২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

এলাকার কোটা ৪০ ॥ স্কুলে ভর্তি নীতিমালা হচ্ছে

  • আগামী নবেম্বরের ভর্তিতেই এ পরিবর্তন আসছে ;###;এলাকাভিত্তিক ভাল স্কুল গড়ার তাগিদ শিক্ষাবিদদের

বিভাষ বাড়ৈ ॥ এলাকার শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকারী ও বেসরকারী স্কুল ভর্তি নীতিমালায় আনা হচ্ছে বড় ধরনের পরিবর্তন। এলাকাভিত্তিক স্কুলিং নিয়ে বিভিন্ন মহলের দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা না গেলেও এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশের প্রেক্ষাপটে ভর্তি পদ্ধতিতে আনা হচ্ছে পরিবর্তন। সকল মহানগরী ও জেলা পর্যায়ের স্কুলে সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষার্থীদের ভর্তিতে ৪০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ করে নতুন এ নীতিমালা তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আগামী নবেম্বরে প্রথম শ্রেণী থেকে মাধ্যমিকের সকল শ্রেণীতেই শুরু হবে ভর্তি কার্যক্রম। তার আগেই নীতিমালায় পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে কাজও শুরু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতর (মাউশি)। এদিকে এর মধ্য দিয়ে এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের পথে একধাপ অগ্রগতি বললেও এলাকাভিত্তিক আরও ভাল স্কুল গড়ার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

জানা গেছে, এর আগে গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস এবং ১১ অক্টোবর বিশ্ব শিশু দিবস ও শিশু অধিকার সপ্তাহের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্কুলে শিশুদের ভর্তি নিয়ে কথা বলেছেন। দুই অনুষ্ঠানেই প্রধানমন্ত্রী স্কুল ভর্তি বিশেষত প্রথম শ্রেণীতে শিশুদের ভর্তিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন,স্কুলে যাওয়ার বয়স হলেই সব শিশু যাতে ভর্তি হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ক্লাস ওয়ানে ছাপানো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হবে কেন? যখনই একটা শিশুর ভর্তির বয়স হবে তখনই তাকে ভর্তি নিতে হবে। শিক্ষা তার মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, সে যদি ছাপানো প্রশ্নপত্র পড়ার মতো জ্ঞানই অর্জন করে থাকে, তাহলে আর তাকে পড়াবে কী স্কুলে? এলাকার শিক্ষার্থীর ভর্তি নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে এলাকায় যে বসবাস করে সে এলাকায় ভর্তি হওয়া তাদের অধিকার। সরাসরি তাদের আগে ভর্তি করিয়ে নিতে হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু, সমাজকল্যাণ এবং প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় অবশ্যই এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এটা যেন সমন্বয় করা হয়। তারা যেন লক্ষ্য রাখেন কাজগুলো ঠিক মতো হচ্ছে কিনা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা যেন পড়তে পারে সেজন্য শহরের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো উন্নত করা দরকার। আমি অনুরোধ করব, জরাজীর্ণ স্কুলগুলো মেরামত ও উন্নত করুন। ছেলেমেয়েরা তাদের প্রথম শিক্ষা পাড়ার স্কুল থেকেই নেবে, পাড়ার স্কুলেই ভর্তি হবে। শিক্ষা যেন শিশুর জন্য বোঝা না হয় বরং স্কুলগুলোতে ও পরিবারে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যেখানে তারা নিজেরা শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হবে এবং পড়াশোনায় উৎসাহ বোধ করবে। তবে পরীক্ষা ছাড়াই শিশুদের নিজ এলাকার স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এদিকে শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই বহুদিনের দাবি ছিল এলাকাভিত্তিক স্কুলিং সিস্টেম। যেখানে প্রতিটি এলাকার শিশু তাদের এলাকার প্রতিষ্ঠানেই ভর্তি হবে। তবে যেহেতু সারাদেশের স্কুলের মান সমান নয় এবং নানা কারণে গুটিকয় স্কুলের প্রতিই আগ্রহ বেশি থাকছে তাই স্কুলিং সিস্টেম চালু করা সম্ভব হয়নি।

যদিও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষত স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি ও এলাকাভিত্তিক স্কুলিং সিস্টেম চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেই। তারা বলছেন, দুর্বিষহ যানজট, অর্থ-শ্রম ও সময়ের অপচয়, মৌলিক শিক্ষায় ত্রুটি, ঝরেপড়া, শ্রেণী- বৈষম্যসহ জাতীয় বহু সমস্যার একক সমাধান হচ্ছে এলাকাভিত্তিক স্কুলিং।

প্রথম শ্রেণীতে যেহেতু ভর্তি পরীক্ষা এমনিতেই হয় না। প্রথম শ্রেণীর ভর্তি হয় লটারীর মাধ্যমে। তবে অনেক শিক্ষক সংগঠনেরই দাবি হচ্ছে, লটারীটাও যে হয় শিশুর সন্নিকটস্থ স্কুল ক্যাম্পাসেই। দূরবর্তী স্কুলে গিয়ে নয়। বারিধারার শিশুরা ভিকারুননিসা স্কুলে ধানম-ি শাখায় যাবে না, অথবা ধানম-ির শিশুরা বারিধারা বা সিদ্ধেশ্বরী ক্যাম্পাসে গিয়ে লটারীতে অংশ নেবে না। যার বাসা-বাড়ি স্কুলের যত কাছে, ভর্তির ক্ষেত্রেও নিকটস্থ স্কুলে তার তত অগ্রাধিকার থাকা উচিত। এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মাধ্যমে সময়-শ্রম ও অর্থের অপচয় বন্ধ হবে, অন্যদিকে বাবা-মার প্রতিদিনের টেনশন কমবে, গাড়ি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি কিংবা হৈহুল্লেড় থাকবে না, রাস্তায় যানজট ও দুর্ঘটনা কমবে, তাছাড়া তেল ও গাড়ি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ও খাতে জাতীয় অপচয় বন্ধ হবে।

এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের দাবি যারা করে আসছেন তারা এর বিভিন্ন সুবিধাও চিহ্নিত করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, এটি করা হলে স্কুলে যাতায়াতের জন্য যানবাহনের দরকার হবে না, ফলে যানজটও কমবে, সড়ক দুর্ঘটনাও হ্রাস পাবে। আবার যাতায়াত সঙ্কট ও যাতায়াত ব্যয় থাকবে না বলে এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পেছনে অভিভাবকের টেনশন থাকবে না এবং অর্থব্যয় হবে না। জাতীয় ক্ষেত্রে জ্বালানি তেল আমদানি ও গ্যাসের অপচয় রোধ হবে, জাতীয় অর্থের অপচয় কমবে। সন্তানের জন্য বাবা-মার অফিসের গাড়ি বরাদ্দের দুর্নীত বন্ধ হবে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের শ্রম ও সময়ের অপচয় রোধ হবে। দূরবর্তী স্থানে যাতায়াত করতে হবে না বলে ঝরে পড়ার হার কমবে। শিশুর জন্ম ও ক্রমবৃদ্ধির সঠিক ও যথাযথ পরিসংখ্যান রাখা সম্ভব হবে।

দুই মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্র বলছে, যেহেতু আমাদের মানসম্মত স্কুলের সংখ্যা বেশি নয়। কিংবা সারাদেশে একই মানের প্রতিষ্ঠান নেই তাই পুরোপুুরি এলাকাভিত্তিক স্কুলিং সিস্টেম চালু করা সম্ভব নয়। প্রতিযোগিতা ছাড়াই স্থানীয় শতভাগ শিক্ষার্থীকে তার এলাকার প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ দেয়াও অসম্ভব। কারণ যদি ভিকারুননিসা নূন বা মতিঝিল আইডিয়ালে সে সুযোগ দেয়া হয় তাহলে এলাকার হাজার হাজার শিশু ভর্তির জন্য চলে আসবে। অথচ প্রতিষ্ঠানের সেই আসনও থাকবে না। অন্যদিকে দেশের একটি ভাল প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ দেশের অন্য এলাকার কারও না থাকলে বাড়বে বৈষম্য। এছাড়া পছন্দের প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে অভিভাবকরা চলে যাবেন সন্তানকে নিয়ে বিদ্যালয়ে।

জানা গেছে, মূলত এসব সমস্যার কথা মাথায় নিয়েই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুসারে ভর্তি পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশকে সামনে রেখেই বিদ্যালয় এলাকার শিক্ষার্থীকে ভর্তিতে অগ্রাধিকার দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে যে যে সমস্যা সামনে চলে আসবে তা নিয়েই কাজ শুরু হয়েছে। এলাকার শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ শতাংশ কোটা রেখে ভর্তির পদ্ধতিতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এজন্য যত অনিয়ম হতে পারে যেমন কারা স্থানীয় নাগরিক? কতদিন আগে বাড়ি ভাড়া নিয়ে বসবাস করলে স্থানীয় বলে বিবেচিত হবেন, এলাকা বলতে কতদূরের নাগরিক হবেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ইতোমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ফহিমা খাতুন। তিনি উদ্যোগ সম্পর্কে জনকণ্ঠকে বলছিলেন, এলাকার শিশুদের ভর্তি নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রেক্ষিতে আমরা পরিবর্তন আনছি। আমরা চাই স্কুলে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভর্তির সময় স্থানীয় শিক্ষার্থীর জন্য ৪০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রাখতে। যেহেতু শহরের ভাল প্রতিষ্ঠানের দিকেই আগ্রহ থাকে শিক্ষার্থীর মা-বাবার। এখানেই প্রতিযোগিতাটা হয়। তাই আমরা মহানগরী ও জেলা শহরকে এই পদ্ধতির মধ্যে আনব। এখানে প্রতিষ্ঠানের আশাপাশের এলাকা বলতে আসলে কী বোঝানো হবে? এ প্রশ্নে মহাপরিচালক বলেন, এটা হবে আমাদের অধিদফতরের ক্যাচমেন্ট এড়িয়া। আমাদের শিক্ষা অঞ্চলেই হবে প্রতিষ্ঠানের এরিয়া।

কিন্তু কারা হবে এলাকাবাসী? এ প্রশ্নে দীর্ঘদিন শিক্ষার সঙ্গে জড়িত ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক এ চেয়ারম্যান বলছিলেন, ভাড়া থাকা বা নিজ বাসা সকলেই এলাকার। তবে যদি ভাড়া হলেই ভর্তির সুযোগ পায় তাহলে তো পাল্লা দিয়ে ভাল প্রতিষ্ঠানের আশপাশে ভাড়্ ানেয়া শুরু হয়ে যাবে। অনেকে সন্তানের ভর্তির কদিন আগে ঐ এলকায় বাসা ভাড়া নিয়ে ভর্তির জন্য আসবে।

এই সুযোগে অনেক প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বাসা ভাড়াও বাড়িয়ে দেবেন বাসার মালিকরা। তাই যখনতখন বাসা ভাড়া নিলেই হবে না। কতদিন আগে থেকে বসবাসকারী হবে কিংবা কি কি প্রমাণ লাগবে তার সবই আমরা আলোচনা করে চূড়ান্ত করব। আমরা চাই আগামী নবেম্বরে স্কুল ভর্তি কার্যক্রম শুরুর আগেই নীতিমালায় ৪০ শতাংশ কোটা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে; যাতে আগামী ভর্তির সময়েই এটি কার্যকর হয়।

এলাকাভিত্তিক ভাল স্কুল গড়ার তাগিদ শিক্ষাবিদদের ॥ এলাকাভিত্তিক ভাল স্কুল গড়ার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কারণে স্কুলগুলো গুণগত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা। শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সন্তানকে স্কুলে ভর্তির ক্ষেত্রে সব সময় অভিভাবকের পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকে হাতেগোনা কিছু স্কুল। এর ফলে এসব স্কুল ভাল শিক্ষার্থী বেছে নিয়ে একচেটিয়া ভাল ফল করার সুযোগ পাচ্ছে। অন্যদিকে, ভাল স্কুলের ওপর বাড়ছে ভর্তির চাপ। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এলাকাভিত্তিক ভাল স্কুল গড়ে তোলা জরুরী।

মূলত, নামীদামী স্কুল মানেই ভাল ফল এমন ধারণা থেকে অভিভাবকরা ছুটছেন বাছাই করা কিছু স্কুলের পেছনে। প্রতিবছরই এসব স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করার জন্য প্রতিযোগিতায় নামছেন অভিভাবকরা। যেভাবেই হোক তারা নিজ সন্তানের আসনটি নিশ্চিত করতে চান সেরা স্কুলগুলোর একটিতে। জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ একরামূল কবীর বলছিলেন, কিছু স্কুল বা প্রতিষ্ঠানের মান ভাল, কিন্তু সব প্রতিষ্ঠানের নয়। ফলে ভর্তির চাপটা ভাল প্রতিষ্ঠানের দিকেই যায়। আমাদের সারাদেশে ভাল মানের প্রতিষ্ঠান করা জরুরী। সরকার নানা উদ্যোগ নিচ্ছে। নিশ্চয়ই আস্তে আস্তে ভাল প্রতিষ্ঠান বাড়বে। তিনি বলেন, ভাল প্রতিষ্ঠান বাড়লে এলাকাভিত্তিক ভর্তির বিষয়টিও ভাল ফল দেবে। অভিভাবকদেরও দূরে গিয়ে সন্তানকে ভর্তির আগ্রহ থাকবে না।