২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

বই ॥ জেনারেলরা নিজেদের স্বার্থে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে লাভবান হয়েছেন

  • মাহবুব রেজা

ঔপনেবেশিককাল থেকে সেনাবাহিনীর চেতনা ও আদর্শে, মন-মানসিকতায় এক ধরনের আধিপত্যবাদ ও একনায়কতান্ত্রিক মনোভাব প্রচ্ছন্নভাবে কাজ করেছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে শাসন ব্যবস্থায়। এরই ধারাবাহিকতায় এই উপমহাদেশে সেনাবাবিহনীর চিহ্নিত কিছু জেনারেল তাদের ন্যক্কারজনক ভূমিকা রেখে গণতন্ত্রের পূর্নগঠনও বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে নিজেরা শাসক সেজে বসে দেশ ও দেশের মানুষের সর্বনাশ নিশ্চিত করেছেন। শুধু তাই নয়, জেনারেলবেশী সেই সব শাসকেরা নিজেদের গণতন্ত্রের দোসর হিসেবেও জাহির করতে পিছপা হননি। গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করে এরা পরিকল্পিভাবে গণতন্ত্রের চরম ক্ষতি করতে ছাড়েননি। সময়ের হিসেবে এরা দশকের পর দশক রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে থাকলেও এক সময় গণমানুষের তীব্র প্রতিরোধ আর ধিক্কারে এরা খড়-কুটোর মতো ভেসে গেছে। ইতিহাস আমাদের সেই কথাই বলে।

খ্যাতিমান ইতিহাসিক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন’ বইতে সামরিক শাসকদের দীর্ঘ আখ্যানভাগ তুলে ধরেছেন। এই বইয়ে সামরিক শাসকদের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ক্ষমতার প্রতি এদের দুর্নিবার লোভ, কূটকৌশল, চারিত্রিক অসততা সর্বোপরি নীতি-নৈতিকাতার অন্তঃসারশূন্যতা প্রকটভাবে উঠে এসেছে। ১৯৫৮ সাল থেকে সওয়ার হওয়া সামরিক শাসন ও এর নায়কদের (!) পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ ধারাবাহিকভাবে বয়ান করে লেখক তাদের প্রতিকৃতি তৈরি করার প্রয়াস পেয়েছেন। ৫৮ সাল থেকে শুরু হওয়া সামরিক শাসন প্রায় একই চরিত্র ধারণ করেছে ওয়ান-ইলেভেনের মইন ইউ আহমেদের দু’বছর শাসনকাল পর্যন্ত। সামরিক শাসক হোক, সে পাকিস্তানের হোক, সে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের জেনারেল জিয়াউর রহমান তাতে কোন সমস্যা নেই। তাদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন, আদর্শ ও চেতনাগত সাদৃশ্য ও ক্ষমতার প্রতি লোলুভ দৃষ্টি সব যেন একই সুতায় গাঁথা। মনোজাগতিক মিল এদের মধ্যে অদ্ভুত রকমের এক ও অভিন্ন। সামরিক শাসকদের কাছে গণতন্ত্র, সংবিধান, দেশ, সাধারণ মানুষ কোনকিছুই ধর্তব্য নয়। তাদের একমাত্র ধ্যান ও লক্ষ্য কিভাবে ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করা যায়। যে কোন প্রকারে এসব করতে তাদের দক্ষতা অভাবনীয় রকমের। এরা একই সঙ্গে ধূর্ত এবং অভিনয়ক্ষমতায় ভরপুর। দেশের প্রথম সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমান তার সৈনিক জীবনের শুরু থেকেই ক্ষমতালিপ্সু ছিলেন তা তাকে নিয়ে রচিত বিভিন্ন বইপত্র, গবেষণা পাঠ করলেই পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কূটকৌশলে জিয়াউর রহমান এই উপমহাদেশের সেনা শাসকদের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করবেনÑ এতে কোন সন্দেহ নেই- তার নজির তিনি রেখে গেছেন।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট জাতির জনককে নির্মমভাবে হত্যা এবং তৎপরবর্তী সামরিক শাসন বাংলাদেশকে নিয়ে গেছে এক অন্ধকার দুনিয়ায়, যে দুনিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের গভীর যোগসাজশ রয়েছে। মূলত পাকিস্তানপন্থী সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট হত্যাকা- সংঘটিত হয়। এ হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধে পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনীর বি-টিম জয়ী হয়েছিল যাদের দীর্ঘ ছায়ার নিচে বাংলাদেশ চলে গিয়েছিল। দেশকে পাকিস্তারে পথে চালিত করার মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান শুরু করেছিলেন এক নতুন অধ্যায়ের। বাংলাদেশ বেতারের পরিবর্তে রেডিও বাংলাদেশ, জয় বাংলার পরিবর্তে বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, আমার সোনার বাংলার পরিবর্তে প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ সংবিধানে বিস্মিল্লাহির রাহ্মানির রাহিম সংযোজন থেকে শুরু করে দেশকে পাকিস্তানী ভাবধারায় পরিচালিত করতে যা যা করা দরকার জিয়াউর রহমান তার সব আয়োজনই করেছিলেন। রাজাকার পুনবার্সন, ইতিহাস বিকৃতি, রাজনীতিকদের দলে ভেড়ানো, মিথ্যা অপপ্রচার, রাজনীতিকে ডিফিকাল্ট করে দেয়াÑ সবই করেছিলেন। একজন সাধারণ মেজর থেকে অলৌকিকভাবে জেনারেল হয়ে যাওয়া জিয়াউর রহমানের এসব অপকর্মে সহায়তা করেছিলেন দিকভ্রান্ত কিছু রাজনীতিক। সুবিধার নানা ধরনের উচ্ছিষ্ট খাওয়া এ সব রাজনীতিককে জিয়া নিজের প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ব্যবহার করে সময় শেষে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করতে দ্বিধাবোধ করেননি। মূলত এ ধরনের নষ্ট দিকভ্রান্ত রাজনীতিকদের দিয়ে সেনাশাসক জিয়া দেশের রাজনীতিতে নিজের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন। জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে এরশাদ পরবর্তীতে নিজের ঐতিহ্য ধরে রেখেছিলেন একই কায়দায়।

॥ দুই ॥

“জিয়া বাংলা পড়তে পারতেন না। উর্দুতে বাংলা লিখতেন আর বাংলায় খালি ‘জিয়া’ নামটি সই করতে পারতেন। তার বক্তৃতা ছিল হাত-পা ছোড়া। যাদু মিয়াকে আবার ডেকে নেয়ার পর যাদু মিয়া দেখলেন এভাবে জননেতা হওয়া যাবে না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, জিয়া আর কী পারেন। জানা গেল, জিয়া ২০-৩০ মাইল হাঁটতে পারেন। যাদু মিয়া বললেন, প্রতিদিন জিয়া এভাবে গ্রামগঞ্জে হাঁটবেন। লোকের খোঁজখবর করবেন। এতে তার জনপ্রিয়তা বাড়বে।” প্রতিদিন জিয়া হাঁটতে লাগলেন। মিডিয়া তা প্রচার করতে লাগল। জিয়া এভাবে হাঁটার রাজনীতি প্রবর্তন করলেন (পৃষ্ঠা ৪২)।

সামরিক জান্তা জিয়াউর রহমানই প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে সেনাবাহিনীকে সঙ্গে করে প্রতারণা করে শুধু ক্ষমতা দখল নয়, নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি প্রক্রিয়া শুরু করার কৃতিত্বও তার। ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি তার রাজনৈতিক অভিযাত্রা তথা দল গঠন করে দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার নীলনক্সা বাস্তবায়ন করেছিলেন।

সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের হাঁটার রাজনীতি থেকে তার উত্তরসূরি এরশাদ সাইকেল চালানোর রাজনীতি শুরু করলেন। রাজনীতিকে গণমানুষের কাছ থেকে সাইকেলে তুলে এক অজানা গন্তব্যের দিকে নিয়ে গেলেন স্বৈরশাসক এরশাদ। জিয়া বাঙালী চেতনা ও আর্দশের বিপরীতে চালু করলেন এক ভিন্ন সংস্কৃতি, যে সংস্কৃতি মরুভূমি থেকে উঠে আসা। মুজিব কোটের পরিবর্তে সাফারি স্যুট ও কালো চশমার প্রচলন করলেন। শুধু তাই নয়, রাজনীতিতে কালো টাকার অবাধ প্রবাহ চালু করে জিয়াউর রহমান তৈরি করলেন ‘মানি ইজ নো প্রবলেম’ সংস্কৃতির।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে “বাংলাদেশি জেনারেলদের মন’ বইতে সামরিক শাসকদের চরিত্রকে বিশ্লেষণ করেছেন। বইয়ের ভূমিকায় তিনি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করতে ভোলেননি, “বাংলাদেশি জেনারেলদের মন বাংলাদেশের সেনাবহিনীর বিরুদ্ধে কোন বই নয়। এ বইয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে, স্বাধীন দেশে বসবাস করে বিজয়ী হয়ে তারা কেন পরাজিত বাহিনীর দর্শন ধারণ করেন। লক্ষণীয়, এখানে ২১ জন জেনারেলের মধ্যে ২০ জনই কাকুলে প্রশিক্ষিত। সুতরাং কাকুল যে তাদের মধ্যে পাকিস্তান প্রত্যয় গেঁথে দিয়েছিল তা অস্বীকারের উপায় কী! এখানে যে ২১ জনের (সংবাদপত্রের প্রতিবেদনসহ) রচনার ওপর ভিত্তি করে বইটি রচিত তাদের মধ্যে ১১ জন বিভিন্ন স্তরের জেনারেল। বাকিরাও জেনারেল হতে পারতেন যদি না স্বেচ্ছায় অবসর নিতেন বা বাধ্যতামূলক অবসরে যেতেন। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ও নয়জন উপাধিধারী। এরা সব সময় কোন না কোনভাবে ক্ষমতা ভোগ করেছেন, দেশ শাসন করেছেন, দেশের মৌল দর্শন বিনষ্টে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন, নিপীড়ন চালিয়েছেন, দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন। এদের রচনা পড়ে দেখবেন, পাকিস্তানবাদ থেকে এরা বেরোতে পারেননি। এই বই লেখা হয়েছে এ কারণে যে, সত্যের বা ইতিহাসের মুখোমুখি হতে হবে এবং তার মুখোমুখি হয়ে, আত্মসমালোচনা করে সঠিক পথ খুঁজে নিতে হবে। জেনারেলদের লেখা বইগুলো না পড়লে এদের মনের খোঁজ পেতাম না এবং কোন প্রায় চার দশক তারা পরাজিতদের অনুসরণ করেছে তার হদিস পেতাম না।”

‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন’ দু’পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্বে ‘নিজের দেশ জয় করা’ এবং দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে ‘জেনারেলদের বয়ান’। মূলত দু’পর্বে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশি জেনারেলদের মন-মানসিকতা। ক্ষমতার প্রতি এদের অন্ধ মোহ। গণতন্ত্রের প্রতি বিদ্বেষÑ সর্বোপরি সাধারণ মানুষ থেকে কিভাবে যোজন যোজন দূরত্ব বজায় রাখা যায়।

অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তাঁর বহুমাত্রিক রচনার ভেতর দিয়ে বাঙালী পাঠকের রুচি ও বোধকে যেমন ঋদ্ধ করেছেন তেমনি সত্য ইতিহাস জানানোর প্রতিও এক মহান দায়িত্ব পালন করেছেন। ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন’ বইটি তার এক ভিন্ন রকম রচনা, যার দ্বারা তিনি পৌঁছে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়।