২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শারদ উৎসবে যাত্রাগান

  • মিলন কান্তি দে

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেবী দুর্গাকে আনন্দময়ী বলে অভিহিত করেছেন। কারণ আনন্দের মাঝেই আছে জীবনের পরিপূর্ণতা। অসুর বিনাশিনীরূপে দশভূজা দেবী দুর্গার আগমন ঘটে প্রতি বছর, প্রতি শরতে। ঐতিহ্যগত ধারায় এই শারদোৎসব থেকে শুরু হয় যাত্রাশিল্পের প্রতিটি নতুন মৌসুম। পূজার সপ্তমীর দিন থেকে চৈত্র্যের বাসন্তী পূজা পর্যন্ত-এ ছয় মাস এক একটি যাত্রা মৌসুমের নির্ধারিত সময়সীমা। তবে প্রচলিত বিধান মতে, মৌসুমের প্রস্তুতি চলে রথযাত্রা থেকে। যাত্রাদলের আধিকারীকরা আষাঢ়ের রথযাত্রায় যার যার বাড়িঘরে মঙ্গলঘট বসান। পূজা, কীর্তন ইত্যাদির আয়োজন করেন। সামনের মৌসুমটি যাতে ভাল যায়, সেই অভিলাষ জানিয়ে নাট দেবতার কাছে প্রার্থনা করা হয়। আমন্ত্রিত শিল্পীদের মিষ্টিমুখ করানো, তাদের হাতে ‘শুভক্ষণ’ (সাইনিং মানি) দেয়া, নতুন যাত্রাপালার মহড়া, কোথায় কোথায় যাত্রানুষ্ঠানের আয়োজন হবে- এসবই হচ্ছে রথের দিনে দল মালিকদের ক্রিয়াকর্ম। এসব আনুষ্ঠানিকতাকে যাত্রার লোকজনরা বলে থাকেন- ‘মাঙ্গলিক ঘটস্থাপন উৎসব।’

রথযাত্রার প্রসঙ্গ দেখা যায় শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনী গ্রন্থে। ঊনিশ শতকে বিখ্যাত আধিকারীক ও পালাকারদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গোবিন্দ অধিকারী (১৭৯৮-১৮৭০)। তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল নবরসের মধ্য দিয়ে সমকালীন ভক্তিমূলক গানের পটভূমিতে কৃষ্ণযাত্রার পরিবেশনা। গোবিন্দ অধিকারীর কৃষ্ণযাত্রার সমঝদার শ্রোতা ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্রের পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বাড়িতে যাত্রা গানের আয়োজন হতো। বঙ্কিম জীবনীতে তারই কিছুটা উল্লেখ:

‘রথযাত্রার সময় সেখানে বসতো আটদিনের যাত্রার আসর। তার মধ্যে গোবিন্দ’র যাত্রাই হতো চারদিন। মতি রায়ের দু’দিন, আর বাকি দু’দিন নির্দিষ্ট ছিল অন্যান্য দলের জন্য।’

আষাঢ়ে ঘট বসানোর পর থেকে আশ্বিনে পূজার আগ পর্যন্ত সময়কালকে বলা হয় যাত্রার নতুন মৌসুমের প্রস্তুতি পর্ব। শ্রাবণ মাসের মধ্যে শিল্পীচুক্তির পালা সংগ্রহ, নতুন পালা নির্বাচন, নতুন সাজ সরঞ্জামাদি সংগ্রহ ইত্যাদি কাজগুলো শেষ করে ভাদ্র মাসে দলগুলো উঠে যায় মহড়া বাড়িতে। এক দেড় মাস দিনে-রাতে সমানে অভিনয় ও নৃত্যগীতের মহড়া চলে। তারপর পূজার বায়না নিয়ে দলগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে, পূজা-ম-পে। এক সময়, সেই ব্রিটিশ আমলে- এমনকি স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশে খুব ঘটা করে উৎসবের আমেজে দুর্গাপূজায় যাত্রাগানের আসর বসতো বৃহত্তর সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানে। বড় বড় দলগুলোর মধ্যে কার আগে কে বাগানে যাবে- এ নিয়ে তুমুল প্রতিযোগিতা হতো।

অবিভক্ত বঙ্গদেশে, ’৪৭ উত্তর পূর্ব পাকিস্তানে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ’৮০-র দশক পর্যন্ত শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রধান বিনোদনই ছিল যাত্রাগান। সেকালে বিভিন্ন পূজা ম-পে আলাদা যাত্রার আসর বানানো হতো। সন্ধ্যারাতির পর শুরু হতো পালা, চলতো রাতভর। যাত্রাপালাসম্রাট ব্রজেন্দ্র কুমার দে (১৯০৭-১৯৭৬) দুর্গাপূজায় যাত্রাগান বিষয়ে তার স্মৃতি কথায় লিখেছেন:

‘সন্ধ্যাবেলা পালা আরম্ভ হতো। শেষ হতো ভোর বেলায়, কাক ডাকলে।... পালাগুলো ছিল অত্যধিক দীর্ঘ। কেউ বক্তৃতা আরম্ভ করলে সহজে ছাড়ত না।’

অসুর শক্তি সংহার করে সাম্য সম্প্রীতি আর আনন্দের বন্যা বইয়ে দিতেই ধরাধামে দেবীর আগমন। তাই পূজার তিন দিন পর দেবীর বিদায় মুহূর্তে শোক-দুঃখে কাতর হয়ে পড়ে ভক্তরা। এই ভাবাবেগের ওপর বেশ কিছু গান আছে যাত্রাপালায়। বিসর্জনের আগে যাত্রাদলের উঠতি ছেলেরা সখি সেজে এগুলো গাইত। এমনি একটি জনপ্রিয় গান ছিল-

‘পার হয়ে নবমী, এসেছে দশমী বিসর্জন হবে প্রতিমা

ভোলানাথ এসে রয়েছে দাঁড়ায়ে কৈলাসে যাবে গৌরী মা।’

পরে এ গানটি কয়েকটি যাত্রাপালায় যুক্ত হয়।

দুর্গাপূজায় যাত্রাগান আমাদের এক গৌরবময় ঐতিহ্য। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসীর মামুনের ‘দুর্গাপূজা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়: বিগত শতাব্দীর ৪০ দশকে মহাসমারোহে দুর্গাপূজা হতো ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা ও গৌরীপুর জমিদার বাড়িতে। পূজার প্রধান আকর্ষণ ছিল যাত্রা। সপ্তমী থেকে নবমী এই তিনদিন মন্দির প্রাঙ্গণে বসতো যাত্রার আসর। দেশীয় দলের পাশাপাশি কলকাতার দলগুলোকেও এখানে বায়না করে আনা হতো। বর্তমান লেখক ’৬০-এর দশকে দেখেছেন রাজবাড়ি জেলার রামদিয়া ও পার্শ্ববর্তী বহরপুর গ্রামে প্রতি বছর ঘটা করে যাত্রা মঞ্চস্থ হতো দুর্গাপূজায়। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিমল সাহার তত্ত্বাবধানে যাত্রা প্রদর্শনী খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল রামদিয়া গ্রামে।

ঢাকা শহরে কারওয়ান বাজারের কাছে পালপাড়া নামে একটি গ্রাম ছিল। বারোয়ারি দুর্গাপূজা হতো প্রাণবল্লভ পালের বাড়িতে। দিনের বেলা বাজানো হতো নির্মলেন্দু লাহিড়ির কণ্ঠে সিরাজউদ্দৌলার সেই রেকর্ড আর রাতভর চলতো যাত্রাপালা। প্রবীণ যাত্রা শিল্পীদের কাছে এখনও স্মৃতিময় হয়ে আছে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের আরপি সাহার পূজা বাড়ির কথা। ’৬০-এর দশকে এখানে বায়না করা হতো চট্টগ্রামের বাবুল অপেরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জয়দুর্গা ও ভোলানাথ অপেরা, ঝালকাঠির নাথ কোম্পানী এবং ময়মনসিংহের নবরঞ্জন অপেরাকে। এগুলো তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের এক একটি বিখ্যাত যাত্রাদল। ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের বছরে বিপ্লবী পালা ‘একটি পয়সা’র প্রথম মঞ্চায়ন হয় আরপি সাহার পূজা বাড়িতে। শুধু দুর্গাপূজার জন্যেই সেকালে কয়েকটি পালা নির্ধারিত ছিল। যেমন : ‘দেবী দুর্গা’, ‘মহিষাসুর বধ’, ‘দক্ষযজ্ঞ’, ‘মহীয়সী কৈকেয়ী’, ‘রাবণ বধ’, ‘রামের বনবাস’ ও ‘রাজা হরিশ্চন্দ্র।’ এ তালিকার বাইরেও ১৯৪২ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন পূজা ম-পে যেসব যাত্রাপালার প্রথম মঞ্চায়ন হয় তার একটি বিবরণ এরকম : রঞ্জন অপেরার রাজনন্দিনী, নট্ট কোম্পানীর আকালের দেশ, বাঙালি, সত্যনারায়ণ অপেরার গাঁয়ের মেয়ে, বাসন্তী অপেরার সোহরাব-রুস্তম, জয়দুর্গা অপেরার সাধক রামপ্রসাদ, বাবুল অপেরার রাহুগ্রাস, মা ও ছেলে, গীতশ্রী অপেরার লোহার জাল, নিউ বাবুল অপেরার রাজ সন্ন্যাসী ও নবরঞ্জন অপেরার বাগদত্তা। সিলেটের বিভিন্ন চা বাগানে প্রতি বছর দুর্গাপূজায় যাত্রা গানের যে রমরমা আসর বসতো, কালে কালে তা অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে।

দুর্গাপূজায় যাত্রাগানের ঐতিহ্য ও আবহ স্পর্শ করেছে আমাদের বাংলা সাহিত্যকেও। প্রথম উপন্যাস স্রষ্টা প্যারীচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুর (১৮১৪-১৮৮৩) ‘বিদ্যাসুন্দর’ যাত্রা প্রসঙ্গে এক রসাত্মক ঘটনার অবতারণা করেছেন এভাবে :

পূজার সময় নবমীর রাতে বাটীতে ‘বিদ্যাসুন্দরের’ যাত্রা হচ্ছে- ভবানীবাবু সমস্ত রাত্রি তাকিয়ার ওপর হাত দিয়া ঝিমুচ্ছেন- একবার বোধ হচ্ছে যেন পড়ে গেলেন। ভোরে তোপের শব্দে চমকিয়া উঠিলেন। চোখ খুলে চারিদিকে ফেল ২ করিয়া দেখতে ২ যাত্রাওয়ালাদের বললেন- ‘শালারা! সারারাত কেবল মালিণীর গান শুনায়ে হাড়ে হাড়ে জ্বালিয়েছিস- কৃষ্ণ বাহির কর- যাত্রাতে কৃষ্ণ নাই?’ ... নিকটস্থ দুই এক ব্যক্তি বলিল, ‘কৃষ্ণ এ সময় গোষ্ঠে গমন করিয়াছেন। এখন কৃষ্ণ কোথা পাওয়া যাইবে?’ (মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়)

যাত্রাগানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৪৯-১৯২৫) ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) দুই ভাই-ই ছিলেন শৈশব কৈশোরে নিয়মিত যাত্রাগানের ক্ষুদে দর্শক। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন স্মৃতিতে লেখক বসন্ত কুমার চট্টোপাধ্যায় লিখছেন :

‘পূজার তিনদিন বাড়ির উঠানে যাত্রা হইবে। ... সে কি আমোদ! বালক জ্যোতিরিন্দ্রনাথের যাত্রা শুনিবার জন্য চোখে ঘুম আসিত না। এগারোটা রাতে যেই ঢোলে চাটি পড়িল, অমনি বিছানা হইতে লাফাইয়া পড়িয়া একছুটে তিনি বাহিরের মজলিশে গিয়া হাজির হইতেন ... তখনকার শ্রেষ্ঠ যাত্রাওয়ালা নিমাইদাস এবং নিতাইদাসের যাত্রাই এ বাড়িতে হইত।’ যাত্রাগানের প্রতি রবীন্দ্রনাথের মুগ্ধতা আমরা দেখি তাঁর ‘আমার ছেলেবেলা’য়।

‘আমাদের দেশের যাত্রা আমার ভালো লাগে। যাত্রার অভিনয়ে দর্শক ও অভিনেতার মধ্যে একটা গুরুতর ব্যবধান নাই। পরস্পরের বিশ্বাস ও আনুকূল্যের প্রতি নির্ভর করিয়া কাজটা বেশ সহৃদয়তার সহিত সুসম্পন্ন হইয়া ওঠে। কাব্যরস, যেটা আসল জিনিস সেইটের সাহায্যে ফোয়ারার মতো চারিদিকে দর্শকদের পুলকিত চিত্তের উপর ছড়াইয়া পড়ে।’

সেকালে পূজাম-পের আশপাশে নদী ও খালের পাড়ে যাত্রাদলের বড় বড় নৌকাগুলো এসে লাগত। যাত্রার নৌকাগুলো দেখার জন্যে গাঁয়ের লোকজনদের ভিড় উপচে পড়ত। সে কী কৌতূহল! তারই বর্ণনা পাওয়া যায় দেশ পত্রিকার এক বিনোদন সংখ্যায় প্রবীণ যাত্রানট সূর্য কুমার দত্তের সাক্ষাৎকারে-

‘মূলত দলের প্রধান কার্যালয় ছিল নৌকা- যেন একটা গোটা বাড়ি। নৌকাগুলো এত পরিচিত ছিল যে, দেখেই বলা যেত কোন্ দলের কোন্টি। বছরের ৭/৮ মাস ওই ছিল যাত্রাশিল্পীদের ঘর-বাড়ি। এক মোকাম থেকে আর এক মোকামের পথে নদবক্ষে, নৌকাতেই চলত রিহার্সেল, গান বাজনা।’ (শতাব্দীর যাত্রাগান, দেশ, বিনোদন সংখ্যা ১৩৭৫)

পূজায় যাত্রাগানের অনেক ঘটনা এবং নানা ধরনের গল্পের স্বাদ পাওয়া যাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথায়।’ যাত্রামৌসুমের শুরু, যাত্রাদলগুলোর বায়না নিয়ে বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে উঠে এসেছে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মঞ্জরী অপেরা’ উপন্যাসে।

‘পূজার সময় থেকে মফস্বলে বের হয়ে এখানে-ওখানে, শহর, গ্রাম ফিরে গাওনা করে একবার ফেরে অগ্রহায়ণের শেষ। পৌষ মাসটা বিশ্রাম, তারপর মাঘ মাসে সরস্বতী পূজা থেকে এক নাগারে কলকাতা থেকে সারা বাংলাদেশ। ... ওখানে যত টাকা তত খাতির ভাল দলের। গাওনা করে সুখ।’

দুর্গাপূজা থেকে যাত্রার নতুন মৌসুমের সূচনা- এ কথা আগেই উল্লেখিত হয়েছে। সপ্তমীর দিনে শিল্পীদের নিয়ে নানা আনুষ্ঠানিকতায় মেতে থাকেন দলের মালিক-ম্যানেজাররা। ভক্তিমূলক গান ও নতুন পালা মঞ্চায়নের আয়োজন হয়। সপ্তমী থেকে শুরু হয় শিল্পীদের মাস মাইনা।

পরিতাপের বিষয় যে, দুর্গাপূজায় যাত্রাগান, নতুন মৌসুম, নতুন পালা- এগুলো ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। সে গৌরবময় ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে যাত্রাপালার অনুমতি প্রদানে প্রশাসনকে আন্তরিক ও দায়িত্ববান হতে হবে। সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে পৃষ্ঠপোষকতায়। সমস্ত প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতা থেকে কাটিয়ে উঠতে পারলেই শহর-বন্দর-গ্রামে আলোকিত হবে যাত্রামঞ্চ। দেবী দুর্গার নাটমন্দির থেকে আবার আগের মতোই ভেসে উঠবে যাত্রাগানের সুরমূর্ছনা- ‘পার হয়ে নবমী এসেছে দশমী ...।’