১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ছেলেবেলা ও ছাত্রজীবন

  • আবুল মাল আবদুল মুহিত

আমার কৈশোর

(১৬ অক্টোবরের পর)

কৈশোরে দুটি এলাকায় ভ্রমণ আমার খুব মনে আছে। একটি আমার ছোট চাচা আবদুল ওয়ারেস আমাকে তার সাইকেলে সিলেটে প্রসিদ্ধ মুরারী চাঁদ কলেজে নিয়ে যান এবং সেখানকার ছাত্রাবাস, টেনিস মাঠ, প্রিন্সিপালের টিলার ওপরে বাড়ি, সুদৃশ্য কলাভবন এবং ব্যারাক টাইপ সাইন্স ল্যাবরেটরি সম্বন্ধে আমাকে অবহিত করেন। এমসি কলেজ সত্যিই তখন একটি সাজানো বাগানের মতো ছিল। আর একদিন আমরা দু’ভাই শহর থেকে প্রায় তিন মাইল দূরে পাঠানটুলার পথে রওনা হই। পাঠানটুলায় আমার আব্বার মামাবাড়ি ছিল এবং তার মামাবাড়িটি মিনিস্টার বাড়ি নামে পরিচিত ছিল। আমাদের তখন মনে হয় যে, দূরত্বটি আড়াই মাইল নয়, ১০ মাইল। যাহোক, আমরা অবশেষে সেখানে দু’জনেই গিয়ে হাজির হই। পাঠানটুলায় আমাদের পরিবার যখন সবাই মিলে যেতাম তখন সব সময় ট্যাক্সি ব্যবহার করতে হতো।

সম্ভবত ১৯৪১ সালে এক ভদ্রলোক আমাদের বাসায় সকাল বেলায় হাজির হন। আব্বা তাকে পায়ে ধরে সালাম করেন এবং আমাদের সবাইকে তাকে সালাম করতে বলেন। আমরা ভাবলাম যে, তিনি নিশ্চয়ই একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হবেন। আমরা জানলাম যে, তিনি ঠিক আত্মীয় নন, দশ বছর (১৯০৮-১৮) তিনি আব্বার দেখাশোনা করেন এক ধরনের অভিভাবক এবং গৃহশিক্ষক হিসেবে। তার নাম আব্দুল গফুর চৌধুরী এবং তিনি পরবর্তীকালে আমাদের স্কুলে হেডমাস্টার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তার পুত্র মাহমুদুল আমিন চৌধুরী বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি হন।

স্কুলে আমার অন্যতম ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয় আমাদের প্রতিবেশী ড. পরিমল করের পুত্র দিলীপ কর, আর একজন প্রতিবেশী অধ্যাপক এস এন সেনের পুত্র প্রসাদ এবং মিরাবাজারের অধ্যাপক সত্যেন্দ্র রায় চৌধুরীর পুত্র সুবিমল রায় চৌধুরী ওরফে সাধন। তৃতীয় শ্রেণী থেকে ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত এই সাধন আমাদের ক্লাসে প্রথম হতো এবং দ্বিতীয় হতো আমাদের চেয়ে একটু বেশি বয়সী টিলাগড়ের আবুল লেইস। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় সাধনের টাইফয়েড হয় এবং তার পরে সে লেখাপড়ায় সেরকম কৃতিত্বের লক্ষণ আর রাখতে পারেনি। সে সিলেট থেকে বিএসসি পাস করে ছাতকে আসাম বেঙ্গল সিমেন্ট কোম্পানিতে কিছুদিন চাকরি করে। সম্ভবত ১৯৬৫ সালে সে দেশত্যাগ করে টাটা কোম্পানির একটা চাকরি নিয়ে চলে যায়। সে বেশ ভালই টেনিস খেলত এবং টাটা কোম্পানির টেনিস মাঠে অল্প বয়সেই হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার ফলে মৃত্যুবরণ করে। তার পিতা অধ্যাপক সত্যেন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন এমসি কলেজের খেলাধুলা বিভাগের দায়িত্বে। ফলে আমরা খেলাধুলার জন্য বিভিন্ন সামগ্রী অতি সহজেই পেতাম এবং তার বাড়ির পাশে উন্মুক্ত ধরনের একটি জায়গায় সব ধরনের খেলাধুলা করতাম।

আমাদের সঙ্গে ১৯৪৫ সালে বিভিন্ন মধ্য স্কুল থেকে অনেক নতুন ছাত্র স্কুলে এসে যোগদান করে। তাদের মধ্যে সদরুদ্দিন চৌধুরী (পরবর্তীতে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য) এবং নূরুল ইসলাম (বিলেতবাসী প্রবাসের কথার লেখক) বেশ ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়। সদরুদ্দিন চৌধুরী ছেলেদের দুষ্টুমি রোধে খুবই দক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারত। সে ছাত্র ভাল ছিল এবং ক্লাসে শৃঙ্খলা রক্ষায়ও সফল ছিল। সে সম্ভবত ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের ক্লাসে ক্যাপ্টেন ছিল। মাঝখানে আমি তাকে চ্যালেঞ্জ করি। কারণ সে কিছু দুষ্ট ছেলেকে পাত্তা দিত এবং তাদের শায়েস্তা করত না। এই চ্যালেঞ্জের ফলে সপ্তম শ্রেণীতে আমি ক্লাস ক্যাপ্টেন হই। কিন্তু আমার কড়া ব্যবস্থাপনা এতই ব্যর্থ হয় যে, কয়েকদিন পরেই আমি এই দায়িত্বটি সদরুদ্দিনকে দিয়ে পরিত্রাণ পাই।

আমাদের সহপাঠী সুবিমল রায় চৌধুরী সম্বন্ধে আগেই বলেছি। সে আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল এবং সেই ঘনিষ্ঠতা আমাদের যৌবনেও অব্যাহত থাকে। আমি যখন ঢাকায় পড়াশোনা করি তখন সে ঢাকায় এলে আমার সঙ্গেই ঘোরাফেরা করত। যদিও থাকত জগন্নাথ হলে। একটি বিশেষ ঘটনা এই উপলক্ষে বলতে হয়। সে সময় আমার সাইকেলের ডগায় বসে সুবিমল সচরাচর ঘোরাফেরা করত। এক সন্ধ্যাবেলায় বংশালের কাছে পুলিশ আমাদের আটক করল। আমাদের দোষ হলো আমরা বিনা লাইটে সাইকেল চালাচ্ছি। আমাদের ধরে বংশালের ফাঁড়িতে নিয়ে গেল। বলল, আমাদের হাজতে থাকতে হবে। পরের দিন আদালতে হাজির হলে আমাদের ভাগ্য নির্ধারিত হবে। এই অবস্থাটি মোটেই গ্রহণযোগ্য মনে হলো না। আমার খুব খারাপ লাগল আমি আমার বন্ধুটিকেও বিপদে ফেলেছি। বংশাল পুলিশ ফাঁড়ির নিকটেই ছিল আমার ফুপুর বাড়ি। আমি পুলিশকে বললাম, আমি যদি কোন এ্যাডভোকেট নিয়ে আসতে পারি তাহলে কি আমরা হাজতবাস থেকে রেহাই পাব? তারা বলল, হ্যাঁ জামিনদার থাকলে আমরা সহজেই নিষ্কৃতি পেতে পারি। আমি আমার বন্ধুকে জিম্মি রেখে ফুপুর বাসায় গেলাম এবং সৌভাগ্যবশত আমার ফুপাকেও পেলাম। তাকে বিষয়টি বললে তিনি কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, পুলিশ কি কারণে এত কড়াকড়ি করছে। যাহোক, তিনি আমাকে নিয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে এলেন এবং আমরা হাজতবাস থেকে রক্ষা পেলাম। পুলিশ শেষ পর্যন্ত আমাদের বিরুদ্ধে কোন নালিশ করল না।

১৯৪৪ সালে মৌলভীবাজারের করিমপুর চা বাগানে একটি মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। এক মহাঝড়ে এবং সম্ভবত চা বাগানের ব্যবস্থাপনার অদক্ষতার কারণে শ্রমিকদের ব্যারাক ভেঙ্গে পড়ে এবং তাতে ৩০৪ জন শ্রমিক নিহত হয়। এ ব্যাপারে সরকার একটি তদন্তের ব্যবস্থা করে। সেই তদন্ত কমিশনের পক্ষে আমার আব্বাকে কিছু কাজ করতে হয়। এক পর্যায়ে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয় ঐ বাড়ি ধসের ঘটনা সম্বন্ধে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ। প্রায় মাসখানেক ধরে এই সাক্ষ্য গ্রহণ আমাদের বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিদিন বিকেল এবং সন্ধ্যায়। এই কাজে আমরা দু’ভাই বিশেষ ভূমিকা রাখি, যদিও এতে পড়াশোনার বেশ ক্ষতি হয়।

স্কুল জীবনে লেখাপড়ার বাইরে আর একটা স্মৃতি হলো বিভিন্ন উৎসবে স্কুলে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠান। মুসলমান ছাত্রদের বড় অনুষ্ঠান হতো হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর স্মৃতিতে মিলাদ উৎসব। এই উৎসব কোন কোন বছর শহরের সব হাইস্কুল সম্মলিতভাবে উদ্্যাপন করত। সেই উপলক্ষে প্রবন্ধ, আবৃত্তি, গান (হামদ ও নাত) এসব প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন বয়সের ছাত্রদের জন্য স্বতন্ত্র প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। আমি ১৯৪৪ সালে আমার বয়সের প্রবন্ধ রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হই এবং প্রবন্ধটি মিলাদ অনুষ্ঠানে পাঠ করতে হয়। হিন্দুদের দুর্গাপূজা এবং সরস্বতী পূজা খুব ধুমধামে অনুষ্ঠিত হতো। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নাটক এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। সরস্বতী পূজা উপলক্ষেও গান-বাজনা এবং প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। আমার মনে হয় কালিপূজা উপলক্ষে সেরকম ধুমধাম অনেক কম ছিল। আমাদের কৈশোরে যে বিষয়টি বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হতো তা ছিল এসব অনুষ্ঠানে ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই অংশগ্রহণ করত। আমরা পূজার সময় প্রসাদ খেতাম। কিন্তু সেই প্রসাদ ছিল মিষ্টি, ভাত নয়। হিন্দুরা আমাদের মিলাদে শিরনি খেত অথবা তাদের জন্য মিষ্টি থাকত।

আমার কৈশোরে সিলেটে তিন-চারটি দোকান ছিল বিলেতী দোকান নামে পরিচিত। সেগুলো ছিল বন্দরবাজারের খান সাহেব আবদুল কাহের এ্যান্ড সন্স, করিমুল্লাহ এ্যান্ড সন্স এবং লালদীঘির পাড়ের হাজী উসমান এ্যান্ড সন্স। সম্ভবত দেশ বিভাগের আগে আরও একটি বিলেতী দোকান হয় ফ্রেন্ডস স্টোর। মিষ্টির দোকান বলতে ছিল শুধু বান্ধব মিষ্টান্ন ভা-ার। মুসলমানদের হোটেল ছিল লালদীঘির পাড়ের আবাসিক মোবারক হোটেল এবং বন্দরবাজারের মশরফিয়া হোটেল। সিনেমা হল ছিল মাত্র দুটিÑ বন্দরবাজারে ছায়াবাণী (পরে রঙমহল) এবং লালবাজারে লালকুঠি দুটিরই মালিক ছিলেন লামাবাজারের লাল ব্রাদার্স পরিবার। বইয়ের দোকান ছিল বন্দরবাজারের চন্দ্রনাথ লাইব্রেরি। আর লালদীঘির পাড়ের আর্ল লাইব্রেরি। আর্ল লাইব্রেরিতে বসে বসে বই পড়ার সুযোগ ছিল। চন্দ্রনাথ লাইব্রেরি ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প পরিসরের। বইয়ের দোকানের মালিকরা ছাত্রদের নানাভাবে সাহায্য করত এবং বই পড়তে উৎসাহ দিত। পুরনো বই কেনার রেওয়াজ ছিল এবং সেগুলো অপেক্ষাকৃত কম দামে ছাত্ররাই বিক্রি করত। তবে ওই দুটি লাইব্রেরিও যোগাড় করে দিতে পারত।

শহরের ব্রহ্মময়ী বাজারে কয়েকটি দোকান ছিল পাকা ঘরে আর সেখানে চাল, ডাল, তেল এসব বিক্রি হতো প্রতিদিন। সংশ্লিষ্ট ছিল একটি তাজা সবজি বাজার, যা সপ্তাহে দু’বার বসতো। এখানে শহরতলী এবং দূর থেকেও বিক্রেতারা আসত তাদের মালামাল নিয়ে এবং লক্ষ্য থাকত সবকিছু বিক্রি করে বাড়ি প্রত্যাবর্তন। বাজার সকালেই বসতে শুরু করত, তবে জমে উঠত বিকেলে এবং সন্ধ্যার পর। প্রায় রাত এগারোটা পর্যন্ত বাজার বসত ওই দুদিনে, সম্ভবত সোম ও শুক্রবার। বর্তমান মীরাবাজারে এ রকম হাট বসত না।

শহরে মাছবাজার ছিল তিনটা- একটি বন্দরবাজারের চৌরাস্তার পাশে, আরেকটি লালকুঠি সিনেমা হলের পাশে, আর তৃতীয়টি কাজীর বাজারের আড়তগুলোর পাশে। এছাড়া শহরের পশ্চিম প্রান্তে ছিল শিবগঞ্জের বাজার, পূর্বপ্রান্তে ছিল ছোট পরিসরে রিকাবিবাজার।

সিলেট শহরে উচ্চ বিদ্যালয় ছিল সবচেয়ে পুরনো সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে পাইলট স্কুল), রাজা গিরিশ চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়, এইডেড হাইস্কুল, মডেল হাইস্কুল, রসময় মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারী মহিলা উচ্চ বিদ্যালয় এবং কিশোরী মোহন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। দেশ বিভাগের সামান্য আগে স্থাপিত হয় কাজী জালালুদ্দিন হাইস্কুল। প্রবেশিকা স্তরের পরে ছিল তিনটি কলেজ- সরকারী মুরারী চাঁদ কলেজ (স্থাপিত ১৮৯২), মদন মোহন কলেজ (স্থাপিত ১৯৪০) এবং মহিলা কলেজ (স্থাপিত ১৯৩৯), যা ১৯৪৫ সালে সরকারী হয়। আলিয়া মাদ্রাসা স্থাপিত হয় ১৯১৩ সালে, এছাড়া আর কোন মাদ্রাসা ছিল না। সংস্কৃত কলেজ গড়ে ওঠে ১৯৩২ সালে। ১৮৮৫ সালে স্থাপিত দুর্গা কুমার পাঠশালা ছিল শহরের মধ্যখানে একটি বড় বিদ্যালয়। পশ্চিম প্রান্তে ছিল বখতিয়ার বিবি বালিকা প্রাইমারি বিদ্যালয়। দক্ষিণ সুরমায় সুরমা ভেলি টেকনিক্যাল স্কুল ছিল একটি প্রসিদ্ধ সরকারী কারিগরি বিদ্যালয়। শহরতলীর পশ্চিম প্রান্তে শিক্ষামন্ত্রী পাঠানটুলা প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন ১৯৩০ সালে। বর্তমানে এটি প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে।

আমরা দু’ভাই বেশ সিনেমা দেখতাম। দুটি সিনেমা হলের মালিক ছিলেন লাল ব্রাদার্স এবং একটি সিনেমা হলের জমিদার ছিলেন আমার দাদা। তাই আমরা সব সময় বিনা টিকেটে সিনেমা দেখতাম। সেকালে দেখা ছবির মধ্যে মনে আছে ঞধৎুধহ ধরনের ছবি বা ইতিহাস বিষয়ক ছবি। কিন্তু কোন্্ ছবি আমরা দেখব তা নির্ধারণ করে দিতেন আমাদের আব্বা। মাঝে মাঝে অবশ্য পুরো পরিবারও একসঙ্গে সিনেমা দেখতাম।

মাঝে মাঝে শহরে বা শহরতলীতে সার্কাস পার্টি আসত এবং বেশ ক’দিন প্রবেশ ফি দিয়ে সার্কাস দেখা যেত। সার্কাস দেখা একটি উৎসবের মতো বিষয় ছিল এবং সব সময়ই বয়স্ক আত্মীয়কে নিয়ে আমরা সার্কাস দেখতে যেতাম।

চলবে...