১৯ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সমুদ্র ও আকাশপথে আসছে ভারতীয় মুদ্রা, সীমান্তপথে অস্ত্র

  • মুদ্রা পাচারের ঘটনায় ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে

মোয়াজ্জেমুল হক, চট্টগ্রাম অফিস ॥ চট্টগ্রাম বন্দরে আটক মাদক কোকেন ও বিদেশী মুদ্রার চাঞ্চল্যকর দুটি ঘটনা নিয়ে তদন্তকারী সংস্থাগুলো এখনও পর্যন্ত কোন কিছুই অগ্রগতি ঘটাতে পারেনি। দুটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। কিন্তু মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলছে দাবি করা হলেও মূলত তা থমকে আছে।

উল্লেখ্য, এ বন্দরে প্রথমবারের মতো ভোজ্য তেলের সঙ্গে তরল কোকেন আসার ঘটনা ধরা পড়ে। এরপরে ধরা পড়ে প্রায় পৌনে ৩ কোটি ভারতীয় রুপীর চালান। কোকেন এবং ভারতীয় রুপীর দুটি চালান এসেছে কন্টেনারযোগে। উভয় চালান এসেছে দুবাই থেকে। অবশ্য এরপর আকাশ পথে দুবাই থেকে আসা ভারতীয় রুপীর আরেকটি চালান ধরা পড়েছে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। রুপী আসার এ দুই চালানে মুদ্রার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি রুপী। প্রথম দফায় কোকেন চালানের ঘটনা নিয়ে বন্দর থানায় মামলা হয়েছে। তবে তা তদন্তের দায়িত্ব চলে গেছে সিআইডির হাতে।

এদিকে, কাস্টম, পুলিশ ও বন্দরের বিভিন্ন সূত্রের মতে, আন্তর্জাতিক চোরাচালানী ও মাফিয়া চক্র জঙ্গী অর্থায়নে ভারতীয় মুদ্রা দুবাই থেকে বাংলাদেশে প্রেরণ করেছে। এ অর্থ বাংলাদেশ হয়ে পুনরায় ভারতে চলে যাওয়ার গন্তব্য ছিল। কিন্তু ধরা পড়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় সর্বশেষ সিএমপি কমিশনার আবদুল জলিল ম-ল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুদ্রা পাচারের দুটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্টারপোলের সহায়তা চাওয়া হচ্ছে। মাত্র ২৩ দিনের ব্যবধানে ভারতীয় রুপীর দুটি চালান একটি সমুদ্রবন্দরে ও অপরটি বিমানবন্দরে আটক হওয়ার ঘটনার পর গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত সংস্থাগুলোর মনে সন্দেহের নানা দানা বেধেছে। তাদের কাছে বিভিন্ন সূত্রের খবর অনুযায়ী, ভারতীয় এই রুপী জঙ্গী অর্থায়নের সহায়তা হিসেবে এসেছিল। অতীতেও এ ধরনের রুপী এসেছে বলে খবর থাকলেও তা আটক করা সম্ভব হয়নি।

অপরদিকে, বলিভিয়া থেকে সূর্যমুখী ভোজ্য তেলের সঙ্গে ১০৭ ড্রামের মধ্যে দুটিতে মাদক কোকেন পাওয়া গেছে। কোকেনের ঘটনায় ভোজ্যতেল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক চট্টগ্রামের খান জাহান আলী লিমিটেডের নুর মোহাম্মদ ওই সময়ে দেশে থাকলেও পরবর্তীতে মামলার আসামি হওয়ার পর বর্তমানে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। তবে তার প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীও দিয়েছেন। ভোজ্য তেলের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানটি ছিল খান জাহান আলী লিমিটেডের অঙ্গ প্রতিষ্ঠাম প্রাইম হ্যাচারি। মূল হোতা হিসেবে এ পর্যন্ত চিহ্নিত করা হয়েছে ওই হ্যাচারির ব্যবস্থাপক গোলাম মোস্তফা সোহেল। তার সঙ্গে রয়েছেন আইটি বিশেষজ্ঞ মেহেদী আল। এছাড়া গার্মেন্টস পণ্য রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ম-ল গ্রুপের বাণিজ্যিক নির্বাহী আতিকুর রহমান খান, আবাসন ব্যবসায়ী মোস্তফা কামাল, শিপিং এজেন্ট কসকো বাংলাদেশ শিপিং লাইসেন্সের ব্যবস্থাপক একে আজাদ ও সাইফুল ইসলাম। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন মোস্তফা কামাল, গোলাম মোস্তফা সোহেল ও মেহেদী আলম। এরপরও মামলাটির তেমন কোন অগ্রগতি নেই। অথচ, চাঞ্চল্যকর কোকেন আটকের এ ঘটনাটি সারাদেশে সকল মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

অপরদিকে, পর পর দু’দফায় ভারতীয় রুপী বাংলাদেশে আটক হওয়ার ঘটনায় খোদ ভারত সরকার উদ্বিগ্ন। চট্টগ্রামে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। তাদের ধারণা অনুযায়ী, এসব রুপী নিয়মিতভাবে বিদেশ থেকে বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন বন্দর থেকে বাংলাদেশে আসে এবং পরবর্তীতে ভারতে প্রেরণ করা হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের ঘটনা হচ্ছে এ অর্থের অধিকাংশ জাল এবং তা মূলত জঙ্গী সংগঠনগুলোর কাছেই পৌঁছে দেয়া হয়। এর মূল গডফাদাররা সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন শহরে বসে এ কার্যক্রমে লিপ্ত। তাদের সন্দেহ ভারতীয় এ রুপী ছাপানো হয় ভিন্ন দেশে। স্পষ্ট করে নাম না বললেও আকারে ইঙ্গিতে জানান, তারা পাকিস্তানকে এর সঙ্গে জড়িত বলে মনে করেন।

এদিকে, আটককৃত এ মুদ্রা জাল কিনা তাও এখনও রিপোর্ট দেয়া হয়নি। এ কাজে এত দীর্ঘ সময় লাগার কথা নয়। এছাড়া কাদের মাধ্যমে ভারতীয় রুপীর এ দুটি চালান এসেছে তাও এখনও অনুদঘাটিত। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে এসেছে কন্টেনারযোগে। আর চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পাওয়া গেছে অয়্যার হাউসে। কারা এর প্রেরক এবং কারা এর গ্রহীতা সবই এখনও রহস্যময় হয়ে আছে।

এ দুটি ঘটনা ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে বিভিন্ন ধরনের ভারি অস্ত্র আটকের ঘটনা ঘটছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর ধারণা, অস্ত্র আসছে মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে পার্বত্য এলাকা দিয়ে। বিশেষ করে বান্দরবান অঞ্চল এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে। বাংলাদেশের সঙ্গে মিয়ানমারের যে সীমান্ত এলাকা রয়েছে এবং ওই এলাকার যে বিপুল পরিমাণ এলাকা অরক্ষিত রয়েছে তা দিয়ে মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো বাংলাদেশের অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে অস্ত্র বিক্রির কাজে জড়িত রয়েছে। যেহেতু দেশে জঙ্গী গ্রুপগুলোর তৎপরতা রয়েছে এবং এসব গ্রুপের অস্ত্রের চাহিদা রয়েছে সেক্ষেত্রে ভারি অস্ত্রের চালান বিভিন্ন পথে চলে আসছে দেশের অভ্যন্তরে। এসব ঘটনায় নিরাপত্তা বাহিনী সূত্রে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে, মূলত আরাকান আর্মির সঙ্গে জড়িত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের কাজে জড়িত। কারও কারও মতে, কিছু অস্ত্র ভারতের সীমানা অতিক্রম করে মিয়ানমারের সীমানা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। তবে অধিকাংশ অস্ত্র চীনের তৈরি। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের সীমান্ত থাকায় চীনা অস্ত্র সহজে মিলে যায় মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলোর কাছে। একদিকে তারা নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ব্যানারে অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। অতিসম্প্রতি বান্দরবানের থানছির বড় মদকে বিজিবির সঙ্গে আরাকান আর্মির গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় মিয়ানমারজুড়ে যৌথবাহিনীর টানা অভিযান চলে। সর্বশেষ রাঙ্গামাটির রাজস্থলী থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে আরাকান আর্মির সেকেন্ড ইন কমান্ড ডাঃ রেনিন সুয়ে। বাংলাদেশে অবস্থান করে এই আরাকান আর্মির নেতা দীর্ঘদিন যাবত অস্ত্রসহ অবৈধ নানা কর্মকা-ে জড়িত। বড় মদকের ঘটনার পর তার রাজস্থলীর বাস ভবন থেকে দুই কেয়ারটেকারসহ ৩ জনকে আটক করা হলেও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। সম্প্রতি তিনি ভারত থেকে পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। গত মঙ্গলবার রাতে এলাকার একটি নির্মাণাধীন মসজিদ থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়।