি গ্রাস করছে এ অঞ্চলে আসা জাহাজ ও বিমানগুলোকে।

বিজ্ঞানীরা আরও একটি তথ্য পেলেন তা হলোÑ এ অঞ্চলে একটি বিশেষ চৌম্বকীয় শক্তির প্রভাব রয়েছে যা দিক নির্ণায়ক যন্ত্রে ত্রুটির সৃষ্টি করে নাবিককে বিভ্রান্ত করতে পারে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোন অলৌকিক শক্তির প্রভাবে নয়, বেশকিছু কারণেই এ সব দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার কারণ দেখিয়ে বলেছেন, উত্তর আটলান্টিকের একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী স্রোতের নাম গল্ফ স্রোত। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে ২.৫ মিটার। যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোন প্রয়োজনে বিমানকে ওয়াটার ল্যান্ডিং (জরুরী প্রয়োজনে উড়োজাহাজকে কোন জলরাশির ওপর অবতরণ করানো) করালে এ তীব্র স্রোতের আঘাতে বিমানটি প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে স্রোতের সঙ্গে থাকা ভাসমান বস্তুর আঘাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিমানটি

বিজ্ঞানীরা আরও বলছেন, দুর্ঘটনা সংঘটিত হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে এ অঞ্চলে সৃষ্ট প্রচণ্ড শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। এ ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে বাতাসের গতিবেগ এত দ্রুত বেড়ে যায় যে, কোন ধরনের প্রস্তুতি নেয়ারও সুযোগ থাকে না। ১৯৮৬ সালে এমন একটি দুর্ঘটনায় ডুবে গিয়েছিল প্রাইড অব বাল্টিমোর নামের এক নৌজাহাজ। এই জাহাজের বেঁচে যাওয়া একজন নাবিকের মতে, বাতাস হঠাৎ করে ঘণ্টায় ২০ মাইল থেকে প্রায় ৯০ মাইলে উন্নীত হয়, যা সামলানো জাহাজটির পক্ষে একেবারেই অসম্ভব ছিল। প্রচ- বাতাসের গতিতে মুহূর্তে জাহাজটি পানির নিচে তলিয়ে যায়।

বিজ্ঞানীরা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে যত গবেষণা করেন ততই তাদের সামনে খুলে যায় রহস্যের নতুন কিনারা। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল বিজ্ঞানীদের কাছে জ্বলন্ত এক রহস্যের নামÑ যে রহস্যের কোন কূলকিনারা নেই।

উনিশ শতক পেরিয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরু হয়েছে কিন্তু বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্যের কোন কমতি ছিল নেই। বিজ্ঞানী ও গবেষকরা বলছেন, দিন যতই যাচ্ছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের প্রতি মানুষের কৌতূহল আর আগ্রহ বেড়েই চলেছে।