১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ইট পোড়ালে দূষণ কমানো সম্ভব

  • বিশ্বের অনেক দেশে বায়ু দূষণ না করেই বিকল্প পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হয়

শাহীন রহমান ॥ দেশে এখনও সনাতন পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হলেও রয়েছে একাধিক বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। বিশেষজ্ঞরা বলছে পরিবেশবান্ধব এসব পদ্ধতি ব্যবহারে বায়ু দূষণের পরিমাণ একবারেই কম। জ্বালানি সাশ্রয়ী এসব পদ্ধতির মাধ্যমে সারাবছরই ইট উৎপাদন করা যায়। ইটের মানও উৎকৃষ্ট হয়। তবে প্রশিক্ষত লোকবল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অধিক বিনিয়োগের কারণে ইটভাঁটি মালিকরা এসব পদ্ধতিতে ভাঁটি রূপান্তরে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। দেশে এসব পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার কম হলেও বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিকল্প পদ্ধতিতে কোন প্রকার বায়ু দূষণ না করেই ইট পোড়ানো হয়। কিন্তু দেশে বার বার চেষ্টা সত্ত্বেও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি জনপ্রিয় করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাদের মতে, নির্মাণ শিল্পে ব্যাপক প্রসার হওয়া সত্ত্বেও এদেশে এখনও সনাতন পদ্ধতির ইট ব্যবহার করা হয়। তবে গ্রীন হাউস গ্যাস নিঃসরণ ও বায়ু দূষণের অন্যতম উৎস হওয়ার কারণে উন্নত বিশ্বে পোড়ানো ইটের ব্যবহার নেই বললেই চলে। ইটের মূল উপাদান কাদামাটি সাধারণ কৃষি জমি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এতে প্রতিবছর অনেক কৃষি জমি নষ্ট হয়। অথচ ইটের পবিবর্তে বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে বায়ু দূষণসহ অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব।

দেশে সরকারীভাবে প্রায় ৬ হাজার ইটভাঁটি রয়েছে বলে হলেও আসলে এর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৮ হাজার। পরিবেশ অধিদফতরের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ও পবার নির্বাহী সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সোবহান বলেন, দেশে ইটভাঁটি সমূহের ৬৭ ভাগই অবৈধ। এ কারণে সরকার থেকে বেঁধে দেয়া প্রযুক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ ভাঁটি মালিকরা চান কম খরচে অধিক মুনাফা অর্জন করতে। এ কারণেই সনাতন পদ্ধতিতেই ভাঁটি মালিকদের বেশি ঝোঁক রয়েছে। তবে দেশে সনাতন পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি চালু রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বালু-সিমেন্ট-টুকরা পাথরের মিশ্রনে চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রস্তুত ব্লক, কাদামাটির সঙ্গে রাসায়নিক দ্রব্য যোগ করে প্রস্তুত ইট ও ফোম কংক্রিট ব্লক। এ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত ইট ওজনে হালকা এবং তাপ নিরোধক হয় বিধায় বিল্ডিংয়ের পার্টিশান হিসেবে এর ব্যবহার উপযোগী। বিশেষজ্ঞরা বলছেন পোড়ামাটির ইটের পরিবর্তে এটি বিকল্প হিসেবে দেশে ব্যবহার করা গেলে বায়ু দূষণের পরিমাণ কমানো সম্ভব হবে।

তাদের মতে নদীমাতৃক এদেশে প্রচুর পরিমাণে বালি পাওয়া যায়। যেটাকে কাদামাটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। তবে কাদামাটির মতো বালিতে পরস্পরের সঙ্গে আটকে থাকার গুণ না থাকায় এতে সিমেন্ট ব্যবহার করতে হয়। নদীর বালির সঙ্গে নির্দিষ্ট অনুপাতে সিমেন্ট, পাথরের খোয়া, পাথরের গুঁড়া ও অন্যান্য উপাদান মিশিয়ে বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী উৎপাদন করা যায়। এছাড়াও কৃষি নির্ভর এদেশে সর্বত্র ধানের তুষ পাওয়া যায়। যেটি এখনও পশুখাদ্য ও জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পর যে ছাই উৎপন্ন হয় সেটি অনেক হালকা ও দামে সস্তা। এই ধানের তুষের ছাইয়ের রাসায়নিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এতে উপস্থিত উপাদান সমূহ অনেকাংশেই সিমেন্টর উপাদানের সঙ্গে মিলে যায়। এটি ব্যবহারের ফলে সিমেন্ট অনেক কম লাগে। ফলে বিকল্প নির্মাণ সামগ্রী হালকা, মজবুত ও দামে সাশ্রয়ী হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে দেশেও ইট পোড়াতে বিকল্প পদ্ধতির উদ্যোগ নেয়া হলেও তা এখনও ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পায়নি। পরিবেশ অধিদফতর থেকে বার বার সময়সীমা বেঁধে দেয়ার পরও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন এসব বিকল্প পদ্ধতিতে ইট পোড়ানো হলে বায়ু দূষণের পরিমাণ অনেক কমে আসবে। পরিবেশ অধিদফতর জানিয়েছে নব্বই দশক পর্যন্ত দেশে ইটভাঁটিসমূহে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহার করা হতো। সনাতন পদ্ধতির ইটভাঁটি হিসেবে পাঁজা ও ড্রামচিমনি প্রচলিত ছিল। এ পদ্ধতিতে ২০- ৩০ ফুট উচ্চ ড্রামচিমনি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ২০০১ সাল জারিকৃত পরিপত্রে সনাতন পদ্ধতির ইটভাঁটিসমূহে ১২০ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট্য স্থায়ী চিমনি ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে এ পদ্ধতির ইটভাঁটিতে পরিবেশ সম্মত নয়।

এর বাইরে জিগ্জাগ্, ভার্টিক্যাল শ্যাফট্ হাইব্রিড হফম্যান কিল্ন, টানের কিল্ন প্রভৃতি নতুন প্রযুক্তি চালু রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব নতুন প্রযুক্তি পরিবেশবান্ধব হলেও দেশের এর ব্যবহার খুবই কম রয়েছে। জানা গেছে, কিছু ইটভাঁটিতে জিগ্জাগ্ পদ্ধতি ব্যবহার শুরু হলেও অন্য পদ্ধতিতে দেশে এখনও ইট পোড়ানো শুরু হয়নি।

জিগ্জাগ্ কিল্ন বা হাওয়া ভাটা ॥ ধোঁয়ামুক্ত পরিবেশবান্ধব একটি পদ্ধতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এ পদ্ধতিতে ইট পোড়ালে ক্ষতিকর কোন ধোঁয়া চিমনি দিয়ে বের হয় না। স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় ইট উৎপাদনের কারণে ধুলোবালি কম হয়। সনাতন পদ্ধতির চেয়ে এ পদ্ধতিতে দূষণের মাত্রাও অনেক কম। এ পদ্ধতিতে কয়লার ব্যবহার কম হয় বলে কার্বনডাই অক্সাইড, বস্তুকণা নির্গমন কম হয়। কম জ্বালানি খরচ এবং উৎপাদনে অপচয় কম হওয়ার কারণে ইট উৎপাদনেও খরচ অনেক কম। এ পদ্ধতিতে ইট পোড়ালে প্রতিটি ইটের উৎপাদন খরচ হয় মাত্র ৩. ৫০ টাকার মতো।

পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পদ্ধতিতে উন্নত তাপ নিরোধক ব্যবস্থার কারণে চুল্লিতে তাপ অপচয় কম হয়। যা জ্বালানির ব্যবহার কমাতে সাহায্য করে। ভাঁটিতে সাজানো কাঁচা ইটগুলোর উপরের অংশ পোড়ানো ইট এবং পোড়ামাটি ও কয়লার গুঁড়ো দিয়ে তৈরি মিশ্রণের ২টি স্তর দিয়ে আবৃত থাকে। উপরে থেকে ছিদ্রের মাধ্যমে জ্বালানি প্রদান করা হয়।