২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

ফেনী সদর হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীদের ভোগান্তি

  • কাজ শেষ না করেই টাকা পরিশোধ চালু হয়নি লিফট-জেনারেটর

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফেনী ॥ ফেনী সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের কাজ না করেও অর্ধ কোটি টাকা বিল নিয়ে গেছে ঠিকাদার। নতুন ভবনের লিফট, জেনারেটর না চলার কারণে মুমূর্ষু রোগীদের ভোগান্তি চরমে উঠেছে। গণপূর্ত বিভাগ ৪ বছর আগে ঠিকাদারকে লিফট ও জেনারেটরের বিল পরিশোধ করলেও তারা জানেন না নতুন ভবনের লিফট ও জেনারেটর চালু হয়েছে কি না। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

অনুসন্ধানে জানা যায়- ফেনী সদর হাসপাতালকে ১৫০ শয্যার থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নিত করার পর ১৫০ শয্যার জন্য প্রায় ১১ কোটি টাকা ব্যয়ে চারতলা নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাড়ে ৪ বছর পর বিভিন্ন টানাপোড়নের মধ্যদিয়ে চলতি সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন ভবন স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তৎকালীন ফেনীর সিভিল সার্জন ও ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ মোঃ ইউসুফ ও হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডাঃ অশীম কুমার সাহা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে নতুন ভবনটি বুঝে নেয়ার কাজ সম্পন্ন করেন। নতুন ভবন হস্তান্তরের সময় গণপূর্ত বিভাগ কর্মকর্তারা জানেন না নতুন ভবনের লিফট ও জেনারেটর চালু হয়েছে কি না। অথচ একটি লিফট এর জন্য ৩৮ লাখ টাকার মধ্যে ২৮ লাখ টাকা চার বছর আগে ঠিকাদারকে পরিশোধ করে দিয়েছে গণপূর্ত বিভাগ। ২০০ কেভি একটি জেনারেট বাবদ ৩০ লাখ টাকা ও একইভাবে ঠিাকাদারকে পরিশোধ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। কিন্তু লিফট ও জেনারেটর আজও চালু হয়নি। নতুন ভবন হস্তান্তর সম্পর্কে দৈনিক জনকণ্ঠে সংবাদ প্রকাশের পর কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে এবং নতুন ভবন হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। নতুন ভবন হস্তান্তর ও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ৫ মাস পর নতুন নিয়োগ পাওয়া হাসপাতালের দুই কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সারওয়ার জাহান ও সহকারী পরিচালক ডাঃ আনোয়ার হোসেন সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান নতুন ভবনের লিফট ও জেনারেটর চালু নেই, প্রায় ২৫টি এসি মরিচা পড়ে দেয়লের সঙ্গে লাগানো রয়েছে। এ নিয়ে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দিয়ে জনালে গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান ও সংশিষ্ট প্রকৌশলীরা জানতে পারে । নিজ অফিসে খোঁজ নিয়ে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তার জানতে পারেন যে বিল পরিশোধ হয়েছে অথচ লিফট ও জেনারেটর চালু হয়নি। লিফট চালু না হওয়ায় পুরোন ভবনের অপারেশন থিয়েটার থেকে অপারেশন করা রোগী নতুন ভবনের কেবিন ও ওয়ার্ডে নিয়ে যেতে এবং মুমূর্ষু রোগী, ডাক্তার ও নার্সদের ৪ তলায় উঠতে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। একইভাবে জেনারেটর চালু না থাকায় বিদ্যুত চলে গেলে নতুন ভবন ভূতুড়ে বাড়িতে পরিণত হয়। এ ছাড়া ডাস্টবিনের রাস্তা প্রযোজন অনুযায়ী না করায় ডাস্টবিন থেকে পৌরসভার ময়লার গাড়ি বজ্য অপসারণ করতে পাড়ছে না বলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সারওয়ার জাহান জানান। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে তার কক্ষে মঙ্গলবার দুপুরে আলাপ হয় গণপূর্ত বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী আফসার আলী ও সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুত) এর দায়িত্বরত গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে। তারা জানান তত্ত্বাবধায়কের চিঠির আগে তারা জানতেন না নতুন ভবনে লিফট আছে কি না। পরে লিফট চালু করার জন্য ঠিকাদারকে চিঠি দেয়া হয়েছে এবং জেনারেট চালুর জন্য প্রযোজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তবে দীর্ঘ বছর ধরে তেল মোবিল না থাকায় জেনারেটরটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন, কাজ করার সময় জেনারেটারের অবস্থা বুঝা যাবে বলে জানান এ দুই প্রকৌশলী। গণপূর্ত বিভাগের ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান জানন, ৪ বছর আগে লিফটের ৩৮ লাখ টাকার মধ্যে ২৮ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ টাকা তার ফেনীতে যোগদানের আগেই তার পূর্বসূরি নির্বাহী প্রকৌশলী পরিশোধ করেছেন বিধায় বিষয়টি তার জানা ছিল না। বিষয়টি জানার পর গত ৮ মাস যাবত ঠিকাদারকে চিঠি দেয়া হলেও ঠিকাদার বিভিন্ন টালবাহানা করে যোগাযোগ করছেন না বা ফেনী আসছেন না। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাঃ সারওয়ার জাহান জানান, লিফটসহ নতুন ভবনের ক্রটি নিয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সচিব, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহা-পরিচালকসহ উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। নতুন ভবনে আইসিইউ এবং সিসিইউ এর জন্য কক্ষ বানানো হলেও সিসিইউ কক্ষের জন্য সেন্ট্রাল অক্সিজেন, রোগীর বেড বসানো হয়নি, এ ছাড়া দক্ষ জনবল নিয়োগ না করায় জীবনরক্ষাকারী অতিগুরুত্বপূর্ণ এ কক্ষগুলো চালু করা যাচ্ছে না শুধু যন্ত্রপতিসহ আনুষাঙ্গিক কাজ শেষ করে দক্ষ জনবল নিয়োগ দেয়া না হয় তা যেমন জনগণের সেবা দেয়া যাবে না তেমনী দক্ষ জনবল নিয়োগ দিয়ে যন্ত্রপাতিসহ আনুষাঙ্গিক কাজ শেষ না হলে তা জনগণের কাজে আসবে না। তাই দুইটি কাজ সম্মনয় করে করলে জনগণের সেবা দেয়া সম্ভব হবে এবং অনেক মানুষের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করা সম্ভব হবে। গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আমিনুর রহমান জানান, ২০০৪ সালে বাংলাদেশে ৫টি ২৫০ শয্যার হাসপাতালের ডিজাইনে সিসিইউ ও আইসিইউ স্থাপন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফেনী সদর হাসপাতালের নতুন ভবনের সিসিইউতে সেন্ট্রল অক্সিজেন লাগানোর আইটেম টেন্ডার সিডিউলে ছিল না। ফেনী সদর হাসপাতালের নতুন ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সালে ৯৫ ভাগ কাজ শেষ হয় এবং ঠিকাদারকে ১০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। ইমারত নির্মাণ টেন্ডারের বাইরে লিফট এর জন্য ৩৮ লাখ টাকার এবং ও জেনারেটর স্থাপনের জন্য ৩০ লাখ টাকার আলাদা ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। এ দুই ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই প্রায় অর্ধকোটি টাকা বিল নিয়ে যায়। ঠিকাদার বাকি কাজ শেষ না করায় সাড়ে ৪ বছর নতুন ভবন হস্তান্তর প্রক্রিয়া ঝুলে থাকে। অবশেষে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার সাড়ে ৪ বছর পর লিফট ও জেনারেটরের কাজ বাকি রেখেই চলতি বছরে ২৩ ফেব্রুয়ারি নতুন ভবন আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।। কিন্তু হাসপাতালে ওয়ার্ড চালু করা হয় আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের ৬ মাস পর।