১৪ ডিসেম্বর ২০১৮  ঢাকা, বাংলাদেশ  
শেষ আপডেট এই মাত্র    
ADS

শ্রমবাজার বন্ধ

শ্রমবাজার বন্ধ
  • দীর্ঘদিন ধরে দেন-দরবারে মিলেছে শুধুই আশ্বাস, প্রাপ্তি নেই কিছুই ;###;মন্ত্রণালয় বলছে শীঘ্রই সচল হবে ;###;দফায় দফায় প্রতিনিধি দল যাচ্ছে, নেই কোন সুফল ;###;আশ্বাসে আশ্বাসেই কাটছে সময়

ফিরোজ মান্না ॥ দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানিতে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ঝুলে গেছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কেবল আশ্বাস ছাড়া আর প্রাপ্তি তেমন কিছু নেই। নতুন শ্রমবাজারও সৃষ্টি হয়নি। দেশে রেমিটেন্স প্রবাহের খাতটি দিন দিন হুমকির মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। তবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বলছে, বেশ কটি দেশে জনশক্তি রফতানি বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে। অচিরেই কয়েকটি পুরনো শ্রমবাজারে কর্মী নিয়োগ করা সম্ভব হবে। বাস্তবে মন্ত্রণালয়ের কথার সঙ্গে জনশক্তি রফতানি বাজারের কোন মিল নেই। বন্ধ শ্রমবাজার খুলতে দফায় দফায় প্রতিনিধি দল পাঠানো ছাড়া আর কোন অর্জন নেই। আবার বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিনিধি দল এসেও জনশক্তি নেয়ার আগ্রহের কথা কেবল শুনিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু পরে আর ওই আগ্রহ থাকছে না। এ বছর শুধু আশ্বাসে আশ্বাসেই কেটে গেল। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগ

হচ্ছে না কোন দেশেই। এমন এক পরিস্থিতিতে চলছে দেশের শ্রমবাজার।

সূত্র জানায়, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসের লোকজনের সমন্বয়হীনতায় জনশক্তি রফতানি বাজার সৃষ্টি হচ্ছে না। মালয়েশিয়া-সৌদি আরবসহ বাংলাদেশের কোন শ্রমবাজারে বর্তমানে কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। মালয়েশিয়া গত মাসে দেশ থেকে ৫ লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিলেও সেই ঘোষণার কোন বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল কেবল দফায় দফায় বৈঠকই করে যাচ্ছে। কার্যত কোন সুখবর নেই। ১৪ লাখের বেশি তরুণ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার জন্য নিবন্ধন করে বসে আছে। তাদের অনেকের বয়স বেড়ে যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে যদি তারা বিদেশে চাকরি নিয়ে যেতে না পারে তাহলে তারাও বিদেশ যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। মালয়েশিয়া একবার বলছে জিটুজি আবার বলছে বিটুবি সর্বশেষ প্রস্তাব জিটুজি প্লাস। কোন পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করবে সেটাই এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত করতে পারেনি।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসি সম্প্রতি জানিয়েছেন, জনশক্তির বাজার তৈরি করতে নানা পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। কর্মীদের বিদেশী ভাষায় পারদর্শিতা, প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক এ্যাক্রিডিটেশন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে এ্যাফিলিয়েশন করা, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন এবং নিয়মিতভাবে প্রশিক্ষকদের দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার আলোকে বিদ্যমান কোর্স কারিকুলামকে নিয়মিত আপগ্রেড করা, বেসরকারী প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত প্রশিক্ষণের মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখার জন্য নিয়মিতভাবে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা নিয়েছে মন্ত্রণালয়। কর্মীরা দক্ষতা অর্জন করলে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ থেকেই কর্মী নেবে। তখন আর আমাদের জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে কোন বেগ পেতে হবে না। এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিদেশে কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করতে পারলে এই খাত থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, এ বছরের ১০ আগস্ট মালয়েশিয়ার প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কর্মী নিয়োগের বিষয়ে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তাই কোন জনশক্তি রফতানিকারকদের কাছে টাকা না দেয়ার জন্য কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মী নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত হবে। সর্বশেষ মালয়েশিয়া জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে (সরকার টু সরকার) তবে সরকার ইচ্ছে করলে এই পদ্ধতিতে জনশক্তি রফতানিকারকদের কর্মী পাঠানোর জন্য নিয়োগ করতে পারে) কর্মী নিয়োগ করবে। মালয়েশিয়ার এই প্রস্তাবের পর প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এই পদ্ধতিতে আরও একটি চুক্তি করতে হবে। মালয়েশিয়া প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে কোন প্রক্রিয়ায় কর্মী নিয়োগ হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, যারা সরকারীভাবে নিবন্ধন করেছিলেন, তাদের মধ্য থেকেই মালয়েশিয়ায় কর্মী নিযোগ হবে। নতুন করে যারা নিবন্ধন করবেন, তারাও মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনায় আরও একটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তা হলো কর্মী পাঠানোর বিষয়ে কম মূল্য নির্ধারণ করা হবে। যদিও বৈঠকে কর্মী পাঠানোর খরচ নির্ধারণ হয়নি। মালয়েশিয়ায় আগামী তিন বছরে ১৫ লাখ কর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকেই দেশটি কর্মী নিয়োগ দেবে বেশি। এ জন্য আমাদের সরকারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো উন্নততর করা হচ্ছে। দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারলে কর্মী নিয়োগে সুবিধা হবে।

অন্যদিকে সৌদি আরবে বর্তমানে পুরুষ কর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে না। সৌদি কর্তৃপক্ষ ২০ হাজার নারী কর্মী নিয়োগের জন্য গত বছর একটি চুক্তি করে। সেই চুক্তি অনুযায়ী তারা এ পর্যন্ত তিন হাজার নারী কর্মী নিয়েছে। বাকি ১৭ হাজার কর্মী কবে নিয়োগ দেবে তার কোন সময়সীমা এখনও জানানো হয়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষ নিজেরা এসেই কর্মীদের ইন্টারভিউ নেয় এবং সেখান থেকে তারা কর্মী নিয়োগ করে। এভাবেই চলছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। এই মহিলা কর্মী নিয়োগ নিয়েও নানা অভিযোগ রযেছে। সৌদিতে নারী কর্মীদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। এমন অভিযোগ ওঠার পর নারী কর্মীরাও আর ওই দেশে যেতে ইচ্ছুক হচ্ছে না। পুরুষ কর্মী নিয়োগের বিষয়ে সৌদি আরব এখনও বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে কোন আশ্বাস দেয়নি। মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোতেও কর্মী নিয়োগ বন্ধ রযেছে দীর্ঘদিন ধরে। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে দেশের শ্রমবাজার চলছে। কর্মী নিয়োগকারী কোন দেশেই যদি কর্মী নিয়োগ শুরু না হয় তাহলে কর্মীরা অবৈধ পথে যাওয়ার চেষ্টা করবে বলে শ্রমবাজার নিয়ে কাজ করে এমন একটি প্রতিষ্ঠান রামরু জানিয়েছে। অবৈধ পথে কর্মী গেলে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে। এর আগে সাগর পথে মালয়েশিয়ায় কয়েক হাজার কর্মী যেতে গিয়ে অনেকে মারা পড়েছেন।

বাংলাদেশের বড় শ্রমবাজার সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা হলেও কর্মী নিয়োগ হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রী নিজে কয়েকটি দেশ সফরে গিয়ে বন্ধ শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন। কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় কয়েকটি দেশ জনশক্তি নেয়ায় আগ্রহ দেখালেও এর সুফল এখনও পাওয়া যায়নি।

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটিতে ১০ লাখের মতো বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। ২০১১ সালে দেশটিতে ২ লাখ ৮২ হাজার ৭৩৯ বাংলাদেশী কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। ২০১২ সালের আগস্ট পর্যন্ত দেশটিতে কর্মী গেছেন ২ লাখ ১৫ হাজার ৪৫২। কিন্তু ওই বছরেরই সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ হয়ে যায় দেশটির শ্রমবাজার। বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল মালয়েশিয়া। দেশটিতে ৬ লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মী কর্মরত রয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে বড় এ শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। চার বছর পর ২০১২ সালের নবেম্বরে উভয় দেশের সরকারের সঙ্গে জি টু জি (সরকারীভাবে) পদ্ধতি কর্মী প্রেরণে সমঝোতা হয়। ২০১৩ সালের মার্চ থেকে এ পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হয়। এই প্রক্রিয়ায় মাত্র সাড়ে ৩ হাজার কর্মী নিয়োগ হয়েছে। জিটুজিতে ১০ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেয়ার কথা ছিল।

২০০৭ সাল থেকে বন্ধ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কুয়েতের শ্রমবাজার। দেশটিতে দুই লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কর্মরত রয়েছেন। এখন পর্যন্ত বাজারটি উন্মুক্ত হয়নি। একই অবস্থা বাহরাইন, লেবানন, ওমান ও জর্দানেও।

বিএমইটি সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে ৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫ বাংলাদেশী কর্মী বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বাংলাদেশের বৃহৎ শ্রমবাজারগুলো বন্ধ হওয়ার পর জনশক্তি রফতানির হারও কমে গেছে। ২০০৯ সালে ৪ লাখ ৭৫ হাজার ২৭৪, ২০১০ সালে ৩ লাখ ৯০ হাজার ৭০২, ২০১১ সালে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৬২, ২০১২ সালে ৬ লাখ ৭ হাজার ৭৯৮ এবং ২০১৩ সালে ৪ লাখ ৯ হাজার ২৫৩ কর্মী বিদেশে গেছেন। সর্ব শেষ ২০১৪ সালে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২৯৮ কর্মী বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেড় লাখের মতো কর্মী বিভিন্ন দেশে কাজ নিয়ে গেছেন।

প্রবাসী কল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও জনশক্তি রফতানি এবং প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) জানিয়েছে, জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে সরকারের টার্গেট পূরণ হয়েছে। জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে কোন ব্যর্থতা নেই। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতায় উপজেলা পর্যায়ে চার শতাধিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে চার লাখ থেকে পাঁচ লাখ কর্মীর প্রশিক্ষণ পাবে। দক্ষ কর্মী তৈরি হলে জনশক্তি রফতানির বাজার এমনই ভাল হবে।