২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ নির্মম বাস্তবের প্রতিভাষ্যকার

  • মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

বিশ্বজুড়ে বর্তমান সময়ে যেসব লেখকের বই বহুল পঠিত এবং একই সঙ্গে যেসব লেখক নিভৃতচারী তাঁদের মধ্যে সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ অন্যতম মুখ। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এ কথাও স্বীকার্য যে, আলেক্সিয়েভিচের নোবেল প্রাপ্তির পূর্বে আমাদের মধ্যে খুব কমসংখ্যক লোকই তাঁর এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে অবগত ছিলেন। তাছাড়া এ নোবেল জয়ী লেখিকার ন্যূনতম একটি বইও বাংলা অনূদিত রয়েছে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদিও আলেক্সিয়েভিচের বইগুলো বহুদেশে অনূদিত হয়েছে এবং তাঁর গ্রন্থ ‘ধিৎ’ং ঁহড়িসধহষু ভধপব’ প্রায় দুই মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। নানা প্রেক্ষিতে আমাদের দেশে আলেক্সিয়েভিচ বর্তমান সময়ের নতুন মুখ এবং এ পরিচয়ের সূত্রপাত নোবেল প্রাপ্তির মাধ্যমে ত্বরান্বিত ও ব্যাপৃত। এক্ষেত্রে অন্যসব স্বাভাবিক স্রোতের মতোই তাঁর বই, গল্প ও সাক্ষাতকারগুলো অতিসত্বর বাংলায় ভাষান্তর হবে এবং এর ইতিবাচক ও গুরুত্বপূর্ণ দিক এই যে, আমরা আলেক্সিয়েভিচের রচনার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ ও নিবিড় হবার সুযোগ লাভ করব।

বেলারুশের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ নোবেল জয় করার পর এই প্রশ্ন বাংলা ভাষাভাষী পাঠক মহলে উঠছে যে, লেখনশৈলীর কোন বৈচিত্র্যের মাধ্যমে হারুকি মুরাকামি, ফিলিপ রথ, নগুয়ি ওয়া থিয়োঙ্গো প্রমুখ বহুল আলোচিত সাহিত্যিকদের পেছনে ফেলে আলেক্সিয়েভিচ এ সম্মানজনক পুরস্কার পেলেন? অবশ্য সুইডিশ একাডেমিই এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের জানিয়েছে এভাবে, ‘আলেক্সিয়েভিচের রচনার বিশেষত্বÑ তাঁর গদ্য সমকালীন যাতনা আর সাহসিকতার সৌধ।’ সাহিত্যে নোবেল জয়ী হিসেবে আলেক্সিয়েভিচের নাম ঘোষণার সময় সুইডিশ একাডেমির প্রধান সারা দানিউস বলেছেন, ‘আলেক্সিয়েভিচ তাঁর অনন্য সাধারণ লিখনশৈলীর মাধ্যমে সতর্কভাবে বাছাই করা কিছু কণ্ঠের যে কোলাজ রচনা করেছেন, তা পুরো একটি যুগ সম্পর্কে আমাদের বোধের জগৎকে নিয়ে গেছে আরও গভীরে।’ দানিউসের বক্তব্যের বিশেষভাবে এই কথাটুকু লক্ষণীয় : আলেক্সিয়েভিচ ‘বোধের জগৎকে নিয়ে গেছে আরও গভীরে’। এটা থেকে স্পষ্ট যে, আলেক্সিয়েভিচ তাঁর রচনা মাধ্যমে পাঠক অনুভূতিকে চরমভাবে স্পর্শকাতর করতে সক্ষম হয়েছেন। অনুভূতির গভীরে যাওয়া তাঁর রচনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ আলেক্সিয়েভিচের সাহিত্য রচনার প্রেক্ষাপটও ‘অনুভূতিকে’ পাঠক হৃদয়ে যথাযথভাবে উন্মুক্ত করার দাবি রাখে। লেখার বিষয়ের সঙ্গে শব্দবন্ধনী যদি অনুভূতির ওপর সর্বশক্তিতে করাঘাত করতে ব্যর্থ হতো তা হলে হয়তো আলেক্সিয়েভিচের চিন্তা ও সৃষ্টিকর্ম বর্তমানের মতো হৃদয়গ্রাহী পর্যায়ে পৌঁছতে পারতো না। আলেক্সিয়েভিচের বিশেষত্ব ও লেখার শক্তি এই যে, তাঁর লেখা কেবল ঘটনার ঘনঘটা নয় রবং ‘তাঁর গদ্য ধারণ করে আছে মানুষের আবেগের ইতিহাস’।

দুই.

বনফুল আমাদের জানিয়েছেন তাঁর মানুষ দেখার ‘বিচিত্র অভিজ্ঞতা’। তিনি আমাদের জানিয়েছেন, তিনি বিচিত্র মানুষ ও তার কর্মকা-কে নিবিড়ভাবে অবলোকন করেছেন এবং সেই বোধ ও উপলব্ধি তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর গল্পে। বনফুল মানুষ ও মানুষের আচরণকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেও সেভেতলানা আলেক্সিয়েভিচ মানুষকে দেখেছেন একটু ভিন্নভাবে। বনফুল মানুষের অনুভূতির ব্যাখ্যায় যে কারও ভালো-মন্দ বলেছেন ঠিকই, কিন্তু আলেক্সিয়েভিচ বিশেষত দুর্ভাগ্যপীড়িত ও নির্মম ঘটনার শিকার হওয়া মানুষের অনুভূতি বিধৃত করেছেন। তুলে ধরেছেন এমনসব মানুষের স্বপ্নের মিছিল, জ্বলন্ত হৃদয়, হতাশার খরস্রোত ও নির্দয় সময়ের প্রতিধ্বনি। নিজের লেখা সম্পর্কে আলেক্সিয়েভিচ তাঁর বিভিন্ন বইতে বলেছেন, ‘আমি মানুষের অনুভূতির এক ইতিহাস লিখেছি, মানুষ যা ভাবে, যা বোঝে এবং ঘটনা ঘটে যাবার পর তারা যা যা মনে রাখে, তাদের বিশ্বাস, অবিশ্বাস, তাদের কল্পনা, আশা-আকাক্সক্ষা এবং ভয় আর অভিজ্ঞতাÑ এমন রাশি রাশি বাস্তব চিত্রের সত্যিকার চেহারা আবিষ্কার বা কল্পনা করা সত্যিই দুরূহ একটি কাজ।... টানা বিশ বছর প্রামাণিক উপাদান নিয়ে কাজ করা এবং এসবের ওপর ভিত্তি করে বই রচনার পর সুস্পষ্টভাবে আমি ঘোষণা করি যে, শিল্প মানুষের অনেক কিছুই অনুধাবনে অক্ষম।’ যদিও মানুষের অনুভূতির প্রকৃত চেহারা আবিষ্কার দুরূহ ও দুঃসাধ্য কাজ, তবুও একথা বলা যায় এবং আলেক্সিয়েভিচের রচনা আমাদের একথা বলতে বাধ্য করে যে, এই অনুভূতির বর্ণনায়, বিন্দুর কাছাকাছি পৌঁছার মতো দুরূহ কাজটি তিনি অনেকাংশেই করতে সক্ষম হয়েছে।

এই নিবন্ধে আলেক্সিয়েভিচের লেখার বিষয়বস্তুর দিকে এবার দৃষ্টি দেয়া যাক। আলেক্সিয়েভিচতে যুদ্ধ, ঐতিহাসিক বিপর্যয় ও আগ্রাসনের ইতিহাসকে তাঁর লেখার বিষয়বস্তু বানিয়েছেন। এসব ইতিহাসকে হৃদয়গ্রাহী করতে এবং ভুক্তভোগীদের অনুভূতিকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে তিনি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত হাজার হাজার নারী-পুরুষের সাক্ষাতকার নিয়েছেন, তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, প্রেম ও জীবন জানতে চেয়েছেন। তিনি বিষয়বস্তু হিসেবে ‘নির্মম ঘটনা’কে বেছে নিলেও তাতে কেবল দুঃসময়েরই বর্ণনা দেননি। সঙ্গে সঙ্গে বলেছেন প্রাপ্তি-অপ্রান্তি, স্বপ্ন ও সম্ভাবনার গল্প। একটি গোছানো, স্বপ্নবহুল জীবনকে দুঃসময়ের পথে হাঁটতে দেখি আলেক্সিয়েভিচের লেখায়। ফলে তাঁর চরিত্রগুলোর এই দুঃসময়ে সব হারানোর যে ব্যথা, পাঠক হৃদয়ে তা আরও বহুগুণ দুঃসহ বেদনা হয়ে বাজে। ‘ভুক্তভোগী মানুষের’ বর্ণনার যথার্থ রূপায়ণ সম্পর্কে আলেক্সিয়েভিচের নিজের বক্তব্য এখানে বলা যেতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘আমি মানুষের কাছে সমাজবাদের কথা জানতে চাই না। জানতে চাই তাদের ভালোবাসার কথা, ঈর্ষার কথা, কৈশোর-বার্ধক্যের দিনগুলোর কথা। সঙ্গীত, নৃত্য আর চুল বাঁধার কায়দার কথা। বিচ্ছিন্ন এই সব কথামালা বিলুপ্ত এক জীবন পথের বিবরণ দেয়। ভয়াবহ বিপর্যয়ের একটি ঘটনাকে এক কাঠামোতে নিয়ে আসার, একটি গল্প বলার এটাই একমাত্র পথ।’ আলেক্সিয়েভিচ অবশ্য তাঁর চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সোভিয়েত ও সোভিয়েত পরবর্তী মানুষদের ‘মানসপট’কে শিল্প মাধুর্য দিয়েই একটি কাঠামোতে এনে গল্প বলতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁর লেখার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈশিষ্ট্য হলোÑ তাঁর চরিত্রের স্বপ্নগুলো যেমন আমাদের ছোঁয়া, তেমনি চরিত্রের দুঃখ-যাতনাও আমাদের মনে-মগজে সঞ্চারিত হয়, আমরা আঁতকে উঠি, দিক্ভোলা হই। দুঃসময়ের প্রতিভাষ্যকার আলেক্সিয়েভিচ কীভাবে তাঁর গদ্যে হাহাকার ও বিষণœ সময়কে তুলে ধরেছেন এবং বর্ণনা দিয়েছেন বাস্তবের কাছাকাছি করে, সেটি তাঁর রচনা থেকে পাঠ করে অনুধাবন করা যাক। ‘ভয়েসেস অব চেরনোবিল’ বইয়ের পারমাণবিক বিপর্যয়ের কবলে পড়া ভাসেনকোর দুঃসময়ের বর্ণনা লেখক দিয়েছেন এভাবে : ‘ও (ভাসেনকো) দ্রুত বদলে যেতে লাগলো। প্রতিদিন আমি ওকে নতুন মানুষ রূপে দেখতে থাকলাম। মুখের ভেতরে, জিহ্বায়, চেয়ালে, প্রথমে ছোট ছোট ক্ষতের মতো, তারপর বড় হতে লাগলো। ত্বকের ওপরে আলাদা স্তরের মতো, কিছুটা সাদা পর্দার মতো। ওর মুখের রং, শরীরের রং নীল, লাল, ধূসর, বাদামী হতে লাগল। সে অবস্থা বর্ণনা করা যায় না। সে অবস্থা লিখে প্রকাশ করা যায় না। সে অবস্থা থেকে রেহাই পাবার মতোও নয়। আমার রেহাই হয়েছিল শুধু সে অবস্থা দ্রুত ঘটে গিয়েছিল বলে। কেননা ভাবার সময় ছিল না। কাঁদার সময়ও ছিল না। চৌদ্দ দিন, মাত্র চৌদ্দ দিনে একটা মানুষ মরে যায়।’ (দুলাল আল মনসুরের অনুবাদ থেকে)।

তিন.

সারা দানিউস বলেছিলেন, ‘আলেক্সিয়েভিচ মানুষের এমন এক ইতিহাস আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, যার সঙ্গে আমাদের পরিচয় নেই খুব একটা।’ অনালোকিত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়কে নিজের শৈলী ও শিল্পসত্তা দ্বারা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়ার পরিশ্রমী প্রয়াসই সম্ভবত আলেক্সিয়েভিচকে অন্যদের চাইতে আলাদা ও নিপুণ করেছে। নন-ফিকশন এই লেখক বাস্তবতার পীড়নাঘাত, দুঃসহ যাপনকে বারবার এঁকেছেন, বারবার বন্দী করেছেন অক্ষরের ফ্রেমে। তিনি মনে করেন ‘মানসিক এবং আবেগী সম্ভাব্যতাকে’ সম্পূর্ণ অনুধাবন করতে হবে এবং এর মধ্যদিয়েই ‘একাধারে লেখক, প্রতিবেদক, সমাজবিদ, মনস্তাত্ত্বিক এবং প্রচারক’ হওয়া সম্ভব। নির্মম, দুঃসহ জীবনের প্রতিভাষ্যকার আলেক্সিয়েভিচের নোবেল প্রাপ্তিতে সোভিয়েতের সেইসব লাল মানুষেরা সার্থক হয়ে উঠেছে, তারা বেদনাদহনসহ ইতিহাস ফুঁড়ে উঠে এসেছে বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে- আর এমন প্রাপ্তি লেখকের সার্থকতার ও দীর্ঘ পথচলার অফুরান প্রণোদনা।