১৭ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শিশুকালেই বিয়ের পিঁড়ি শিশুই হয়েছে শিশুর মা

শৈশব হচ্ছে জীবনের এক দুরন্ত সময়। এ সময় শিশুরা তার চারপাশ থেকে অনেক কিছু শেখে। এতে তার মানসিক বিকাশ ঘটে। আর এ শেখার কাজটি হয় হাসতে হাসতে, খেলতে খেলতে, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিশতে মিশতে, চলতে ফিরতে। এ সময় শিশুরা কোন বাধা মানতে চায় না। কিন্তু আজকের শৈশব অনেকটা শিকলবন্দী। নানাশৃঙ্খলে আবদ্ধ। সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষার চাপ আর একক পরিবারের সংস্কৃতি শিশুদের সেই আনন্দময় শৈশবকে কেড়ে নিয়েছে।

ফেলে আসা শৈশবের সঙ্গে আজকের শিশুদের শৈশবের তুলনা করতে গিয়ে কথাগুলো বলেছেন নেত্রকোনা সরকারী কলেজের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মতীন্দ্র চন্দ্র সরকার। সত্তরোর্ধ এই শিক্ষাবিদের শৈশব কেটেছে গ্রামে। বড় হয়েছেন একান্নবর্তী পরিবারে মা-বাবা, ঠাকুরদা-ঠাকুরমা, পিসি-মাসি ও কাকা-কাকীদের আদরে-যতনে। সমবয়সীদের সঙ্গে ফুটবল, ডাংগুলি, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, হাডুডু ও মলদাইর খেলেছেন। গাছে চড়েছেন। জাল, বড়শি, কোচ দিয়ে মাছ ধরেছেন। দূরের গ্রামে গিয়ে যাত্রা কবিগান শুনেছেন। লেখাপড়ার তাগিদ তখনও ছিল। কিন্তু পিঠের ওপর বইয়ের বোঝা ছিল না। ছিল না প্রাইভেট টিউটর বা কোচিং সেন্টারও। স্কুলের পড়া স্কুলেই শেখা হয়ে গেছে। বাড়িতে শুধু সকাল-সন্ধ্যা দু’বেলা বই নিয়ে বসলেই হলো। কিন্তু আজকের শিশু জীবন একেবারেই ব্যতিক্রম। এ কালের শিশুরা বড় হচ্ছে একক পরিবারে, যেখানে মা-বাবা ছাড়া তেমন কেউ থাকে না। আর মা-বাবা দু’জনই যদি হয় কর্মজীবীÑ তাহলে শিশুর দিন কাটে কাজের মেয়ের কোলে-পিঠে। অর্থাৎ একান্নবর্তী পরিবারের মেলবন্ধন ও ¯েœহ-ভালবাসা থেকে নিদারুণ বঞ্চিত আজকের শিশু। পরীক্ষায় খারাপ করার ভয়ে শিশুকে খেলার সুযোগ দেয়া তো দূরের কথা, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গেও মিশতে দেয়া হয় না। গল্প-উপন্যাস পড়তে দেয়া হয় না। লক্ষ্য করা যায়, সাত সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাবার আগ পর্যন্ত শিশু কেবল পড়ার বই নিয়ে ছুটছে। কিন্ডারগার্টেন, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছুটতে ছুটতে আর প্রশ্নের উত্তর শিখতে শিখতে জীবনের সোনালি আনন্দগুলো হারিয়ে যায় একসময়। কখন কেটে যায় শৈশব, শিশুটি টেরও পায় না। সার্টিফিকেট মুখ্য হয়ে ওঠায় শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে সামাজিক শিক্ষা থেকে। ঘরের চার দেয়াল বা ছাদবন্দী এসব শিশুর যথাযথ মানসিক বিকাশ হচ্ছে না। বরং বেড়ে উঠছে বিচ্ছিন্নভাবে। গ্রামে এখনও কিছুটা শৈশব থাকলেও শহুরে সংস্কৃতি দিন দিন তা গ্রাস করছে।

মতীন্দ্র সরকার বলেন, অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের তাদের প্রবণতা অনুযায়ী বেড়ে উঠতে দেয় না। যে শিশুটি ছবি আঁকায় ভাল, তাকে ছবি আঁকার সুযোগ দেয়া হয় না। যে কারিগরি বিদ্যায় ভাল, তাকে পড়ানো হয় ডাক্তারী। অর্থাৎ অভিভাবকরা নিজের জীবনে যা অর্জন করতে পারেনিÑ তা তার সন্তানকে দিয়ে অর্জন করাতে চায়। তবে কোন কোন ক্ষেত্রে ভাল দিকও আছে আজকের শৈশবে। বিজ্ঞান বা তথ্যপ্রযুক্তি আজকের শিশুদের জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। জন্মের পরপরই শিশু মোবাইল ফোন দেখছে। ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। টেলিভিশন-সিনেমা দেখছে। এসব কারণে শিশুরা ছোট থেকেই জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেÑ যা অতীতে ছিল না। আগেকার দিনে নারী শিশুদের বাড়ির বাইরে যেতে দেয়া হয়নি। ১২/১৪ বছরেই অনেককে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। শিশুর গর্ভে জন্ম নিয়েছে একাধিক শিশু। কিন্তু আজকের নারী শিশুরা ছেলেদের সঙ্গে সমান তালে পাল্লা দিয়ে লেখাপড়া করছে। তাদের চলাচল বেড়েছে। যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

তিনি বলেন, শিশুদের স্বাধীনতা দিতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ হতে হবে আনন্দঘন। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিশতে দিতে হবে। শুধু লেখাপড়া নয়, পাশাপাশি খেলাধুলা, শরীরচর্চা ও সামাজিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণেরও সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তবেই শিশুর যথাযথ বিকাশ ঘটবে। আর এর ভেতর দিয়ে যোগ্য নাগরিক হয়ে বেড়ে উঠবে তারা।

Ñসঞ্জয় সরকার, নেত্রকোনা থেকে