২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী যেন জীবন্ত রূপ পেয়েছে

রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী যেন জীবন্ত রূপ পেয়েছে
  • বাগেরহাটে ৪৫১ মূর্তি নিয়ে বৃহত্তম পুজোম-প

বাবুল সরদার

সাড়ে চার শ’ প্রতিমা নিয়ে বৃহত্তম শারদীয় দুর্গা মণ্ডপে বাগেরহাটের মৃৎশিল্পীরা এখন মহাব্যস্ত। তাদের চোখে ঘুম নেই। সময় নেই নাওয়া-খাওয়া। প্রস্তুতির শেষ দিকে এসে শিল্পীরা রং-তুলির আঁচড়ে নিপুণ কারুকাজ ফুটিয়ে তুলছেন প্রতিমায়। তাদের প্রাণান্ত চেষ্টা প্রতিটি প্রতিমাকে আরও কত আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। রামায়ণ, মহাভারত ও পৌরাণিক সব কাহিনীর পাশাপাশি সমাজ-সচেতনতার নানা দৃশ্যের মনোরম উপস্থাপন। বাহারি সাজসজ্জা আর ডিজিটাল লাইটিংয়ে প্রাণবন্ত করে তোলার কসরত চলে দিনরাত। এক কথায়, ভক্ত দর্শনার্থীদের বিমোহিত করে তোলার যেন সব আয়োজনই চলছে বাগেরহাটের হাকিমপুরের সিকদার বাড়ির দুর্গা পুজোর ম-পে। ব্যক্তি উদ্যোগে এ আয়োজন অনন্য। এখানে শারদীয় দুর্গোৎসব যেন নতুন মহিমায় আবির্ভূত হয়েছে। কৌতূহলী অসংখ্য নারী-পুরুষ এখনই এখানে আসতে শুরু করেছেন।

ধর্মপ্রাণ দুলাল ও রমা শিকদার দম্পতি ২০১০ সালে ১০১টি প্রতিমা নিয়ে এই মন্দিরে দুর্গা পুজো শুরু করেন। সময়ের পরিক্রমায় এ বছর এ মণ্ডপে স্থান পেয়েছে ৪৫১টি মূর্তি। পৃথক পৃথক মঞ্চ করে প্রতিমাগুলো স্থাপন করা হয়েছে। বিশাল মণ্ডপ প্রাঙ্গণের পাশে জলাধারে রাম-সীতা আর হনুমানজীর ৩২ ফুট উঁচু প্রতিকৃতি বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। হিন্দু ধর্মের সত্য, ত্রেতা, দাপর ও কলি যুগের বিভিন্ন সময়ের ধর্মীয়, পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষণীয় বিষয়ের মূর্তি। মূর্তি নির্মাণ, কারুকার্য ও সাজ-সজ্জায় বৈচিত্র্য এনে তাকে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়েছে। এখানে প্র্রতিমার নির্মাণশৈলী, বিভিন্ন দৃশ্যের বৈচিত্র্যতা, ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার অপূর্ব।

প্রধান মৃৎশিল্পী রাজবাড়ীর ভাস্কর কার্তিক শর্মা জানান, ২০১০ সাল থেকে এখানে প্রতিমা গড়ার কাজ করে আসছেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ১৫ জন মৃৎশিল্পী গত ছয় মাস ধরে এখানে এসে মূর্তি গড়ছেন। সাড়ে চার শ’ প্রতিমা নিয়ে এবার বৃহত্তর এ ম-প সাজানো হয়েছে। যার মধ্যে সতীর দেহত্যাগ, দক্ষযোগ্য, শিবপুরাণ, প্রহলাদ চরিত্র, নারদ, হনুমান, নবদুর্গা রয়েছে। এছাড়া এ বছর বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকছে পুকুরে হনুমানজির বিশাল মূর্তি।

সরেজমিন পূজা মন্দিরে গিয়ে দেখা গেছে, এখানে রামায়ণ ও মহাভারতের নানান কাহিনীর অবতারণা করা হয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজের অন্যায়, অবিচার ও কুসংস্কার দূর করার বিভিন্ন প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘আপনার শিশুকে স্কুলে পাঠান, বাল্যবিবাহ ও যৌতুক নিরোধ, সুন্দরবন সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপদ পানি পানে উদ্বুদ্ধকরণ, পরিবেশের সুরক্ষা ও বনায়ন’- ইত্যাদি আহ্বান জানিয়েও পুজোর প্যান্ডেলে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। আয়োজক লিটন শিকদার ও তার সহধর্মিণী পূজা শিকদার বলেন, সত্য, ত্রেতা, দাপর ও কলি যুগের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিস্থাপন করে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। বহু মূর্তি নিয়ে আঙ্গিক ও বৈচিত্র্যে অসাধারণ মন্দির দর্শন করে মানুষ উজ্জীবিত হবে।

মন্দিরের মূল প্রতিমার সামনের দিকে সার্বজনীন জ্ঞানের উৎস হিসেবে সমাজের সকল শ্রেণী ও পেশার মানুষকে উজ্জীবিত ও মহাজ্ঞানীদের স্মরণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মাদার তেরেসার প্রতিকৃতি স্থাপন করা হয়েছে। মন্দিরে সকল শ্রেণী, জাতি-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষকে এ জ্ঞানী-গুণীদের প্রতিকৃতি উদ্বুদ্ধ করবে বলে পুজারি দুলাল ও রমা রানী শিকদার আশা করেন।

তাঁরা জানান, দেশের সর্ব বৃহৎ এসব দুর্গামণ্ডপ স্থাপন করে সনাতন সমাজের দুর্গতি ও সকল অশুভ শক্তির বিনাশ করে আত্মিক ও জাগতিক উন্নতি কামনা করা হয়েছে। তেমনি দেশ ও জাতির সকল অশুভ, অনাচার ও কুপমণ্ডুকতা মায়ের আশীর্বাদে দূর হবে বলে আয়োজকগণ আশা করেন। তাদের নান্দনিক এ আয়োজন দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দু’লক্ষাধিক ভক্ত এখানে আসবেন। পুজোর পাঁচ দিন এই নির্জন হাকিমপুর শিশু-যুবা-বৃদ্ধার পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠবে। মিলবে বাহারি আয়োজনে গ্রামীণ মেলা। নিরাপত্তার চাদরে থাকবে ঢাকা। জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি অমিত রায় বলেন, এ বছর জেলার ৫৭৯টি মন্দিরে উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে পালিত হচ্ছে দুর্গোৎসব।

জেলা প্রশাসক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম ও পুলিশ সুপার মোঃ নিজামুল হক মোল্যা জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও আনন্দঘন ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দুর্গোৎসব উদ্যাপিত হবে।