১০ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

সম্পদ ও বৈষম্য

ধনী-গরিবের ব্যবধান ও বিরাজমান বাস্তবতা নিয়ে নানা সময় নানা পর্যায়ে আলোচনা হয়। কখনো কখনো গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়। আমরাও নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পাই। একটি অবাক করা তথ্যকে ছাপিয়ে চলে আসে নতুন বিস্ময়কর তথ্য। ধনী-গরিবের বৈষম্য নিয়ে সর্বশেষ গবেষণার ফল দেখে আকস্মিক হতবাক হয়ে পড়াটাও বড্ড সাময়িক বলেই ধারণা হয়। পরের দিনই আমরা ঘুম থেকে উঠে মনেও রাখি না মানবতার জন্য চরম অবমাননাকর ওই তথ্যের চাবুক। সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৫-এ ধনী-গরিবের বিশাল বৈষম্যের চিত্র উঠে এসেছে। সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশের হাতেই এখন বিশ্বের ৫০ শতাংশ সম্পদ। আর ৫০ শতাংশ দরিদ্র মানুষের হাতে আছে মাত্র ১ শতাংশ সম্পদ। এ তথ্য বিবেকবান মানুষকে আলোড়িত করবেই। স্মরণযোগ্য, গত বছরের গোড়ার দিকে নাসার গবেষণায় বলা হয়েছিলÑ ধনী-গরিব বৈষম্যে দুনিয়া ধ্বংস হবে। আগামী দশকগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদের অবিবেচক ব্যবহার ও ক্রমবর্ধমান হারে ধনী-গরিবের ব্যবধান বাড়তে থাকার ফলে শিল্প-সভ্যতা এমনভাবে পতনের দিকে যাবে যে তাকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নাও হতে পারে।

বলাবাহুল্য, সম্পত্তি আয়ের পার্থক্য হেতু মানুষে মানুষে আয়-উপার্জনের অসমতা বিদ্যমান। অসম আয়ের জন্য ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে উপার্জিত আয়ের তুলনায় সম্পত্তি আয় এবং সম্পত্তি আয়ের সুযোগ-সুবিধার আধিক্য বেশি করে দায়ী। একটি দেশের সর্বোচ্চ আয়ের লোকজনের তালিকা করলে দেখা যায়, তাদের বেশিরভাগই অধিকতর ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি ও সম্পত্তি আয়ের মালিক। সম্পত্তি আয়জনিত সৌভাগ্যবান সীমিত কিছু ব্যক্তি সাধারণ মানুষ থেকে স্বাভাবিকভাবেই অনেক আলাদা। সমাজে যারা সর্বোচ্চ পর্যায়ে সচ্ছল ব্যক্তি তাদের বেশিরভাগই ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের মালিক। যেমন আমেরিকায় সর্বোচ্চ পর্যায়ের সচ্ছল ব্যক্তিদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৭ শতাংশ ব্যক্তি বা পরিবার ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের মালিক। ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের বদৌলতে পারিবারিক সচ্ছলতার পার্থক্য হেতু সমাজের সাধারণ মানুষ বিব্রত বোধ করে। তাই বংশানুক্রমিক সুবিধাভোগ হ্রাসকরণে ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ আইন প্রণয়ন, পরিবর্তন-পরিমার্জন জরুরী।

ধনী-গরিবের বৈষম্য প্রায় প্রতিটি সমাজেই বিদ্যমান। এই ব্যবধান কমানোর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাঝেমধ্যে আহ্বানও ধ্বনিত হয়। কিন্তু সেই আহ্বান হয়ে ওঠে অরণ্যেরোদনের শামিল। কোন ধনকুবের যেমন তাতে সাড়া দেন না, তেমনি অর্থনীতিশাস্ত্রের বাঘা বাঘা প-িতও কোন ফর্মুলা উপস্থাপন করেন না। তবু রাষ্ট্র নিজ দায়িত্বে বিত্তহীনদের জীবনযাপন কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ করে তুলতে নানা কর্মসূচী ও পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। এসব সামাজিক নিরাপত্তামূলক কর্মসূচীর মাধ্যমে সাময়িকভাবে হলেও দুস্থরা রক্ষা পায়।

সীমিত সংখ্যক মানুষ বিলাসব্যসনে জীবন কাটাবে, আর সিংহভাগ মানুষের নুন আনতে পান্তা ফুরোবেÑ এটাকে নীতিসম্মত ও মানবসম্মত বলে মেনে নেয়া কষ্টকর। অগণিত মানুষ স্বপ্ন দেখে এমন একটি বিশ্বের যেখানে ধনী-গরিবের ব্যবধান ও বৈষম্য থাকবে না। এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণী মানুষ নিশ্চয়ই আগামীতে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলবে যাতে প্রতিটি মানবসন্তানকেই সমভাবে বিবেচনা করে তার সমঅধিকার নিশ্চিত করা হবে। দুনিয়ার সব মানুষই সমান সুযোগ-সুবিধার ভাগীদার হবে। অর্থসম্পদের স্বাভাবিক বণ্টন ব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে শুধু ধনসম্পদের তারতম্যের কারণে বিশ্বে মানুষের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এটি যে মানবজীবনকে সঙ্কুচিত ও বিড়ম্বিত করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।