২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

লালন প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

লালন প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি

সংস্কৃতি ডেস্ক ॥ উপমহাদেশের বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী অসংখ্য গানের গীতিকার, সুরকার ও গায়ক, বাউল সম্রাট দার্শনিক ফকির লালনের ১২৫তম প্রয়াণ দিবস আজ। ১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর লালন আজকের দিনে ১১৬ বছর বয়সে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেউড়িয়াতে নিজ আখড়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি একাধারে একজন আধ্যাত্মিক বাউলসাধক, মানবতাবাদী, সমাজ সংস্কারক এবং দার্শনিক। লালন বাউল গানের অগ্রদূতদের অন্যতম। তার সৃষ্ট গানের মাধ্যমেই ঊনিশ শতকে বাউল গান বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। তাকে ‘বাউল সম্রাট’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। তবে তিনি লালন ফকির হিসেবেই সমধিক পরিচিত। তার মৃত্যু দিবসে ছেউড়িয়ার আখড়ায় স্মরণ উৎসব হয়। দেশ-বিদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে অসংখ্য মানুষ স্মরণোৎসব ও দোল পূর্ণিমায় এই আধ্যাত্মিক সাধকের দর্শন অনুস্মরণ করতে প্রতি বছর এখানে আসেন। ২০১০ সাল থেকে এখানে নিয়মিত উৎসব হচ্ছে। এছাড়া রাজধানী ঢাকার জাতীয় নাট্যশালার সঙ্গীত ও নৃত্যশালা মিলনায়তনে আগামী ২২ ও ২৩ অক্টোবর লালন উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। লালনের গান অন্যতম জীবন দর্শন হিসেবে মানবজাতিকে উদ্বুদ্ধ করে। লালনগীতি বা লালন সঙ্গীত হিসেবে পরিচিত লালন মুখে মুখে গান রচনা করতেন এবং সুর করে পরিবেশন করতেন। এভাবেই তার বিশাল গান রচনার ভান্ডার গড়ে ওঠে। তিনি দুই সহস্রাধিক গান রচনা করেছেন বলে ধারণা করা হয়। তবে কারও কারও মতে এ সংখ্যা চার হাজারের বেশি। তার সহজ-সরল শব্দময় এই গানে মানবজীবনের রহস্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে।

লালনের জন্ম নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। লালন নিজে কখনও তা প্রকাশ করেননি। সূত্র অনুযায়ী লালন ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান বাংলাদেশের) যশোর জেলার ঝিনাইদহ মহকুমার হারিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কোন কোন লালন গবেষক মনে করেন, লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ভাড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। লালনের গান ও দর্শন যুগে যুগে প্রভাবিত করেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুলের মত বহু খ্যাতনামা কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে। লালন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, লালন ফকির নামে একজন বাউল সাধক যিনি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সমন্বয় করে কী যেন একটা বলতে চেয়েছেনÑ আমাদের সবারই সেদিকে মনোযোগ দেয়া উচিত। যদিও তিনি একবার লালন ‘ফকির’ বলেছেন, এরপরই তাকে আবার ‘বাউল’ বলেছেন, যেখানে বাউল এবং ফকিরের অর্থ পারস্পরিক সংঘর্ষপ্রবণ। তার গানগুলো মূলত বাউল গান হলেও বাউল সম্প্রদায় ছাড়াও যুগে যুগে বহু সঙ্গীতশিল্পীর কণ্ঠে লালনের এই গানসমূহ উচ্চারিত হয়েছে। গান্ধীরও ২৫ বছর আগে, ভারত উপমহাদেশে সর্বপ্রথম, তাকে ‘মহাত্মা’ উপাধি দেয়া হয় বলে জানা যায়।

লালনের ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘লালন ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু কোন বিশেষ ধর্মের রীতিনীতি পালনে আগ্রহী ছিলেন না। সব ধর্মের বন্ধন ছিন্ন করে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন জীবনে। লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেউড়িয়াতে একটি আখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের নীতি ও আধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। যেখানে সহস্রাধিক শিষ্য ও সম্প্রদায়ের লোক একত্রিত হতেন এবং সেখানে সঙ্গীত ও আলোচনা হতো। চট্টগ্রাম, রংপুর, যশোর এবং পশ্চিমে অনেকদূর পর্যন্ত বাংলার ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বহুসংখ্যক লোক লালন ফকিরের শিষ্য ছিলেন। লালনের সঙ্গীত ও ধর্ম-দর্শন নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা গবেষণা হয়েছে ও হচ্ছে। ১৯৬৩ সালে ছেউড়িয়ায় আখড়া বাড়ি ঘিরে লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর লালন লোকসাহিত্য কেন্দ্রের বিলুপ্তি ঘটিয়ে ১৯৭৮ সালে শিল্পকলা একাডেমির অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় লালন একাডেমি।

লালনের সঙ্গীতসমৃদ্ধ জীবনীতে উদ্বুদ্ধ হয়ে তাকে নিয়ে ১৯৭২ সালে সৈয়দ হাসান ইমাম পরিচালনা করেন ‘লালন ফকির’ চলচ্চিত্রটি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় ১৯৮৬ সালে একই নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। ম. হামিদ ১৯৮৮ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র ‘দ্যাখে কয়জনা’ যা বাংলাদেশে টেলিভিশনে প্রচার হয়। তানভীর মোকাম্মেল ১৯৯৬ সালে পরিচালনা করেন তথ্যচিত্র ‘অচিন পাখি’ এবং ২০০৪ সালে ‘লালন’ নামে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। এছাড়া ২০১০ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে গৌতম ঘোষ ‘মনের মানুষ’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। এছাড়া তাকে নিয়ে আরও অনেক নাটক ও তথ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে লালনের গান বেশ জনপ্রিয়। শ্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার করা সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’ গানটির অবস্থান ১৪তম। লালনের ভক্ত বাউলরা তার গানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। পাশাপাশি ফরিদা পারভীন লালনগীতি বা লালন সঙ্গীতকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে অনেকটাই ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশে আনুশেহ আনাদিল, অরূপ রাহী, মশিউর রহমান রিংকু লালন শিল্পী লালনের গান চর্চা করে থাকেন। লালনের মাজারে অসংখ্য বাউলশিল্পী একতারা বাজিয়ে লালন গানের চর্চা করে থাকেন। মানবিক জীবন দর্শনের কারণেই লালন যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন। লালনের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান হলোÑ ‘আমি অপার হয়ে বসে আছি’, ‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’, ‘জাত গেলো জাত গেলো বলে’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়’, ‘আপন ঘরের খবর লে না’, ‘আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী’, ‘মন তুই করলি একি ইতরপনা’, ‘এই মানুষে সেই মানুষ আছে’, ‘যেখানে সাঁইর বারামখানা’, ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’, ‘আমার আপন খবর আপনার হয় না’, ‘দেখ না মন ঝকমারি এই দুনিয়াদারী’, ‘ধর চোর হাওয়ার ঘরে ফান্দ পেতে’, ‘সব সৃষ্টি করলো যে জন’, ‘সময় গেলে সাধন হবে না’, ‘আছে আদি মক্কা এই মানব দেহে’, ‘তিন পাগলে হলো মেলা নদে এসে’, ‘এসব দেখি কানার হাট বাজার’, ‘মিলন হবে কত দিনে’, ‘কে বানাইলো এমন রঙমহল খানা’ সত্য বল সুপথে চল ওরে আমার মন’ প্রভৃতি।

নির্বাচিত সংবাদ